প্রতিশোধের পরিবর্তে বিবেকের জাগরণ

ড. মাহরুফ চৌধুরী

মতামত

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা কেবল তার ভবন, পাঠক্রম কিংবা গবেষণার পরিমাণে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব,

2026-07-07T01:57:59+00:00
2026-07-07T01:57:59+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
প্রতিশোধের পরিবর্তে বিবেকের জাগরণ
ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা কেবল তার ভবন, পাঠক্রম কিংবা গবেষণার পরিমাণে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব, নৈতিক অবস্থান, বৌদ্ধিক সততা এবং সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে। কোনো কোনো শিক্ষক তাদের শ্রেণিকক্ষের সীমানা অতিক্রম করে একটি জাতির বিবেক হয়ে ওঠেন। তারা কেবল জ্ঞান বিতরণ করেন না, বরং চিন্তার পথ দেখান, মূল্যবোধ নির্মাণ করেন এবং সমাজকে আত্মসমালোচনার আয়না উপহার দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন শিক্ষক খুব বেশি নেই, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়ে পড়ে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তাদেরই একজন। একবাক্যে তিনি এক বিরল প্রজাতির মানুষ।

শিক্ষক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, সে কথা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন তার প্রত্যক্ষক্ষশিক্ষার্থীরা। ব্যক্তি হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, তা জানার সুযোগ হয়েছে তার সহকর্মীদের, শুভানুধ্যায়ীদের এবং যারা বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত কারণে তার সান্নিধ্যে এসেছেন। 

Advertisement
আমার নিজেরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালে তার কক্ষেক্ষকয়েকবার একান্তে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সেই অল্প কয়েকটি সাক্ষাৎই তাকে উপলব্ধি করার জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, নিরহংকার এবং শিক্ষার্থীবান্ধব। তার মধ্যে কখনো শিক্ষকদের সেই দূরত্ব সৃষ্টি করা ভাবসাব, আত্মগরিমা কিংবা উদ্ধত মনোভাব দেখিনি। তার কক্ষে প্রবেশ করতে সংকোচ লাগত না, কথা বলতে ভয় হতো না, বরং মনে হতো একজন জ্ঞানী অথচ আন্তরিক মানুষের সঙ্গে আলাপ করছি। তিনি মন দিয়ে শুনতেন, সহজ ভাষায় উত্তর দিতেন এবং এমনভাবে কথা বলতেন যেন তিনি শেখাচ্ছেন না, বরং একসঙ্গে ভাবছেন।

আজকের সময়ে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ক্রমেই আনুষ্ঠানিক ও দূরত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন তার মতো মানুষের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। একজন সত্যিকারের শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রজ্ঞা নয়, তার মানবিকতা। সেই মানবিকতার পরীক্ষায় আবুল কাসেম ফজলুল হক অসাধারণভাবে উত্তীর্ণ ছিলেন। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ দীর্ঘদিন ধরে দলীয়করণ, গোষ্ঠীবিভাজন, পদলেহন ও পদলোভ, প্রশাসনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নানা ধরনের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের করালগ্রাসে আক্রান্ত। 

এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে গভীর শ্রদ্ধাবোধ একসময় ছিল, তা অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। কিন্তু এই অন্ধকার সময়েও যে কয়েকজন শিক্ষক তাদের ব্যক্তিত্ব, নৈতিক দৃঢ়তা এবং বৌদ্ধিক সততার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মানুষের আস্থা ও সম্মান ধরে রেখেছেন, আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি কোনো পদ বা ক্ষমতার কারণে সম্মানিত হননি। তিনি সম্মান অর্জন করেছিলেন তার চিন্তার সততা, আত্মমর্যাদা, নির্লোভ জীবনযাপন এবং সত্য উচ্চারণের সাহস দিয়ে।

বুদ্ধিবৃত্তিক নৈতিক দায়বদ্ধতায় তিনি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক হয়ে থাকেননি। তার লেখালেখি, বক্তৃতা, প্রবন্ধ, চিন্তাচর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বহু মানুষের শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন। যারা কখনো তার ক্লাসে বসার সুযোগ পাননি, তারাও তার বই পড়ে, বক্তৃতা শুনে কিংবা লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তিনি মানুষকে মুখস্থ জ্ঞান শেখাননি; শিখিয়েছেন কীভাবে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে সমাজকে বিশ্লেষণ করতে হয় এবং কীভাবে নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়। 

এমন শিক্ষক বিরল, যিনি ডিগ্রি না দিয়েও হাজার হাজার মানুষের মানসিক গঠন নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি আসে ২০১৫ সালে, যখন তার ছেলে, জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপন সন্ত্রাসীদের নির্মম হামলায় নিহত হন। একজন পিতার জীবনে সন্তানের মৃত্যু সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে অসহনীয় শোক। সাধারণভাবে এমন পরিস্থিতিতে প্রতিশোধের ভাষাই মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়। কিন্তু আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই প্রচলিত মানবিক প্রতিক্রিয়াকেও অতিক্রম করেছিলেন তার আদর্শ ও মানবিক বোধের উপলব্ধি থেকে।

পুত্র হারানোর শোকে কাতর পিতা হিসেবে তিনি প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেননি। তিনি কেবল হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং তিনি বলেছিলেন, তার সন্তানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যদি মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হয়, যদি সমাজ ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, তা হলেই সেই মৃত্যু অর্থবহ হবে। তিনি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, কয়েকজন দুর্বৃত্তকে গ্রেফতার, জেল কিংবা ফাঁসি দিলেই সমাজের গভীর অসুস্থতা দূর হবে না। 

প্রয়োজন মানুষের চিন্তার পরিবর্তন, নৈতিক জাগরণ এবং সামাজিক পুনর্গঠন। এই উচ্চারণ কেবল একজন শোকাহত পিতার বক্তব্য নয়; এটি একজন মানবতাবাদী চিন্তাবিদের বক্তব্য। সন্তান হারানোর অসীম বেদনার মধ্যেও যিনি ব্যক্তিগত প্রতিশোধের পরিবর্তে জাতির নৈতিক পুনর্জাগরণের কথা ভাবতে পারেন, তিনি নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের কাতারে পড়েন না। তিনি অনন্য মানবিক উচ্চতায় পৌঁছানো মানুষদের একজন।

ধর্ম, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র নিয়ে তার চিন্তাভাবনাও ছিল গভীরভাবে মানবিক। তিনি মনে করতেন, ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা রাষ্ট্রধর্ম যেকোনো প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যদি সমাজে বিভাজন, বিদ্বেষ এবং সংঘাত সৃষ্টি হয়, তবে সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জাতির জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠবে। তিনি সমাজবাদী হিসেবে কোনো পক্ষের অন্ধ সমর্থক ছিলেন না; বরং সমাজে সহমত, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বিবেচনাশক্তির বিকাশকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তার কাছে মানুষের কল্যাণই ছিল চূড়ান্ত মূল্যবোধ। 


মতাদর্শের চেয়ে মানুষ, প্রতিশোধের চেয়ে পুনর্মিলন, বিভাজনের চেয়ে ঐক্য- এই প্রত্যাশা ছিল তার জীবনদর্শনের মূল কথা। আজকের বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই দেখি মতের ভিন্নতার কারণে মানুষ মানুষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনীতির মঞ্চ- সর্বত্র ভাষা ক্রমশ আক্রমণাত্মক, অসহিষ্ণু এবং বিভাজনমুখী হয়ে উঠছে। এমন সময়ে আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মানুষের প্রয়োজন আরও বেশি অনুভূত হয়। কারণ তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, প্রকৃত বুদ্ধিজীবী কখনো বিভক্ত সমাজকে আরও বিভক্ত করেন না; বরং মানুষকে সংলাপ, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার পথে আহ্বান জানান।

কোনো মানুষ কেমন, তা বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুহূর্ত হয়তো তার সাফল্যের সময় নয়; বরং তার গভীরতম দুঃখের মুহূর্ত। আপনজন হারানোর শোকের ছায়া ও বেদনা মানুষকে উন্মোচিত করে। কেউ প্রতিশোধে উন্মত্ত হন, কেউ ঘৃণায় আক্রান্ত হন, আবার কেউ ব্যক্তিগত বেদনাকে বৃহত্তর মানবকল্যাণের চিন্তায় রূপান্তর করেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক তৃতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। 

সেই কারণেই তিনি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকই শুধু নন; তিনি পরিণত হয়েছেন একটি নৈতিক উচ্চতার প্রতীকে। একটি বহুধা বিভক্ত, মেরুকৃত এবং ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণু সমাজে তার জীবন ও চিন্তা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি মনে করিয়ে দেন, সত্যিকার আলোকিত মানুষ সেই ব্যক্তি নন, যিনি কেবল জ্ঞানী; বরং সেই ব্যক্তি, যিনি জ্ঞানকে মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন, যিনি ব্যক্তিগত বেদনাকে জাতীয় আত্মসমালোচনার উপলক্ষ করে তুলতে পারেন এবং যিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে বিবেকের জাগরণে বিশ্বাস করেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো এমন মানুষ আমাদের সমাজে খুব বেশি জন্ম নেন না। তারা একটি প্রজন্মের নয়, বহু প্রজন্মের সম্পদ হয়ে থাকেন। তাদের উপস্থিতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাকেই কেবল বাড়ায় না; একটি জাতির নৈতিক শক্তিকে সমৃদ্ধ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিকতার পথ দেখায়। 

নির্দ্বিধায় বলা যায়, আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই বিরল প্রজাতির মানুষদের একজন, যাদের জীবন ও চিন্তা আমাদের দীর্ঘদিন পথ দেখাবে এবং আমাদের আলোড়িত করবে আরও মানবিক, সহিষ্ণু ও সমন্বয়বাদী হতে। ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, বিনয়, নৈতিক দৃঢ়তা এবং গভীর মানবিকতার যে অপূর্ব সমন্বয় তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে আমরা দেখি, তা আজকের সময়ের জন্য যেমন শিক্ষণীয়, তেমনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্যও এক অনন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। জাতির পক্ষ থেকে তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে বিনম্র শ্রদ্ধা।

ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি
ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   প্রতিশোধ  বিবেক  জাগরণ  মতাম্নত 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: