সম্ভাবনার বাংলাদেশ। নানা সংকট, দুর্যোগ ও অস্থিরতায় হোঁচট খেলেও এ দেশ বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় দেখিয়েছে। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা এ দেশের মাটি। এখানকার মানুষ সরল, অমায়িক ও আন্তরিক। এ দেশে কৃষকের হাতে সোনা ফলে, পর্যটকেরা দেশের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে কবিতা লেখেন। কী নেই এখানে? মানুষই একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ, আর সেই সম্পদেরও এ দেশে প্রাচুর্য রয়েছে। কেবল দৈন্যতা রয়েছে মনন, মানসিকতা ও মনোভাবে। পারস্পরিক রেষারেষি, ডিগবাজি ও গিরগিটিপনার কবলে সংকট ও সংশয় আরও ঘনীভূত হয়। অভাব কেবল মনের গভীরতায়। প্রয়োজন সংযম, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের। এটি শুধু স্বপ্ন নয়, মনের আকুতিও বটে। জুলাই-পরবর্তী বাংলায় সাম্য, সৌন্দর্য ও সৌরভের দ্যুতি ছড়াবে—এমনটাই সবার প্রত্যাশা ছিল। এ ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং নাহিদ আখতারদের ব্যক্তিত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, জবাবদিহিতা, দেশপ্রেম, সাহস এবং নাগরিকদের প্রতি দরদ জাতির ললাটে আশার সঞ্চার করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে সবার ঊর্ধ্বে উঠে তারেক রহমান একটি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন বলে অনেকের ধারণা। নাগরিক হিসেবে এসব গৌরব আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। ফলে সংকোচহীনচিত্তে বলা যায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এ যেন কল্পনা নয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর জয়ধ্বনি।
তারেক রহমান বেশ কয়েক বছর বিদেশে কাটিয়েছেন। সেখানকার সমাজ-সংস্কৃতি, সরকার, জনগণ, সেবাব্যবস্থা ও শাসনব্যবস্থা কাছ থেকে দেখেছেন। এসব অভিজ্ঞতা যেমন তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি সেই অভিজ্ঞতা দেশের সেবায় কাজে লাগানোর আগ্রহও তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছে। নির্বাচনপূর্ব সময়ে দেশে ফিরে তিনি সবার মন জয় করার চেষ্টা করেছেন। দেশপ্রেমিক ও আপসহীন নেত্রীর সন্তান হিসেবে উত্তরাধিকারসূত্রে অনেক গুণ অর্জন করেছেন। সে কারণেই বিভেদ ও কলহ ভুলে সবার জন্য একটি বাংলাদেশ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। লোক দেখানো নয়, তাঁর ব্যক্তিত্ব, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও মনোভাব পরখ করলেই তাঁর আগামীর মিশন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। শহীদ হাদীকে ধারণ করেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং নাহিদ ইসলামের বাসায় যাওয়াও তাঁর স্বাভাবিক ও ইতিবাচক মনোভাবের প্রমাণ। তবে চারপাশে সৎ পরামর্শদাতার সংকট রয়েছে; সর্বত্র সুবিধাভোগী ও গিরগিটিবাজদের দৌরাত্ম্য।
ক্ষমতার নিরঙ্কুশ আধিপত্য, হাতে যেন অনেকটা সোনার চামচ, চারদিকে প্রধানমন্ত্রীর বন্দনা—এসবের মধ্যে গা না ভাসিয়ে তিনি এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা নাগরিকদের মনে স্বস্তি ও আশার আলো জাগিয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে সহাবস্থান, পারস্পরিক সৌজন্যবোধ ও শ্রদ্ধা আমাদের আশান্বিত করেছে। ক্ষমতার চেয়ারের তাপ ও যন্ত্রণা তিনি অনুভব করেছেন। জনগণের আমানত ও ঘামের মূল্য দিতে তিনি বদ্ধপরিকর বলেই মনে হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দিন থেকেই অফিসের সময়ানুবর্তিতা, অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল প্রত্যাহার এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মিলেমিশে কাজ করার সংস্কৃতি সবার মাঝে আশা জাগিয়েছে। বিশেষ করে তেলকাণ্ডে সরকার ও বিরোধী দলের সহাবস্থান একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে। তাঁর দৌড়ঝাঁপ দেখে প্রজাতন্ত্রের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ও মন্ত্রীরাও যেন শীতনিদ্রা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। নিকট অতীতে দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ যাত্রায় সফরসঙ্গীর ফর্দ এবং অভ্যর্থনা নিয়ে যে জনভোগান্তি এবং দুম্বাকৃতির বহর দেখা যেত প্রথম সফরে বিপরীত প্রবণতা দেখে ভাবতেই ভালো লাগছে, আমরা বুঝি বদলে যাচ্ছি! নামকরণ-সংক্রান্ত অহেতুক ব্যয় এড়ানো, মশক নিধন প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ সফরে না বলা, বাজেট অধিবেশন শেষে ভূরিভোজে অনীহা এবং বিরোধী দলের নেতার আসনের উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ—সবই ইঙ্গিত দেয়, তিনি জনতার প্রধানমন্ত্রী।
অতীত আমাদের গৌরব ও ঐতিহ্যের স্মারক। এসব অর্জনে কার কতটুকু অবদান রয়েছে, তা মূল্যায়নের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। তবে সে মূল্যায়ন যদি কর্তৃত্ব, বাড়াবাড়ি ও পারস্পরিক দোষারোপের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে, তাহলে তা কতটা সমীচীন—সেটি ভেবে দেখার সময় এসেছে। নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশাকে মূল্যায়ন করতে হবে। ইতিবাচক মনোভাবের মাধ্যমে প্রবীণ ও নবীনের দূরত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব। স্বাধীনতা আমাদের অহংকার। কৃষক, শ্রমিক, জেলে, কুমার, চাকরিজীবী, গৃহিণী, ধনী-দরিদ্র—সবার অংশগ্রহণেই আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। এখানে একক কৃতিত্ব কারও নয়। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝি ও দোষারোপের সংস্কৃতি আমাদের সমাজে এখনও রয়ে গেছে। এসব নিয়ে অনবরত জাবর কেটে কি সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব? এখানে মনে পড়ে হেলেন কেলারের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেলে আরেকটি খুলে যায়; কিন্তু আমরা প্রায়ই বন্ধ দরজার দিকে এত দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকি যে খোলা দরজাটি দেখতে পাই না।’ তাই এখন প্রয়োজন সবার অংশগ্রহণ। বিভাজন কেবল জাতীয় সংকট সৃষ্টি করবে। এর সুযোগ নেবে বৈশ্বিক ও তৃতীয় শক্তি, আর সম্ভাবনার পালে লাগবে কালির ছোপ।
স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। এ দেশের মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সখ্যতাও দেখেছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন কে করেনি? আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয়ের সঙ্গেই তাদের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা এ দেশের মানুষের রয়েছে। নিজের সঙ্গে থাকলে সঙ্গী, আর বিরোধে জড়ালে জঙ্গি—এ কেমন মনোভাব? সময়ের দাবি হলো এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সম্প্রতি স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আলোচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিতর্কের ইতি টানার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যারা সব সময় অতীত নিয়ে পড়ে থাকে, তাদের এক চোখ অন্ধ; আর যারা অতীতকে পুরোপুরি ভুলে যায়, তাদের দুই চোখই অন্ধ। আবার নিকট অতীতে এসব নিয়ে এত বেশি চর্চা হয়েছে, যা সামনের ভবিষ্যৎকে বাধাগ্রস্ত করছে।’ কথাটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতকে ভুলে যাওয়া যাবে না, তবে অতীতের চর্চা যদি ভবিষ্যতের পথরোধ করে, তবে সেটিও শুভ নয়। এ প্রসঙ্গে জর্জ বার্নার্ড শ-র মন্তব্য এখানে বেশ যুতসই মনে হয়েছে ‘যে পরিবর্তনকে ভয় পায়, সে অতীতেই বন্দি থাকে।’ আর হেনরি ফোর্ডের পর্যবেক্ষণেও বলা আছে, ‘জীবনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে শুরু করা।’ অথচ সংসদে প্রতি মিনিটে দুই লাখ বাহাত্তর হাজার টাকার বেশি খরচ করে এসব নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি কী ইঙ্গিত বহন করে?
সময় এখন প্রজন্মের। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, তাঁর বয়স হয়েছে। এ বক্তব্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আস্থা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়। বৃহত্তর স্বার্থে তাঁকে সহযোগিতা করতে হবে। কাজ করেন যিনি, ভুলও তাঁরই হতে পারে। তাই প্রধানমন্ত্রীর ভালো কাজের প্রশংসা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভুলের গঠনমূলক সমালোচনাও জরুরি। এখানেই সংসদ সদস্যদের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে সাংসদ আশরাফ উদ্দিন নিজাম, পানিসম্পদমন্ত্রী, চিফ হুইপ এবং স্পিকারের বিভিন্ন ভূমিকা সর্বমহলে আলোচিত হয়েছে। তবে মওদুদীবাদ, ধর্মীয় ইস্যু, অতীত ভূমিকা, ট্যাগিং ও লেবেলিং নিয়ে কিছু মানুষের মশকরা ইতিবাচক পরিবেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এখানে কবি নজরুলের সেই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ স্মরণ করা যায় ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে বিবি-তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’ অতীতের ছবি, সম্পর্ক ও সহাবস্থানের ইতিহাস কি ইচ্ছা করলেই মুছে ফেলা যায়? অতীত নিয়ে অতিরিক্ত মগ্নতা কি কখনও কখনও কর্তৃত্ববাদী মনোভাবকেই শক্তিশালী করে না? তাই মনোভাব ও মননের পরিবর্তনই এখন সময়ের দাবি।
মানুষের শ্রম, ঘাম ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ। রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক করতে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ এবং নিরলস পরিশ্রম সবার নজর কেড়েছে। তবে এ যাত্রায় সবার অংশগ্রহণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার প্রজ্ঞা, অভিভাবকসুলভ মনোভাব ও আন্তরিকতাও মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। আসুন, অতীতের গণ্ডি পেরিয়ে ভবিষ্যতের পথে হাঁটি। দেশকে এগিয়ে নিতে প্রত্যেককে সজাগ, দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। তবেই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই মন্ত্রকে ধারণ করে আমরা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব। হয়তো একদিন এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, যেখানে দেশটি সত্যিকার অর্থেই সবার হবে। সেই বাংলাদেশ হবে সহমর্মিতা, শ্রদ্ধাবোধ, ন্যায়বিচার ও অংশগ্রহণের বাংলাদেশ। এমন মনোভাব ও মননের বিকাশ ঘটুক—এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা।
অধ্যাপক
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়