নতুন শ্রমবাজার, দক্ষ কর্মী, বেশি রেমিট্যান্স

রেজাউল করিম খোকন

মতামত

দেশে প্রবাসী আয় আবার আগের ধারায় ফিরেছে। যেসব দেশে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি আছেন, সেগুলো থেকে এখন বেশি করে রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী

2026-07-11T10:43:54+00:00
2026-07-11T10:43:54+00:00
 
  শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
মতামত
নতুন শ্রমবাজার, দক্ষ কর্মী, বেশি রেমিট্যান্স
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ১০:৪৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দেশে প্রবাসী আয় আবার আগের ধারায় ফিরেছে। যেসব দেশে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি আছেন, সেগুলো থেকে এখন বেশি করে রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী আয় আসছে। বিগত কয়েক বছর ধরে বিদেশে কর্মী পাঠানো বেড়েছে। যদিও দক্ষ কর্মী পাঠানোর হার সে তুলনায় বাড়েনি। গত অর্থবছরে উল্টো এটি কমেছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দিয়েছিল। জাপান ও ইউরোপের মতো দক্ষ শ্রমবাজারে কর্মী পাঠাতে চুক্তি করা হয়েছিল। 

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর সুফল পেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। বিদেশে কর্মী পাঠাতে হলে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে প্রত্যেক কর্মীকে ছাড়পত্র নিতে হয়। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশে মোট কর্মী গেছেন ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৯০০ জন। এর মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ ছিলেন দক্ষ কর্মী। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গেছেন ১০ লাখ ১৫ হাজার ৩১২ জন কর্মী। এর মধ্যে দক্ষ কর্মী ১৮ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে পেশাদার কর্মী গেছেন মাত্র ৩ শতাংশ। দক্ষ আর আধা দক্ষ মিলে কর্মী গেছেন ৩৮ শতাংশ। বিদেশে যাওয়া বাকি ৫৯ শতাংশ কর্মী গেছেন স্বল্প দক্ষ হিসেবে। 

কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াটি চলে মূলত দালাল বা পরিচিতদের মাধ্যমে। তাই ঘুরেফিরে কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমিত আছে কর্মী পাঠানো। মূলত নির্মাণ অবকাঠামো খাতেই যাচ্ছেন কর্মীরা। এ ক্ষেত্রে কোনো দক্ষতা লাগে না, বেতনও কম। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ ছাড়া শ্রমবাজার তেমন বিস্তৃত নয়। অদক্ষ কর্মীর চাহিদার ভিত্তিতে সীমিত শ্রমবাজারে আটকে আছে কর্মী পাঠানো। নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যেও দক্ষ কর্মীর চাহিদা তৈরি হচ্ছে। 

প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে হলে দক্ষ কর্মী পাঠাতে হবে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় দক্ষতাভিত্তিক কর্মী পাঠাতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশকে প্রাথমিকভাবে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ‘জাপান সেল’ গঠন করে পাঁচ বছরে এক লাখ দক্ষ কর্মীকে দেশটিতে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। মৌসুমি কর্মী পাঠাতে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রদেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে এবং কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে। সিজনাল ও নন-সিজনাল কর্মী পাঠাতে বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ ছাড়া উন্নত দেশগুলোতে কর্মী পাঠাতে প্রবাসী কর্মীদের ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং সেবা দেওয়া পদ্ধতি বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। সিঙ্গাপুরে দ্রুত সময়ে কর্মী পাঠাতে সত্যায়ন প্রক্রিয়া প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ প্রোগ্রামের আওতায় বা স্বতন্ত্রভাবে জাপান, জার্মানি, ইতালিসহ উচ্চ-চাহিদাসম্পন্ন শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে বিস্তৃত ভাষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হয়েছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আমাদের শ্রমবাজারে নতুন গতি সঞ্চার করবে। 

বিএমইটির তথ্য বলছে, ১৬৮টি দেশে কর্মী পাঠায় বাংলাদেশ। যদিও গত বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মী গেছেন ১৪১টি দেশে। এসব দেশে কর্মী গেছেন ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৭৫৯ জন। এর মধ্যে ১৩টি দেশে কর্মী গেছেন মাত্র একজন করে। ১০ হাজারের বেশি কর্মী পাঠানো গেছে মাত্র ৮টি দেশে। আর লাখের বেশি কর্মী গেছেন দুটি দেশে। এর মধ্যে কাতার গেছেন এক লাখ কর্মী আর সৌদি আরব গেছেন ৭ লাখের বেশি কর্মী। অতীতে বেশি হারে কর্মী পাঠানো নিয়ে নানা অভিযোগ আছে। অনেক কর্মী বিদেশে গিয়ে কাজ না পেয়ে অবৈধ হয়ে পড়েছেন। পুলিশের হাতে আটক হয়েও দেশে ফিরে আসতে হয়েছে একটা অংশকে। এ ছাড়া অদক্ষ কর্মী পাঠানোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন চক্র কাজ করে। তবে সরকার দক্ষ কর্মী তৈরিতে জোর দিয়েছে। বর্তমানে ৪৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) জাপানি, ইংরেজি, চীনা ও কোরীয় ভাষা কোর্স করানো হচ্ছে। বিএমইটি ও সৌদি আরবের কোম্পানি তাকামোলের মধ্যে সই করা চুক্তির অধীনে গত এক বছরে ১৫টি টিটিসি দক্ষতা পরীক্ষা পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে। টিটিসিতে কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল না। বিদেশে এর চাহিদা বাড়তে থাকায় এটি যুক্ত করা হয়েছে।

বিদেশে শ্রমবাজার খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফিলিপাইন অনেক আগে থেকে দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগ নিয়ে সফলতা দেখিয়েছে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যের অদক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে একজন কর্মী মাসে গড়ে যে বেতন পান, তার চেয়ে তিন-চার গুণ আয় করা যায় জাপান বা ইউরোপের দেশগুলোতে। 

প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে জাপান-ইউরোপের মতো দেশে দক্ষ শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর দিকে জোর দিতে হবে। দক্ষ কর্মী পাঠাতে হলে যা যা করা দরকার, সেসব করতে হবে আগে। স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় কারিগরি শিক্ষার পরিধি বাড়াতে পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। টিটিসি থেকে প্রশিক্ষিতদের দক্ষতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। মানোন্নয়ন ঘটিয়ে তাদের সনদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা দরকার। অভিবাসন খাতের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও দক্ষ কর্মী তৈরি করতে বিভিন্ন কর্মসূচি চালাচ্ছে। কুমিল্লার পাঁচটি উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নে কার্যক্রম পরিচালনা করছে রামরু (রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট)। এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য, প্রশিক্ষিত কর্মীরা যাতে বিদেশে গিয়ে আত্মনির্ভরশীলভাবে কাজ করতে পারেন। 

একসময় বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যেতেন। তবে গত শতাব্দীর সত্তর দশকের শেষভাগে এসে বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক হারে কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হচ্ছে জনশক্তি রফতানি খাত। এখনও পণ্য রফতানি বাবদ সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। তবে এক অর্থে জনশক্তি রফতানি খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে পণ্য রফতানি খাতের চেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়। কারণ, পণ্য রফতানি খাতে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি বাবদ পুনরায় বিদেশে চলে যায়। ফলে এ খাত থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন হয় তুলনামূলকভাবে কম। 

কিন্তু জনশক্তি রফতানি খাত থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। কারণ এ খাতরে জন্য কোনো উপকরণ আমদানি করতে হয় না। উপরন্তু এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাসী আয় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ১৬৮টি দেশে কর্মী পাঠাচ্ছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি মুসলিম দেশে জনশক্তি রফতানি করা হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এসব দেশের চেয়ে ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলে জনশক্তি রফতানি করা হলে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের বিকল্প বা নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে হবে।

সীমিতসংখ্যক দেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি খাতের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে আমরা উন্নত দেশগুলোর চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে জনশক্তি রফতানি করতে পারছি না। বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে কর্মসংস্থান উপলক্ষে যান তাদের বেশিরভাগই অদক্ষ শ্রমিক। ফলে তারা বিদেশে গিয়ে উপযুক্ত মজুরি পান না। দক্ষ শ্রমিক এবং পেশাজীবীদের বিদেশে পাঠানো গেলে এ খাতের আয় অনেক গুণ বাড়তে পারে। বাংলাদেশ থেকে দক্ষ এবং বিদেশি ভাষা জানা কর্মী এবং পেশাজীবী পাঠানো গেলে এ খাতের অর্জন আরো অনেক বেশি বাড়ানো সম্ভব। জনশক্তি রফতানি খাতের আয় বাড়ানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ করে গড়ে তোলা যেতে পারে। 

বিগত সরকার আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুল নীতির কারণে জনশক্তি রফতানি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকার সমর্থক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণ করে রেখেছিল। ফলে বৈধ চ্যানেলের সঙ্গে কার্ব মার্কেটে প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্যের পার্থক্য দাঁড়ায় ১০ থেকে ১২ টাকা। বাড়তি অর্থ পাবার প্রত্যাশায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করতে থাকে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ম্যানেজমেন্ট মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ কমিয়ে দেয়। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন মার্কিন রেমিট্যান্স আহরণ করতে সক্ষম হয়েছে। জনশক্তি রফতানি খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য এই খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। নতুন শ্রমবাজারে জনশক্তি রফতানি বাড়াতে না পারলে রেমিট্যান্স প্রবাহে জোয়ার আসবে না, এটা আমাদের সবাইকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার
মতামত লেখকের নিজস্ব


  বিষয়:   রেজাউল করিম খোকন  শ্রমবাজার  দক্ষ কর্মী  রেমিট্যান্স 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: