রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন : সমস্যা, বাস্তবতা ও টেকসই সমাধানের রূপরেখা

সাইফুল ইসলাম

মতামত

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা একদিকে যেমন দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র, অন্যদিকে এটি বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল মেগা সিটিগুলোর

2026-07-13T14:19:03+00:00
2026-07-13T14:56:41+00:00
 
  সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
মতামত
রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন : সমস্যা, বাস্তবতা ও টেকসই সমাধানের রূপরেখা
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ২:১৯ পিএম  আপডেট: ১৩.০৭.২০২৬ ২:৫৬ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা একদিকে যেমন দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র, অন্যদিকে এটি বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল মেগা সিটিগুলোর অন্যতম। স্বাধীনতার পর রাজধানীর জনসংখ্যা যেখানে ছিল মাত্র কয়েক লাখ, সেখানে বর্তমানে বৃহত্তর ঢাকা মহানগরে কয়েক কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও উন্নত জীবনের আশায় অসংখ্য মানুষ ঢাকায় আসছেন। এই দ্রুত নগরায়ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করলেও নগর ব্যবস্থাপনার ওপর সৃষ্টি করেছে অসহনীয় চাপ। তারই অন্যতম প্রকাশ জলাবদ্ধতা, যা বর্তমানে রাজধানীর সবচেয়ে জটিল নগর সমস্যাগুলোর একটি।

প্রতি বর্ষা মৌসুমে কিংবা স্বল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিপাতের পর রাজধানীর বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। বিমানবন্দর সড়ক, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, রামপুরা, শান্তিনগর, পুরান ঢাকা, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, খিলক্ষেত, বনশ্রীসহ অসংখ্য এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকে। যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়, অফিসগামী মানুষ কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, রোগীরা হাসপাতালে পৌঁছাতে চরম দুর্ভোগের শিকার হন। কখনও কখনও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, ডুবে যাওয়ার দুর্ঘটনা এবং জরুরি সেবার ব্যাঘাত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

জলাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এটি কোনো একক কারণের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দুর্বল নগর শাসন, পরিবেশ ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব। একসময় ঢাকা ছিল নদী, খাল, বিল ও জলাভূমির শহর। এসব জলাধার বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে ধীরে ধীরে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রবাহিত করত। কিন্তু নগর সম্প্রসারণের নামে অসংখ্য খাল ও জলাভূমি ভরাট করা হয়েছে। আবাসন, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। বহু খাল দখল, দূষণ ও বর্জ্যে ভরাট হয়ে তাদের অস্তিত্বই হারাতে বসেছে।

অন্যদিকে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা বহু ক্ষেত্রেই পুরোনো, অপর্যাপ্ত এবং অকার্যকর। জনসংখ্যা ও নির্মাণকাজ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেলেও অনেক এলাকার ড্রেন এখনও আগের সক্ষমতাতেই রয়ে গেছে। কোথাও ড্রেনের সঙ্গে খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কোথাও আবার ড্রেনের মুখ বর্জ্যে বন্ধ। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হওয়ার পরিবর্তে সড়ক ও বসতিতে জমে থাকে। নগর পরিকল্পনায় পানি নিষ্কাশনকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার ফলও আজ স্পষ্ট।

কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, নির্মাণবর্জ্য ও গৃহস্থালির আবর্জনা নিয়মিত ড্রেনে ফেলার ফলে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষাকালে এই বর্জ্যগুলো ড্রেনের মুখ আটকে দিয়ে পুরো নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তোলে। নাগরিক অসচেতনতার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমানে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা বহন করতে পারে না। একই সঙ্গে নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে শহরের পানি বাইরে নিষ্কাশনেও বাধা সৃষ্টি হয়। ফলে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
এই সমস্যার অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর। যানজট, কর্মঘণ্টার অপচয়, শিল্প উৎপাদনে ব্যাঘাত, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং অবকাঠামো সংস্কারে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। জলাবদ্ধতার কারণে সড়কের আয়ুষ্কাল কমে যায়, যানবাহনের ক্ষতি হয় এবং নগর পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব আরও উদ্বেগজনক। জমে থাকা দূষিত পানি ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, লেপ্টোস্পাইরোসিস ও বিভিন্ন চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পায়। শিশু, প্রবীণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এই সংকট নিরসনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা। প্রথমত, রাজধানীর সব খাল, জলাশয় ও নিম্নভূমি দ্রুত দখলমুক্ত করে পুনরুদ্ধার করতে হবে। খালগুলোকে নিয়মিত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অতিবৃষ্টিও মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। তৃতীয়ত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণকে নগর উন্নয়নের বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং, পারমিয়েবল পেভমেন্ট এবং পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্মার্ট সেন্সর ব্যবহার করে কোথায় পানি জমছে, কোথায় ড্রেন বন্ধ হচ্ছে এবং কোথায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন— তা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন শহরের অভিজ্ঞতা ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। নেদারল্যান্ডস পানি ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় উন্নয়নের অংশে পরিণত করেছে। সিঙ্গাপুর বৃষ্টির পানিকে সম্পদে রূপান্তর করেছে এবং পরিচ্ছন্ন খাল ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে। জাপান টোকিওর নিচে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভূগর্ভস্থ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নির্মাণ করেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণ থাকলে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ঢাকার ক্ষেত্রেও একইভাবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নগর উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ সংরক্ষণ, সড়ক নির্মাণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে জলাধার দখল, খাল ভরাট ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, জলাবদ্ধতা শুধু একটি প্রকৌশলগত সমস্যা নয়, এটি নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য এবং সুশাসনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জাতীয় ইস্যু। আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার প্রভাব আগামী কয়েক দশক ধরে রাজধানীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তাই স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণের মাধ্যমে একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য, সহনশীল ও জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। একটি টেকসই রাজধানীই পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে।

লেখক : লেখক ও কলামিস্ট

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   রাজধানী  জলাবদ্ধতা  সমাধান  মতামত  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: