ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে সকালের সূর্য ওঠা থেকে শুরু করে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ দখল করে নিয়েছে চারকোনা এক টুকরো স্ক্রিন। প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়েও এই ডিজিটাল জোয়ারে সবচেয়ে বেশি ভেসে গেছে আমাদের শিশু-কিশোররা। মাঠের ধুলোবালি, বইয়ের পাতা কিংবা বন্ধুদের আড্ডার জায়গাটি এখন দখল করেছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক আর ইউটিউবের ভার্চুয়াল জগৎ। কিন্তু এই চকমকে আলোর আড়ালে যে এক গভীর অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা আজ আর কারোর অজানা নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই নীল আলো আজ আমাদের সন্তানদের এক অদৃশ্য থাবায় বন্দি করে ফেলেছে, যা তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বিপন্ন শৈশব : পরিসংখ্যান কী বলছে?
সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব এখন আর কেবল ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণায় এর ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। এর মধ্যে প্রতি তিনজনের একজন এটি অনবরত স্ক্রল করে। যুক্তরাজ্যের অফকমের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ থেকে ৭ বছর বয়সি শিশুদের ৩৮ শতাংশই সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। বাংলাদেশের চিত্রও সমান উদ্বেগজনক। দেশের তরুণদের মধ্যে ইন্টারনেট আসক্তির হার প্রায় ২৭.১ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ফলে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিষণ্নতা, একাকিত্ব ও উদ্বেগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
মনোযোগের ঘাটতি এবং মেধার অবক্ষয়
অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কারণে শিশুদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। আকর্ষণীয় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্ট দেখতে দেখতে তাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে যে, তারা কোনো বই, পড়াশোনা বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। ফলে বিদ্যালয়ের ফলাফল খারাপ হচ্ছে এবং গভীর চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। সৃজনশীল চিন্তা করার যে সহজাত ক্ষমতা শিশুদের থাকে, তা সোশ্যাল মিডিয়ার তৈরি করা কৃত্রিম ও সস্তা কনটেন্টের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। তারা এখন নিজেরা কিছু ভাবার চেয়ে স্ক্রিনে অন্যের তৈরি করা জিনিস গিলতেই বেশি পছন্দ করে।
মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর চরম আঘাত
সোশ্যাল মিডিয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশুদের শরীরে ও মনে। দীর্ঘ সময় অলসভাবে বসে স্ক্রিন দেখার কারণে স্থূলতা, চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস এবং মেরুদণ্ডের ব্যথার মতো শারীরিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে ঘুমের। রাতে ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্ক থেকে মেলাটোনিন হরমোন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি হয়, যা মারাত্মক অনিদ্রার জন্ম দেয়। মানসিকভাবে শিশুরা হয়ে পড়ছে অতিসংবেদনশীল, একাকী ও হিংস্র। সোশ্যাল মিডিয়ার অবাস্তব ও ফিল্টার করা নিখুঁত লাইফস্টাইল দেখে নিজেদের সাধারণ জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র হীনম্মন্যতা তৈরি হচ্ছে, যা তাদের আত্মবিশ্বাসকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
সাইবার বুলিংয়ের নির্মম থাবা
ভার্চুয়াল জগতের অন্যতম অন্ধকার দিক হলো সাইবার বুলিং। অনেক শিশু-কিশোরই সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রলিং, বডি শেমিং এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের শিকার হয়। না বুঝে নিজেদের ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য শেয়ার করার পর তা নিয়ে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের। প্রাপ্তবয়স্কদের মতো এই মানসিক চাপ নেওয়ার ক্ষমতা কোমলমতি শিশুদের থাকে না। ফলে তারা চরম ট্রমার মধ্যে চলে যায়, পড়ালেখা ছেড়ে দেয়, সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী পথও বেছে নেয়।
ডিজিটাল প্যারেন্টিং এবং সচেতন নজরদারি
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে আমাদের সন্তানদের শুধু নিয়তি বা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। সন্তানদের পুরোপুরি প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা এই যুগে সম্ভব নয়, আর তা বুদ্ধিমানের কাজও হবে না। সমাধান হলো ডিজিটাল প্যারেন্টিং। সন্তানরা ইন্টারনেটে কী দেখছে, কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে, সে সম্পর্কে মা-বাবাকে সচেতন থাকতে হবে। প্রতিটি ডিভাইসে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সেটিংস ও অ্যাপ ব্যবহার করে ক্ষতিকর ওয়েবসাইট এবং অ্যাপ ব্লক করে রাখা সম্ভব। প্রযুক্তিকে সন্তানের শত্রু না বানিয়ে সেটির নিরাপদ ও শিক্ষণীয় ব্যবহার শেখানোই অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব।
পরিবারে স্ক্রিন-ফ্রি জোন
পরিবারে কিছু কঠোর কিন্তু স্বাস্থ্যকর নিয়ম চালু করতে হবে। যেমন- খাবারের টেবিল এবং শোবার ঘরে কোনো মোবাইল বা গ্যাজেট ব্যবহার করা যাবে না। রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ডিজিটাল ডিভাইস ড্রয়িংরুমে একটি নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখার নিয়ম করা যেতে পারে। একে বলা হয় ডিজিটাল ডিটক্স। মা-বাবা নিজেরা যদি ঘরের ভেতর সারাক্ষণ ফোন নিয়ে পড়ে না থেকে এই নিয়মগুলো মেনে চলেন, তবে সন্তানরাও তা সহজে ও আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করবে। কারণ শিশুরা উপদেশ শুনে যতটা না শেখে, তার চেয়ে মা-বাবার আচরণ দেখে বেশি শেখে।
কোয়ালিটি টাইম ও বন্ধুত্বপূর্ণ পারিবারিক বন্ধন
অনেক সময় একাকিত্ব, একঘেয়ে বা মা-বাবার ব্যস্ততা ও উদাসীনতার কারণে শিশুরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভার্চুয়াল বন্ধু খোঁজে। তাই সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় তাদের সঙ্গে গল্প করা, তাদের স্কুলের অভিজ্ঞতা শোনা, একসঙ্গে খেলা করা এবং তাদের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। সন্তানদের সঙ্গে এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে তারা কোনো সমস্যায় পড়লে বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে ভয় না পেয়ে সবার আগে মা-বাবাকে এসে জানাতে পারে। পারিবারিক দৃঢ় বন্ধনই শিশুর সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ।
বিকল্প বিনোদন ও সৃজনশীলতা
সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল বিনোদনের বিকল্প হিসেবে শিশুদের বাস্তব জীবনের আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। তাদের বিকালে মাঠে খেলতে পাঠানো, সাঁতার শেখানো, সাইকেল চালানো কিংবা ছবি আঁকা, গান, আবৃত্তি ও বই পড়ার মতো সৃজনশীল কাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। ঘরের ছোট ছোট কাজে, যেমন- গাছের পরিচর্যা করা বা ঘর গোছানোয় তাদের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এগুলো তাদের মধ্যে এক ধরনের স্বনির্ভরতা ও কাজের আনন্দ তৈরি করবে, যা তাদের স্ক্রিনের মোহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সাইবার সচেতনতা তৈরি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু পাঠ্যবইয়ের গতানুগতিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ডিজিটাল লিটারেসি বা সাইবার সচেতনতামূলক বিশেষ সেশন পরিচালনা করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ফাঁদ, ভুয়া তথ্য, সাইবার অপরাধ এবং এর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতিগুলো নিয়ে শিক্ষকদের ক্লাসে নিয়মিত আলোচনা করা উচিত। শিক্ষকরা যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিশুদের বোঝাতে পারেন যে ভার্চুয়াল জগৎ বাস্তব নয় এবং এর পেছনে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করা বোকামি, তবে তা শিশুদের মানসিক গঠনে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখবে।
রাষ্ট্রীয় ও আইনি কঠোরতা
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর বয়সসীমা (যেমন সাধারণত ১৩ বছর) যাতে কঠোরভাবে বজায় থাকে, সে ব্যাপারে রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং বা শিশুদের লক্ষ্য করে তৈরি করা ক্ষতিকর ও সুড়সুড়িমূলক কনটেন্ট তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ছাড়া ক্ষতিকর অ্যাপগুলো দেশে যেন সহজে অ্যাক্সেস করা না যায়, সে ব্যাপারে সাইবার নিরাপত্তা বিভাগকে সর্বদা তৎপর থাকতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির জন্ম মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য, ধ্বংসের জন্য নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, যা থেকে সন্তানদের সুরক্ষার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে আগামী দিনে এক মেধাহীন ও সমাজবিচ্ছিন্ন প্রজন্ম পাব। তাই সন্তানের হাতে দামি স্মার্টফোনের বদলে একটি চমৎকার গল্পের বই বা খেলার সামগ্রী তুলে দিই; ভার্চুয়াল দুনিয়ার সস্তা লাইকের চেয়ে বাস্তব জীবনের আসল ভালোবাসা ও মনোযোগ বেশি প্রয়োজন। সন্তানদের সুরক্ষায় আমাদের এই মুহূর্তের সচেতনতাই গড়ে তুলবে একটি সুস্থ, সুন্দর ও স্বনির্ভর আগামী।
প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ
জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, লক্ষ্মীপুর
সময়ের আলো/আআ