মাটি আমাদের কাছে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং নিশ্চয়তার প্রতীক। আমরা ঘর নির্মাণ করি, নগর গড়ে তুলি, স্বপ্ন বুনি এই মাটির ওপর ভর করে। অথচ সেই মাটিই যখন হঠাৎ কেঁপে ওঠে, তখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভেঙে পড়তে পারে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা সভ্যতার কাঠামো। ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার আগমনি বার্তা খুব কমই পাওয়া যায়, কিন্তু যার প্রভাব হতে পারে প্রজন্মব্যাপী।
মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। মানুষ মহাকাশে পৌঁছেছে, সমুদ্রের গভীরে অনুসন্ধান চালিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু এখনও এমন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি, যা নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারে কখন, কোথায় এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হবে। ফলে ভূমিকম্প মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন।
ভূমিকম্প পৃথিবীর একটি স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। পৃথিবীর ভূত্বক কয়েকটি বৃহৎ টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেট ক্রমাগত নড়াচড়া করে এবং পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চিত শক্তি যখন হঠাৎ মুক্তি পায়, তখন সৃষ্টি হয় ভূকম্পন। এই শক্তি ভূকম্পন তরঙ্গের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভূমি কেঁপে ওঠে। অনেক সময় কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এ কম্পনই অনেক মানুষের প্রাণহানি, বিপুল সম্পদহানি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ভূমিকম্পের ভয়াবহতা বুঝতে ইতিহাসের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উপকূলে সংঘটিত ৯.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প থেকে সৃষ্টি হয় এক ভয়াবহ সুনামি। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৪টিরও বেশি দেশ এই দুর্যোগে আক্রান্ত হয়। প্রায় দুই লাখ ত্রিশ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। উপকূলীয় জনপদ মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
২০১১ সালে জাপানের তোহোকু অঞ্চলে সংঘটিত ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্প এবং পরবর্তী প্রলয়ংকরী সুনামি বিশ্বকে আবারও স্তম্ভিত করে। জাপান পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দুর্যোগ-প্রস্তুত দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও এই দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ছিল ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুর্ঘটনা, যা দেখিয়ে দেয় একটি ভূমিকম্প কীভাবে পরিবেশ, প্রযুক্তি ও জননিরাপত্তার ওপর দীর্ঘস্থায়ী সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
সম্প্রতি ২০২৩ সালের তুরস্ক-সিরিয়া ভূমিকম্প আধুনিক বিশ্বের জন্য আরেকটি কঠিন সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে শত শত ভবন ধসে পড়ে, লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে এবং বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞে বিশ্ব আবারও ভূমিকম্পের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে।
বাংলাদেশ সরাসরি ভূমিকম্পের কোনো প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে না থাকলেও দেশের অবস্থান বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্প বলয়গুলোর একটির নিকটবর্তী। ভূতাত্ত্বিকভাবে হিমালয় অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে বিবেচিত হয়। এ অঞ্চলের টেকটোনিক গতিশীলতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বাংলাদেশের মতো নিকটবর্তী অঞ্চলসহ, দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্প ঝুঁকির আলোচনায় রয়েছে।
এই ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রুত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ। রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। একই চিত্র বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বড় নগরেও দেখা যায়। সরু সড়ক, সীমিত উন্মুক্ত স্থান এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ বড় ধরনের ভূমিকম্পের সময় উদ্ধার ও জরুরি সেবা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় পরিকল্পিত নগরায়ণ, নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নির্মাণ খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত। বহু ভবন যথাযথ প্রকৌশল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। কোথাও কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়। এসব অনিয়ম ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ভূমিকম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো সরাসরি ভূমিকম্পে যত প্রাণ যায় তার চেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারায় ভবন ধস, অগ্নিকাণ্ড এবং উদ্ধার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে। একই মাত্রার ভূমিকম্পে একটি দেশে হাজারো প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, আবার অন্য দেশে তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে যার মূল কারণ প্রস্তুতির পার্থক্য।
বর্তমানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, কঠোর বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত দুর্যোগ মহড়ার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশেও জাতীয় বিল্ডিং কোড রয়েছে। কিন্তু এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্মাণে অনিয়ম রোধ, নিয়মিত তদারকি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন নীতিগতভাবে জরুরি অগ্রাধিকারের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সচেতনতার বিকল্প নেই। এই দুর্যোগকালীন সময় কী করতে হবে এই সাধারণ জ্ঞানও বহু প্রাণ বাঁচাতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ এ বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। কম্পন অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি, সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি বা লিফট ব্যবহার অনেক সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায় ভূমিকম্পের সময় ঘরের ভেতরে থাকলে ‘ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড’ পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়। অর্থাৎ নিচু হয়ে মেঝেতে বসা, শক্ত টেবিল বা মজবুত আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং কম্পন থামা পর্যন্ত সেটি দৃঢ়ভাবে ধরে রাখা। এ সময় জানালা, কাচ এবং ভারী আসবাবপত্র থেকে দূরে থাকা নিরাপদ। বাইরে অবস্থান করলে খোলা জায়গায় চলে যাওয়া এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ কিংবা উঁচু ভবন থেকে দূরে সরে থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পরিবারভিত্তিক পূর্বপ্রস্তুতি দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, পানীয় জল এবং জরুরি যোগাযোগ নম্বর আগেই প্রস্তুত রাখা ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলাতে সহায়ক হতে পারে। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির বিষয়।
এ লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স এবং সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া প্রদান সম্ভব হয়।
একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ভবন সংখ্যার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও জনসুরক্ষাকেও গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ইতিমধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবিলায় অর্জিত অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। তবে ভূমিকম্পের মতো আকস্মিক ও বিধ্বংসী দুর্যোগের ক্ষেত্রে প্রস্তুতির আরও উন্নয়ন প্রয়োজন বলে বিভিন্ন গবেষণা ও অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয়।
ভূমিকম্পের সময় ও মাত্রা পূর্বাভাস করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে প্রস্তুতি, পরিকল্পনা এবং সচেতনতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন, নগর পরিকল্পনায় শৃঙ্খলা, নিয়মিত মহড়া এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ভূমিকম্পকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও এর প্রভাব হ্রাস করা সম্ভব এই বাস্তবতা থেকেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি