ফেসবুক দুনিয়ায় দুর্লভ সত্য

অপু রায়

মতামত

একসময় মানুষ সংবাদ বলতে বুঝত পত্রিকা, রেডিও কিংবা টেলিভিশনকে। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হতো এবং সম্পাদকীয় নীতি, তথ্য যাচাই

2026-07-03T05:19:29+00:00
2026-07-03T05:19:29+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
মতামত
ফেসবুক দুনিয়ায় দুর্লভ সত্য
অপু রায়
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৫:১৯ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একসময় মানুষ সংবাদ বলতে বুঝত পত্রিকা, রেডিও কিংবা টেলিভিশনকে। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হতো এবং সম্পাদকীয় নীতি, তথ্য যাচাই ও পেশাদার সাংবাদিকতার মাধ্যমে পাঠক বা দর্শকের কাছে পৌঁছাত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির আগমনে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তের মধ্যে জানা যায়। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এখন আমাদের প্রধান তথ্যের উৎস। তবে এই দ্রুতগতির সামাজিক যোগাযোগের যুগে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে-বিশেষ করে যখন বিভ্রান্তি ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ
সম্প্রতি এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভুয়া ভিডিও অনেকের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঘটনাটি হলো, এক ব্যক্তি একটি অপ্রমাণিত ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেন, ভারতের একটি শহরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বেশ কিছু অজানা লোকজন রাস্তায় অগ্নিসংযোগ করছে, সরকারি বাহিনী লাঠিচার্জ করছে। ভিডিওটি ভাইরাল হতে মুহূর্তে হাজারো মানুষ শেয়ার করে, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমও এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু পরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও প্রযুক্তিবিদরা পরীক্ষা করে দেখেন, সেটি ডিপফেক প্রযুক্তি বা ভুয়া ভিডিও, যা মূলত কৃত্রিমভাবে তৈরি। এই ভিডিওটি ছিল একটি বিভ্রান্তিকর চেষ্টার অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভ্রান্তিরও নতুন মাত্রা তৈরি হচ্ছে।

আধুনিক বাস্তবতা ও প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে ফেসবুকের অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে যে, এটি ব্যবহারকারীর আগ্রহ অনুযায়ী বিষয়বস্তু দেখায়। এই অ্যালগরিদমের মূল লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীকে প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় ধরে রাখা। এর ফলে, এমন কনটেন্ট বেশি দেখানো হয়, যা মানুষের আবেগ বা কৌতূহল উসকে দেয়। বিভ্রান্তি ও গুজবের জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায়ই আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে।  

বিশ্লেষকদের মতে, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর খবর সত্যের তুলনায় অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, সাধারণত এই ধরনের খবর মানুষকে বিস্মিত, ভয় বা রাগ অনুভব করায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মিথ্যা খবর সত্যের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময়ের আরেকটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বিভ্রান্তিকর খবর শেয়ারের মূল কারণ হলো এর উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়বস্তু।  

ইকো চেম্বার বা প্রতিধ্বনি কক্ষ
আরেকটি সমস্যা হলো ‘ইকো চেম্বার’ বা প্রতিধ্বনি কক্ষ। যেখানে ব্যবহারকারীর আগ্রহ অনুযায়ী বারবার একই ধরনের কনটেন্ট দেখানো হয়। ফলে, মানুষ তার নিজস্ব মতামতের সঙ্গে মিল থাকা তথ্য বেশি দেখে, অন্য মতামত বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি কম পায়। এই পরিস্থিতি বিশ্বাসের অন্ধকার গহ্বরে ডুবিয়ে দেয় এবং বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তি
বিশেষ করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ডিপফেক প্রযুক্তি দিয়ে এখন খুব সহজে ভুয়া ছবি, অডিও ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। গত বছরই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের এক রিপোর্টে দেখা গেছে, ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এক ভুয়া ভিডিও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। 

ভিডিওতে দেখা যায়, একজন খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক নেতার মুখের অবয়ব ব্যবহার করে একটি অপ্রকাশ্য বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়, যা তিনি কখনো বলেননি। এই ধরনের ভুয়া ভিডিও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, আন্তর্জাতিক 
সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে এবং সত্যের সন্ধান আরও কঠিন করে তোলে।  

উদাহরণ হিসেবে, ২০২৩ সালে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান যুদ্ধের সময় একাধিক ভুয়া ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায়, কিছু ভুয়া ফুটেজে বলা হয়, ইউক্রেনীয় সেনারা নিরীহ জনগণকে আক্রমণ করছে। পরে প্রযুক্তিবিদরা নিশ্চিত করেন, এগুলো ডিপফেক বা বিকৃত ছবি। এই ধরনের ভুয়া ভিডিও তথ্যের জালিয়াতি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।  

সত্য ও বিভ্রান্তির পার্থক্যের চ্যালেঞ্জ
তাই প্রযুক্তির এই অগ্রগতি আমাদের জন্য নতুন দিক খুললেও, এর অপব্যবহারও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যম ও নাগরিকদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। পেশাদার সাংবাদিকদের উচিত, তারা তথ্যের সত্যতা 
নিশ্চিত করে, প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, সাধারণ নাগরিকদের জন্যও আবশ্যক একাগ্রতা ও সতর্কতা। কোনো খবর শেয়ার করার আগে উৎস যাচাই, অন্য নির্ভরযোগ্য সোর্সে খোঁজ নেওয়া এবং আবেগপ্রবণ হয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়াই এখন সময়ের দাবি। 
 
শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা
শিক্ষা ব্যবস্থায় মিডিয়া লিটারেসি বা মিডিয়া জ্ঞান বাড়ানো জরুরি। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে অনলাইনে তথ্য যাচাই করতে হয়, কিভাবে ভুয়া খবর শনাক্ত করতে হয় এবং দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আচরণ করতে হয়।
  
সরকার ও প্রযুক্তি সংস্থার ভূমিকা
সরকার ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া দরকার। তাদের উচিত, ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তি ঠেকানোর জন্য কঠোর নীতি ও প্রযুক্তিগত সমাধান প্রণয়ন করা। পাশাপাশি, জনসচেতনতার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি এবং আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। তবে, এর সঙ্গে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না করে এই প্রচেষ্টা চালাতে হবে।  

আমাদের দায়িত্ব
অবশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, তথ্যের আধিক্য সবসময় জ্ঞানের আধিক্য নয়। ইন্টারনেটে অগণিত তথ্যের ভিড়ে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সত্য ও মিথ্যার মাঝে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে। তাই, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, তথ্য যাচাই ও দায়িত্বশীল ব্যবহারই আমাদের এই সংকট মোকাবিলার মূল অস্ত্র।  

ফেসবুকের যুগে সত্য খবর খুঁজে পাওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন হয়ে উঠেছে। তবে, অসম্ভব নয়। সচেতন ব্যবহারকারী, দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি আমাদের এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। সত্যের পথ হয়তো আগের চেয়ে দীর্ঘ ও জটিল, কিন্তু সেটিই সমাজের অগ্রগতি, গণতন্ত্রের ভিত্তি।  আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্য’। এই বিশ্বাসযোগ্য তথ্য খুঁজে বের করার দায়িত্ব শুধু সাংবাদিকের নয়, আমাদের সবার। 
 
তথ্যপ্রযুক্তি ও আইটি বিশেষজ্ঞ
মতামত লেখকের নিজস্ব 

সময়ের আলো/আআ


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: