নতুন সমঝোতা পুরোনো অবিশ্বাস, শান্তির কঠিন পথ

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

মতামত

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে যুদ্ধ যেন কোনো ব্যতিক্রম নয় বরং বহু সময়ে সেটিই হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক বাস্তবতা। এই অঞ্চলের মাটি যেমন বারবার

2026-07-09T12:48:56+00:00
2026-07-09T12:48:56+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬,
২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
নতুন সমঝোতা পুরোনো অবিশ্বাস, শান্তির কঠিন পথ
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে যুদ্ধ যেন কোনো ব্যতিক্রম নয় বরং বহু সময়ে সেটিই হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক বাস্তবতা। এই অঞ্চলের মাটি যেমন বারবার রক্তে ভিজেছে, তেমনি অসংখ্য শান্তি চুক্তির সাক্ষীও হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট, কাগজে স্বাক্ষরিত শান্তি আর মানুষের মনে গড়ে ওঠা শান্তি এক নয়। কিছু সংঘাতের প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও গভীর ছাপ ফেলে। সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত তেমনই এক ঘটনা। পাল্টাপাল্টি হামলা, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক উদ্বেগের পর দুই পক্ষ আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরেছে।

অনেকেই এটিকে শান্তির সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা বলছে, যুদ্ধ থেমে যাওয়া আর স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক জিনিস নয়। এই সত্যটি যত দ্রুত স্বীকার করা যায়, পরিস্থিতি বিশ্লেষণও ততবেশি বাস্তবতার কাছাকাছি থাকে।

এই সংঘাতের শিকড় গত কয়েক বছরের নয়, প্রায় অর্ধশতাব্দীর। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব শুধু ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাই বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণও। সেই বিপ্লবের পর থেকেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক বিশ্বাস নয়, বরং সন্দেহের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এরপরের কয়েক দশক ছিল অবিশ্বাস, নিষেধাজ্ঞা এবং পরোক্ষ সংঘাতের ইতিহাস। আফগানিস্তান থেকে ইরাক, সিরিয়া থেকে লেবানন, প্রায় প্রতিটি আঞ্চলিক সংকটে দুই দেশ বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। কখনো তা প্রকাশ্য সংঘাত, কখনো ছায়াযুদ্ধ, কখনো অর্থনৈতিক অবরোধের রূপ নিয়েছে। এই দীর্ঘ ইতিহাস বোঝা জরুরি, কারণ বর্তমান যুদ্ধবিরতি এই পঞ্চাশ বছরের জমে থাকা অবিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে।

যুদ্ধের শুরুতে উভয় পক্ষই আত্মবিশ্বাসী ছিল। যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে দ্রুত দুর্বল করে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে গেছে। ইরান শুরু থেকেই বুঝেছিল সরাসরি শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়, তাই তারা ভিন্ন কৌশল নেয়। লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ জেতা নয়, টিকে থাকা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় টিকে থাকাটাই সবচেয়ে বড় বিজয়, কারণ একটি রাষ্ট্র যতদিন টিকে থাকে, ততদিন আলোচনার টেবিলে তার আসনও টিকে থাকে।

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যেকোনো পক্ষই দ্রুত কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাচ্ছে না। সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অভিঘাতও আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ পুরো বিশ্বকে চিন্তিত করে তোলে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, তাই এখানকার উত্তেজনা মানে শুধু আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি। জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়া, বিমা প্রিমিয়াম আকাশচুম্বী হওয়া এবং তেলের দাম নিয়ে আতঙ্ক, এই তিনটি বিষয়ই একসঙ্গে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছিল। এই কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ দ্রুত উত্তেজনা কমানোর পক্ষে অবস্থান নেয়।


ধীরে ধীরে উভয় পক্ষ উপলব্ধি করে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ সম্ভাব্য লাভের চেয়ে বেশি। আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তকে দুর্বলতা ভাবার সুযোগ নেই। বরং অনেক সময় আলোচনার জন্য যে রাজনৈতিক সাহস প্রয়োজন, তা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়েও বেশি, কারণ ঘরের মাটিতে উগ্র জাতীয়তাবাদী মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে হয় নেতাদের। বর্তমান সমঝোতার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই, এটি একটি স্বীকারোক্তি যে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সামরিক শক্তি দিয়ে একা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

তবে যুদ্ধ থামানো তুলনামূলক সহজ, শান্তি টিকিয়ে রাখা অনেক কঠিন। অস্ত্রবিরতি ঘোষণা হয় কয়েক ঘন্টায়, কিন্তু অবিশ্বাস দূর করতে লাগে বহু বছর। আর মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এই অবিশ্বাসই বহু শান্তি উদ্যোগকে ব্যর্থ করেছে। ক্যাম্প ডেভিড থেকে শুরু করে অসলো চুক্তি, একাধিক বড় শান্তি উদ্যোগ এই অঞ্চলে এসেছে এবং সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে গেছে। তাই আসল প্রশ্ন কে জিতল বা কে হারল তা নয়,

প্রশ্ন হলো এই যুদ্ধবিরতি কি স্থায়ী শান্তির ভিত তৈরি করতে পারবে, নাকি আরেকটি বড় সংঘাতের আগে ক্ষণিকের বিরতি মাত্র?

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সাধারণত একটি প্রশ্ন সামনে আসে, এরপর কী? যুদ্ধবিরতি শুধু সংঘাত থামায়নি, অঞ্চলটির শক্তির ভারসাম্যকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। যুদ্ধের আগের সমীকরণআর পুরোপুরি একই নেই। যুদ্ধের শুরুতে অনেক পর্যবেক্ষক ধারণা করেছিলেন ইরান দুর্বল হয়ে পড়বে। 

কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী আলোচনায় তেহরানকে কেন্দ্রীয় পক্ষ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এটি সামরিক বিজয় নয়, কিন্তু কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে একটি বড় অর্জন। বাস্তবতা হলো, ইরানকে বাদ দিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নির্মাণ করা কঠিন। ইরাকে তার রাজনৈতিক প্রভাব, সিরিয়ায় কৌশলগত উপস্থিতি, লেবাননে দীর্ঘদিনের মিত্র, ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, একটি আঞ্চলিক বাস্তবতা।

তবে এই বাস্তবতা শান্তির জন্য জটিলতাও তৈরি করছে। একটি রাষ্ট্র যত প্রভাবশালী হয়, প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্বেগও তত বাড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও বদলাচ্ছে। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার, ইরাকে ভূমিকার পরিবর্তন এবং এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে মনোযোগ বৃদ্ধির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের ভূমিকা আগের তুলনায় ভিন্ন রূপ নিচ্ছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো এই পরিবর্তনে নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করার সুযোগ পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির মানচিত্রে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় রয়েছে। 

চীন এখন শুধু তেল ক্রেতা নয়, কুটনৈতিক অংশীদার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তুরস্ক ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান গড়ে তুলছে। উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধের চেয়ে অর্থনৈতিক রূপান্তরকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তারা দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক অস্থিরতা চায় না, কারণ তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তেলের বাইরে বহুমুখী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার। এই প্রবণতা শান্তির জন্য ইতিবাচক।

কিন্তু এতগুলো শক্তি শান্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেও মূল চ্যালেঞ্জ থেকে যাচ্ছে অবিশ্বাসের মধ্যে।যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর করা যায় কয়েক দিনের আলোচনায়, কিন্তু কয়েক দশকের অবিশ্বাস দুর করা যায় না কয়েক মাসে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে সন্দেহ করে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সন্দেহ করে। এই পারস্পরিক সন্দেহই শান্তির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।

যুদ্ধ শেষ করা কঠিন, কিন্তু শান্তিকে টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন। যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কিন্তু অঞ্চলটির সবচেয়ে জটিল বিরোধগুলো এখনও রয়ে গেছে। বরং যুদ্ধের সময় যে সমস্যাগুলো সামরিক সংঘাতের আড়ালে চাপা পড়েছিল, সেগুলো এখন আরও স্পষ্ট হয়ে সামনে আসছে। এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসরাইল। রাষ্ট্রটি জন্মলগ্ন থেকেই নিজেকে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দেখেছে। ইরানের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব ইসরাইলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লেও তেল আবিবের সন্দেহ পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে শান্তির সামনে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ, ইরানকে উপেক্ষা করেও মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়, আবার ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করেও নয়।

সিরিয়া এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্র। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের স্বার্থ একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। সিরিয়া স্থিতিশীল না হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও ভঙ্গুর থেকে যাবে। লেবাননের পরিস্থিতিও কম জটিল নয়, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনও অব্যাহত। হিজবুল্লাহ ইসরাইলের কাছে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, ইরানের কাছে আঞ্চলিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে সবচেয়ে জটিল চ্যালেঞ্জ সম্ভবত প্রক্সি সংঘাত। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক যুদ্ধ সরাসরি রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধ নয়। বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মিলিশিয়ার মাধ্যমে সংঘাত পরিচালিত হয়। দুটি রাষ্ট্র আলোচনায় অগ্রগতি অর্জন করলেও কোনো প্রক্সি গোষ্ঠীর একটি হামলা পুরো পরিস্থিতিকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

এখানেই শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ভঙ্গুরতা, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা চলতে থাকলেও মাটিতে এমন অনেক অস্ত্রধারী গোষ্ঠী আছে, যাদের ওপর কোনো রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নও অমীমাংসিত। যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কিন্তু পারমাণবিক ইস্যু পুরোপুরি সমাধান হয়নি, এটিই আগামী দিনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে। তবু আশার জায়গা একেবারে নেই তা নয়। অর্থনৈতিক বাস্তবতা সবাইকে কিছুটা হলেও সংযত রাখছে। যুদ্ধ অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, বিনিয়োগ কমায়, উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়। কিন্তু অর্থনৈতিক যুক্তি সবসময় রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। 

জাতীয় নিরাপত্তা ও আদর্শিক অবস্থান অনেক সময় অর্থনৈতিক স্বার্থের চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করে। যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা থামেনি। অস্ত্র নীরব হয়েছে, কিন্তু সন্দেহ নীরব হয়নি। আর সেই কারণেই শান্তির প্রকৃত লড়াই এখন শুরু হয়েছে। যুদ্ধের ধোঁয়া একসময় মিলিয়ে যায়। কিন্তু যুদ্ধের প্রকৃত প্রভাব দৃশ্যমান হয় বহু বছর পরে। ইরান যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন সেটাই, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে? হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব সাম্প্রতিক সংঘাতে নতুন করে সামনে এসেছে। 

উপসাগরীয় বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা তাই শুধু আঞ্চলিক বিষয় নয়, এটি এশিয়ার শিল্প উৎপাদন, ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গেও জড়িত। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতি সত্ত্বেও আগামী এক দুই দশক তেল ও গ্যাস বৈশ্বিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে।

এখন একটু কল্পনা করা যাক, যদি সবচেয়ে আশাবাদী দৃশ্যপটটি সত্যিই বাস্তবে রূপ নেয়। ধরা যাক, আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ধীরে ধীরে গভীরতর হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি সমঝোতা হয়েছে, যা শুধু কাগজে নয়, বাস্তবায়নেও কার্যকর।

সিরিয়ার ধ্বংসস্তূপের ওপর পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ফিরতে শুরু করেছে, লাখো শরণার্থী নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে। লেবাননে রাজনৈতিক সংকট কেটে নতুন সরকার অর্থনীতি পুনর্গঠনে হাত দিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের চেয়ে নিরাপদ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। তরুণ প্রজন্য, যারা যুদ্ধ ছাড়া অন্য কিছু কখনো দেখেনি, তারা প্রথমবারের মতো একটি স্থিতিশীল অঞ্চলে বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

এই দৃশ্যপটে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কেন্দ্র থেকে সহযোগিতার অঞ্চলে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ পাবে। স্বপ্নটি আকর্ষণীয়, কারণ ইতিহাসে এমন রূপান্তর একেবারে অসম্ভব নয়, ইউরোপও একসময় দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর একীভূত হয়ে শান্তির কাঠামো গড়ে তুলেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এই পথ অনেক বেশি কঠিন, কারণ এখানে দ্বন্দ্বের স্তর একাধিক, রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র, ধর্মীয় ও মতাদর্শগত বিভাজন এবং অসংখ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি একসঙ্গে কাজ করে। তাই এই দৃশ্যপট আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে অর্জন করা সহজ নয়। তুলনামূলক বাস্তবসম্মত দ্বিতীয় দৃশ্যপটে যুদ্ধ হবে না, কিন্তু প্রকৃত শান্তিও আসবে না।

সংঘাতের মূল কারণগুলো পুরোপুরি সমাধান হবে না। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চলবে, কিন্তু অবিশ্বাসও থাকবে। সিরিয়া ও লেবাননে মাঝেমধ্যে উত্তেজনা দেখা দেবে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য এক ধরনের অস্থির স্থিতাবস্থায় থাকবে, যেখানে বড় যুদ্ধ নেই, কিন্তু সত্যিকারের নিরাপত্তাও নেই। আমার মতে অঞ্চলটি বর্তমানে এই দ্বিতীয় পথেই সবচেয়ে বেশি এগোচ্ছে, কারণ স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি আস্থা গড়ার মধ্যে যে দূরত্ব, তা এখনও অনেকটাই অপরিবর্তিত। অনেক বিশ্লেষকও মনে করেন অঞ্চলটি এই পথেই এগোচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তৃতীয় দৃশ্যপটে বর্তমান সমঝোতা ভেঙে পড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্য আবারও বৃহত্তর সংঘাতের দিকে ফিরে যাবে। এমন পরিস্থিতি কল্পনা করাও কঠিন নয়, একটি প্রক্সি গোষ্ঠীর হঠকারী হামলা, একটি ভুল হিসাব, একটি অসতর্ক বিবৃতি, এসবই যথেষ্ট হতে পারে পুরো প্রক্রিয়া ভেঙে দিতে। সে ক্ষেত্রে শুধু অঞ্চল নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি নতুন ধাক্কায় মুখে পড়বে। তেলের দাম রাতারাতি বেড়ে যাবে, জাহাজ চলাচল ব্যাহত হবে, বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়বে।

কোন দৃশ্যপট বাস্তবে রূপ নেবে তা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কি দীর্ঘমেয়াদি আস্থা গড়তে পারবে? ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য কি সম্ভব? সিরিয়া ও লেবানন কি নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র হবে, নাকি স্থিতিশীলতার পথে যাবে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর নেই, কিন্তু এগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দশকের মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা।

বাংলাদেশের জন্যও এই আলোচনার গুরুত্ব কম নয়। আমরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দুরে, কিন্তু বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে দূরত্ব সবসময় সুরক্ষা দেয় না। জ্বালানির দাম বাড়লে আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা সরাসরি চাপ ফেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ, তাই ওই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে তাদের কর্মসংস্থান ও আয়ও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জাহাজ পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে আমাদের রফতানি পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

জ্বালানির দাম, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, পরিবহন ব্যয়, সবকিছুই আমাদের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বৈদেশিক বাণিজ্যকে বহুমুখী করা এখন আগের চেয়ে বেশি জরুরি। একটি দূরের যুদ্ধও যে কতটা কাছের বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে, সাম্প্রতিক এই সংঘাত আমাদের আরেকবার সেই শিক্ষাই দিয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, এই সংঘাত দেখিয়েছে সামরিক শক্তি এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিকল্প শেষ পর্যন্ত কূটনীতিই। আজ অঞ্চলটি এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে শান্তি ও সংঘাত পাশাপাশি হাঁটছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্য কি সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতার পথে এগোবে, নাকি ইতিহাসের পুরোনো সংঘাতের চক্রে ফিরে যাবে, সেটিই আগামী দশকের মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। যুদ্ধ শুরু করা সহজ। শান্তি ঘোষণা করাও তুলনামূলক সহজ। কিন্তু শান্তিকে টিকিয়ে রাখা, সেটিই সবচেয়ে কঠিন কাজ এবং সেই কঠিন কাজটিই আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের আসল পরীক্ষা।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   সমঝোতা  অবিশ্বাস  শান্তি  কঠিন পথ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: