সংঘাতময় ইতিহাস ও বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা

ড. দেলোয়ার হোসেন

মতামত

মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ ও শান্তি সবসময়ই পাশাপাশি বিদ্যমান। দুটি পরস্পরবিরোধী হলেও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিশ্ব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজও বিশ্বের বিভিন্ন

2026-07-09T14:06:50+00:00
2026-07-09T14:06:50+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬,
২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
সংঘাতময় ইতিহাস ও বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা
ড. দেলোয়ার হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ২:০৬ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ ও শান্তি সবসময়ই পাশাপাশি বিদ্যমান। দুটি পরস্পরবিরোধী হলেও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিশ্ব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত চলমান, যার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরান যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইউরোপের মতো উন্নত মহাদেশও শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ, ত্রিশ বছরব্যাপী যুদ্ধ এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে। ফলে ইউরোপীয় সভ্যতার অগ্রগতির পাশাপাশি যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতাও সমান্তরালভাবে বিদ্যমান ছিল। বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধেও সেই সংঘাতময় ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা যায়।

যুদ্ধের পাশাপাশি মানুষ সবসময় শান্তির আকাঙ্ক্ষা লালন করেছে। যুদ্ধ প্রতিরোধ কিংবা শুরু হলে দ্রুত সমাপ্ত করার প্রচেষ্টা মানবসভ্যতার টিকে থাকার সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যুদ্ধকে অনেকটাই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হলেও, সেই যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ বিশ্বকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এর ফলেই বিশ্বকে যুদ্ধমুক্ত রাখার অঙ্গীকার নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর সনদে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব প্রবেশ করে স্নায়ুযুদ্ধের যুগে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্বজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও অস্থিরতার জন্য দেয়। যদিও সরাসরি বৈশ্বিক যুদ্ধ হয়নি, কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো যুদ্ধগুলো ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান ও নির্বিচার বোমাবর্ষণ বিশ্বব্যাপী সমালোচনার জন্ম দেয় এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অজনপ্রিয় যুদ্ধে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সংকট তৈরি হয়েছিল ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল সংকটে। কিউবায় সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। তবে উভয়পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে সেই সংকট এড়ানো সম্ভব হয় এবং বিশ্ব একটি সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে রক্ষা পায়। পরবর্তীতে ইরান-ইরাক যুদ্ধ ও আফগানিস্তান যুদ্ধের মতো সংঘাত ঘটলেও সেগুলো আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল।

১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বে শান্তির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। সামরিক ব্যয় কমে আসে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে ওঠে। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয় আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়। তবে এই সময়েও চীন, রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে বড় ধরনের বৈশ্বিক সংঘাত সৃষ্টি হয়নি।

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০১৫ সালের পর। চীনের দ্রুত উত্থান মার্কিন একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। একই সঙ্গে ভারতের উত্থান এবং রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের অবনতি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে যায়। ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পর সেই সম্পর্ক আরও তিক্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ব নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়।

একই সময়ে বিশ্বজুড়ে আরেক ধরনের আদর্শিক সংঘাতও তীব্র হয়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ ও ইসলামোফোবিয়ার বিস্তার উদারনৈতিক মূল্যবোধের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (MAGA)' নীতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি ও কউর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানে প্রভাব ফেলেছে। ফলে বর্তমান বিশ্বে একদিকে মতাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই, অন্যদিকে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সামরিক সংঘাত-দুই ধরনের যুদ্ধই সমান্তরালভাবে চলছে।

বর্তমান বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেন সরাসরি লড়াই করলেও ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্নভাবে সহায়তা দিচ্ছে। অন্যদিকে চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরান কূটনৈতিকভাবে রাশিয়ার পাশে অবস্থান নিয়েছে। ফলে যুদ্ধটি কার্যত বৈশ্বিক মাত্রা লাভ করেছে।

এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ইউক্রেনের অর্থনীতি ও অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবু ইউক্রেনের প্রতিরোধ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা এবং রুশ ভূখণ্ডে পাল্টা হামলা চালিয়ে ইউক্রেন নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার যে ধারণা ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগও এখন পর্যন্ত সফল হয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গাজায় ইসরাইলের একতরফা সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। যদিও সংঘাত এক পর্যায়ে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল, ২০২৬ সালে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শান্তি আলোচনা চলাকালেই ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানো হয়। 

তবে ইরান পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করে। ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য পূরণ হয়নি।বরং হামলার পরও তারা পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম হয় এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংঘাতকে নতুন মাত্রা দেয়। বর্তমানে সরাসরি

বড় ধরনের হামলা না হলেও ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা এবং পরোক্ষ সামরিক সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে শান্তি আলোচনাও চলছে।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুদ্ধ ও শান্তির দ্বন্দ্বে শান্তিই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হচ্ছে। ইউক্রেন সংকট, গাজা যুদ্ধ কিংবা ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা-কোনো ক্ষেত্রেই কার্যকর শান্তি উদ্যোগ সফল হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টা প্রয়োজনের তুলনায় দুর্বল হওয়ায় বিশ্ব নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে।

প্রথমত গ্রহণযোগ্য শান্তি প্রক্রিয়া গড়ে তোলার আন্তরিকতা ক্রমেই কমে গেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়েও বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে সংলাপের যে প্রবণতা ছিল, বর্তমান বিশ্বে তা অনেকটাই অনুপস্থিত।

দ্বিতীয়ত শান্তি আলোচনাকেও এখন সামরিক শক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার এই ধারণা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়; বরং বিদ্যমান শান্তি উদ্যোগকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।

তৃতীয়ত জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিয়েই সংস্থাটির জন্য হলেও বর্তমান

সংঘাতগুলোতে তার কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় আরও বেড়েছে।

চতুর্থত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে বহুপক্ষীয়তা বা মাল্টিল্যাটারালিজম ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। কূটনৈতিক সংলাপের পরিবর্তে শক্তির রাজনীতি প্রাধান্য পাওয়ায় বৈশ্বিক সংকট সমাধান আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

পঞ্চমত যুদ্ধ বন্ধে বৃহৎ শক্তিগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি হলেও বাস্তবে তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। সংশ্লিষ্ট পক্ষ যেমন সংঘাত অব্যাহত রাখছে, তেমনি যুদ্ধের বাইরে থাকা শক্তিগুলোও শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রত্যাশিত উদ্যোগ নিচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা আরও গভীর হচ্ছে।

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ববাণিজ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদন ও পরিবহন সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে উন্নয়নশীল ও উন্নত- উভয় ধরনের দেশেই মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, যদিও তুলনামূলকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

একই সঙ্গে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও এখনও বিদ্যমান। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামো ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে ২০২২ সাল থেকে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি বিশ্ব। এই দুই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। সংকট সৃষ্টিতে তাদের কোনো ভূমিকা না থাকলেও সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সংকটের বাইরে নয়। বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকায় যুদ্ধের প্রভাব দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি, কৃষি ও কূটনীতিতে স্পষ্টভাবে পড়েছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং মূল্যবৃদ্ধি শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও বৈশ্বিক সংকটের কারণে সব সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতার কারণে সার, গমসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যা কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন সংকটে কেন্দ্রীভূত থাকায় রোহিঙ্গা সংকটসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ইন্নাল অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

সব মিলিয়ে বর্তমান যুদ্ধ ও সংঘাতময় বিশ্ব উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই সংকটগুলোর জন্য দায়ী না হয়েও তাদেরই সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‍বৃহৎ শক্তিগুলোর আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সংকটময় সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর কূটনীতির মাধ্যমেই বিশ্ব বড় বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমান সময়েও সেই ধরনের আন্তরিক ও সাহসী কুটনৈতিক উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

যুদ্ধ যে পর্যায়েরই হোক, তা থেকে বেরিয়ে আসাই মানবতার স্বার্থে সবচেয়ে জরুরি। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও বিশ্বজনমতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধবিরোধী জনমত গড়ে উঠেছে। সেই জনমতের প্রতিফলন যদি বৃহৎ শক্তিগুলোর পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক আচরণে প্রতিফলিত হয়, তবেই একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল বিশ্বের আশা বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   সংঘাতময় ইতিহাস  বর্তমান বিশ্ব  বাস্তবতা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: