সরকারি খাদ্য মজুদ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অর্জন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা কিংবা বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী সরকারি মজুদ কার্যকর নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে।
একই সঙ্গে এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্ষমতারও পরিচয় বহন করে। তবে মজুদে নতুন রেকর্ড গড়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে হবে না। এই মজুদ তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা বাজার স্থিতিশীল রাখতে কাজে লাগানো হবে। সাধারণ মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সংগ্রহ করা ধান-চাল বা গম কার্যকরভাবে ব্যবহার করার মধ্যেই প্রকৃত সার্থকতা নিহিত আছে।
রেকর্ড মজুদের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে। সময়মতো বোরো ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছে। সাম্প্রতিক খাদ্যশস্য তুলনামূলকভাবে বিতরণ হয়েছে কম। সরকারের হিসাবে নিরাপদ মজুদের প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় বর্তমান মজুদ অনেক বেশি। ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রশ্নে এটা স্বস্তির খবর।
তবে রেকর্ড মজুদ আমাদের সামনে একটি বাস্তবতাকে হাজির করেছে। সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে সরকারি খাদ্যগুদামে মোট খাদ্য মজুদ হয়েছে ২২ লাখ ৫২ হাজার ৮১৫ মেট্রিকটন। খাদ্যগুদামগুলোতে মোট খাদ্যপণ্যের ধারণক্ষমতা সাড়ে ২২ লাখ মেট্রিকটন। ধারণক্ষমতা বেশি থাকলে এই মৌসুমে খাদ্য মজুদের পরিমাণ ২৫ থেকে ২৬ লাখ মেট্রিকটন ছাড়িয়ে যেত।
সাম্প্রতিক চালের দাম বেড়েছে। দাম বাড়ার এই খবর আমাদেরকে এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মজুদ বাড়লেই বাজার আপনাআপনি স্থিতিশীল হয় না। পর্যাপ্ত সরকারি মজুদ থাকার পরও যদি বাজারে সেই পণ্যের দাম বাড়ে তা হলে মজুদ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা ও বাজার তদারকির সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কেবল গুদামে খাদ্য রাখার মাধ্যমে বাজারে সরকারের উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না।
প্রয়োজন অনুযায়ী উন্মুক্ত বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের মাধ্যমেও বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। একই সঙ্গে শুল্ক ও কর কমানোর সুবিধা ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
খাদ্যশস্য অতিরিক্ত বিতরণ করলে ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় মজুদে টান পড়তে পারে। সরকারকে এ কারণে হয়তো সতর্ক থাকতে হয়। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, এই সতর্কতা যেন নিষ্ক্রিয়তায় পরিণত না হয়। বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক কিন্তু তার দাম বাড়ছে- এমন অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। এই অবস্থায় নিয়মিত বাজার তদারকি জরুরি হয়ে দাঁড়য়। এ জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং প্রতিযোগিতা কমিশনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে রাষ্ট্রের খাদ্যগুদামের ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। খাদ্যের অপচয় কমাতে ও এর গুণগত মান নিশ্চিত করতে আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণের তথ্য স্বচ্ছভাবে নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি।
তা হলে নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং বাজারসংশ্লিষ্টরা বাস্তব পরিস্থিতির যথাযথ মূল্যায়ন করতে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হবেন। মজুদ ব্যবস্থাপনা এমন হতে হবে যেন উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ই উপকৃত হন। কৃষককে ন্যায্যমূল্য দিতে হবে। ভোক্তাকে সহনীয় দামে খাদ্যপণ্য কেনার সুযোগ দিতে হবে।
রেকর্ড মজুদ খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। বাস্তবে মানুষের জীবনে এর কী প্রভাব পড়ে সেটা দিয়ে এই অর্জনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে। সরকারি মজুদের পরিসংখ্যান যেন কেবল রেকর্ডের পাতায় থেকে না যায়, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি। বাজারে স্থিতিশীলতা এলে খাদ্য নিরাপত্তার সাফল্য পূর্ণতা পাবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি