একটি দেশের রাজধানী সেই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আধুনিকতা ও উন্নত জীবনের প্রতীক। তবে আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকা আজ এক ভিন্ন ও রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। চারশ বছরেরও বেশি পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী শহর এখন এক অবর্ণনীয় সংকটে নিমজ্জিত। বিপুল জনসংখ্যা, অন্তহীন যানজট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ত্রিমুখী চাপে ঢাকা আজ ক্রমান্বয়ে তার ন্যূনতম বাসযোগ্যতাও হারাচ্ছে।
এই সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে চলা নীতিগত অবহেলা, দূরদর্শিতার অভাব এবং নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার ত্রুটি আজ আমাদের এই খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই মেগাসিটি সম্পূর্ণ অচল ও পরিত্যক্ত এক নগরে পরিণত হতে পারে।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এবং ঘিঞ্জি মেগাসিটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকা মহানগরী ও তার আশপাশের এলাকাগুলোতে স্থায়ী ও ভাসমান জনসংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যা এই ক্ষুদ্র আয়তনের শহরের জন্য এক ভয়াবহ বোঝাস্বরূপ।
প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান, উন্নত শিক্ষা ও উন্নত চিকিৎসার খোঁজে ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছে। একটি সীমিত ভৌগোলিক সীমানার শহরে ধারণক্ষমতার চেয়ে চার থেকে পাঁচগুণ বেশি মানুষ বসবাস করায় শহরের মৌলিক নাগরিক সুবিধা যেমন- আবাসন, যাতায়াত ও স্যানিটেশনের ওপর তীব্র ও অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
ঢাকার অন্যতম বড় সংকট হলো দীর্ঘস্থায়ী যানজট। ২০২৬ সালের বিভিন্ন নগর গবেষণা অনুযায়ী, রাজধানীর সড়কে যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৪.৫ কিলোমিটার, যা একজন মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতিরও কম। প্রতিদিন যানজটের কারণে ৮-১০ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই স্থবিরতা জাতীয় উন্নয়নের জন্য এক বিশাল সুযোগ ব্যয় সৃষ্টি করছে। রাস্তায় নষ্ট হওয়া মূল্যবান সময় উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানো গেলে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব হতো। পাশাপাশি যানজটের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গণপরিবহনের দুর্বলতা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাব এই সংকটকে দিন দিন আরও গভীর ও জটিল করে তুলছে।
এক সময়ের সবুজ-শ্যামল, নদী-খাল ও জলাভূমিবেষ্টিত ঢাকা আজ দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে একটি ঘনবসতিপূর্ণ কংক্রিটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ, জলাশয় ভরাট এবং দুর্বল পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনার কারণে শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। ‘ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান’ বা নগর মহাপরিকল্পনার নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক এলাকায় অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, বাণিজ্যিক স্থাপনার বিস্তার এবং উন্মুক্ত স্থান সংকুচিত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
রাজউকের কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে কৃষিজমি, নিচু এলাকা ও জলাধার ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। ফলে ঢাকা হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পানি ধারণক্ষমতা। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি বাসযোগ্য শহরের জন্য পর্যাপ্ত সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণের চাপে ঢাকার সবুজ এলাকা ক্রমাগত কমে গিয়ে শহরটি ধীরে ধীরে কৃত্রিম ‘হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপে পরিণত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর।
ঢাকার চারপাশের নদী এবং শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া খালগুলো ছিল এই মহানগরের ফুসফুস। একে বলা চলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও অসাধু ভূমিদস্যু চক্রের কারণে ঢাকার বহু ঐতিহ্যবাহী খাল ও জলাশয় দখল হয়ে গেছে। ভরাট ও দূষণের কারণে অনেক জলাশয় স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারিয়েছে।
ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো ঢাকা শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ে, পরিণত হয় স্থবির নগরীতে। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। ড্রেন ও নালাগুলো পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে পারে না। ফলস্বরূপ, সামান্য বৃষ্টিপাতেই ঢাকার রাজপথ ও অলিগলি তলিয়ে যায়। নগরী যেন তখন জলাভূমিতে পরিণত হয়। জলাবদ্ধ নগরে নাগরিকদের দৈনন্দিন যাতায়াতে ও জীবনযাত্রায় সৃষ্টি হয় চরম দুর্ভোগ।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান সূচক অনুযায়ী শীতকাল তো বটেই, বছরের প্রায় অধিকাংশ সময়ই ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে থাকে। অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, মেগা প্রজেক্টের উন্মুক্ত নির্মাণকাজ, ফিটনেসবিহীন শত শত গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং শহরের চারপাশের ইটভাটা এই মারাত্মক বায়ুদূষণের প্রধান উৎস।
একই সঙ্গে যত্রতত্র হর্ন বাজানোর ফলে যুক্ত হয়েছে তীব্র শব্দদূষণ, যা মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এক নীরব ঘাতকের মতো এই পরিবেশ দূষণ ঢাকার কোটি কোটি নাগরিকের গড় আয়ু ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, প্রবীণ এবং শিশুরা তীব্র শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ ও মানসিক বিকাশজনিত জটিলতায় ভুগছে, যা পুরো জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বড় বিপর্যয় সংকেত।
জনসংখ্যার এই অভাবনীয় বিস্ফোরণের কারণে ঢাকার গ্যাস, বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগগুলো জনবল ও সম্পদের অভাবে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। গ্রীষ্মকাল এলেই শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকায় শুরু হয় তীব্র পানির সংকট এবং সেই সঙ্গে যোগ হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিষ্ঠ করে তোলা লোডশেডিং। ঢাকা ওয়াসা ও বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলো বিপুল জনসংখ্যার চাহিদার সঙ্গে কোনোভাবেই তাল মেলাতে পারছে না।
এ ছাড়া, এই মেগাসিটিতে দৈনিক উৎপাদিত হাজার হাজার টন কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক, আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। আমিনবাজার বা মাতুয়াইলের মতো বিশালাকার ল্যান্ডফিল তাদের ধারণক্ষমতা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে, যা চারপাশের পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানিকে আরও মারাত্মকভাবে বিষাক্ত করে তুলছে।
ঢাকার এই বর্তমান ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মূল দায় কার, এর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে ক্ষমতার অতি কেন্দ্রীয়করণ এবং নীতিগত দূরদর্শিতার অভাব। বাংলাদেশের সব বড় সরকারি দফতর, সচিবালয়, নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং তৈরি পোশাক শিল্পের সিংহভাগই ঢাকা ও এর আশপাশকেন্দ্রিক করা হয়েছে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ঢাকাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় বিধায় প্রান্তিক মানুষ বাধ্য হয়ে এখানে ছুটে আসে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, ডেসা এবং ডিএমপি- এই সংস্থাগুলোর মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যায়। এক সংস্থা রাস্তা মেরামত করার কয়েক দিন পরেই অন্য সংস্থা পাইপলাইনের জন্য সেই রাস্তা আবার কেটে ফেলে, যার ফলে জনগণের করের টাকা অপচয় হয় এবং জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
ঢাকার বর্তমান সংকট সমাধানে শুধু রাস্তা সম্প্রসারণ বা নতুন অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা। প্রথমত রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন কমিয়ে জেলা শহরগুলোতে শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে ঢাকামুখী জনচাপ কমে।
দ্বিতীয়ত সরকারি দফতরের বিকেন্দ্রীকরণ এবং ড্যাপ ও পরিবেশ আইনের কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাশয়, খাল ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, উন্নত গণপরিবহন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত রাজউক, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি বাসযোগ্য ঢাকা শুধু নগর উন্নয়নের নয়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নেরও অন্যতম পূর্বশর্ত।
ঢাকা শুধু একটি জনবহুল শহর নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হৃৎপিণ্ড। এই হৃৎপিণ্ড যদি অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দূর্ষণ আর অন্তহীন যানজটের বিষে চিরতরে অচল হয়ে পড়ে, তবে পুরো দেশের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন স্থবির হয়ে যাবে।
এখনও সামান্য যে সময়টুকু আছে, তার সঠিক ব্যবহার করে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূর্ষণমুক্ত ও সচল করা, সবুজায়ন ফিরিয়ে আনা এবং কঠোর আইনি নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। দায় এড়ানোর পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক এবং সচেতন নাগরিক- সবাইকে আজ এই নীরব সংকট মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ
জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, লক্ষ্মীপুর
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি