প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার (বিসিএম) অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। এই প্রস্তাব বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও উন্নয়ন কৌশলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছে। এর মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আবার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতাও সামনে এসে হাজির হয়েছে। তাই বিষয়টি কেবল একটি অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। আবার কৌশলগত ভারসাম্য রাখাও জরুরি। এ জন্য জাতীয় স্বার্থকে অগ্রগণ্য করতে হবে। বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক প্রয়াস চালাতে হবে।
বাংলাদেশ ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত হয়। এরপর দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ মিলেছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনের পক্ষ থেকে আরও বড় অঙ্কের সম্ভাব্য বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। যা দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি, পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বিসিএম করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিয়ানমার। সমস্যা হচ্ছে, দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলছে। রয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। বিশেষজ্ঞরা দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে চীন, ভারত এবং পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকার কথাও স্বীকার করছেন। কেউ কেউ বলছেন, অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রগণ্য করে নিজের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করবে সেটা একটা প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সমস্যা ঝুলে আছে। এর টেকসই সমাধানের পথ খুলছে না। এই সংকট সীমান্ত নিরাপত্তাকেই কেবল ঝুঁকিতে ফেলেনি, বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক-মানবিক চাপও তৈরি করেছে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে রোহিঙ্গা ইস্যু। বিসিএম করিডোর যদি বাস্তবায়িত হয়, তা হলে তার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার ওপরও এটা প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, করিডোরে অংশগ্রহণের আলোচনাকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কার্যকর অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করা দরকার।
ইতিবাচক দিক হলো, চীনের প্রস্তাবটি বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ না করে পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে। এই সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। পর্যালোচনা যেন কেবল অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে সেই বিষয়ে সজাগ থাকা জরুরি।
নিরাপত্তা ঝুঁকি, ঋণের সক্ষমতা, প্রকল্পের বাস্তবায়নযোগ্যতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াকে বিচক্ষণতার সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া দরকার। উন্নয়ন ও বিনিয়োগের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা চলে না। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে সুপরিকল্পিত। মাথায় রাখতে হবে দীর্ঘমেয়াদে লাভ-ক্ষতির কথা। সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ সমন্বিত কূটনৈতিক ও নীতিগত রূপরেখার ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য ‘টু প্লাস টু’ সংলাপে রোহিঙ্গা সংকটকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ জোরদার করে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমাতে বলছেন।
যেকোনো অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার আগে সংসদীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন এবং ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলা গেলে দেশেরই মঙ্গল হবে। পররাষ্ট্র, অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রকে সমন্বিত করে বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে জাতীয় স্বার্থকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে সংযোগের সেতু হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটা একটা সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য আবেগের ঊর্ধ্বে ওঠা জরুরি। বিচক্ষণতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে সঠিক পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না।
সময়ের আলো/এসএকে