বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। বৈশ্বিক যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব সৃষ্টি করলেও এ খাতের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তেমন বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে সম্প্রতি বৈদেশিক বাজারে পোশাক রফতানি কমে গেছে। যুদ্ধের কারণে অনেক প্রবাসী কাজ হারিয়েছে। গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক সংখ্যক শ্রমিক দেশে ফেরত এসেছে। যে কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়েছে। এই ক্ষতি পোষানোর অন্যতম উপায় পোশাক রফতানিতে গতি বাড়ানো।
তাই পোশাক খাতে বৈচিত্র্য এনে বিদেশি বাজার আকর্ষণ করার বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত পোশাক রফতানি ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। সব বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি মারাত্মকভাবে কমছে। ইউরোপ, আমেরিকা, নতুন বাজার- প্রতিটি ক্ষেত্রেই রফতানি হ্রাসের চিত্র স্পষ্ট। এই পরিস্থিতি শুধু বাণিজ্যিক ক্ষতি নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল কারণ হলো বৈশ্বিক অস্থিরতা। যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার- এসবের প্রভাবে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় খুচরা বিক্রেতারা পোশাক কেনা কমিয়ে দিচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশের মতো পোশাকের প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা ও মূল্য দুটিই কমছে। ইউরোপের বাজারে রফতানি গত বছর তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেলেও, বর্তমানে তা নিম্নমুখী। একদিকে চাহিদার সংকট, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া- সব মিলিয়ে এই খাতের জন্য পরিস্থিতি ভালো কিছুর আভাস দিচ্ছে না।
এ বিষয়ে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিগত কয়েক মাস ধরেই কমছে পোশাক রফতানি। প্রধান দুই বাজার ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি যেমন কমছে, তেমনই পোশাকের মূল্যও কমছে। এই বিষয়টি নিয়েই আমাদের দুশ্চিন্তা বেশি। একদিকে যেমন রফতানি আয় কমছে, অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
নতুন বাজারে রফতানি কমে যাওয়ায় আগের অর্ডার বাতিলের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো কম দামে অর্ডার নিচ্ছে, ফলে ক্রেতারা ওই বাজারের দিকে ঝুঁকছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলার জন্য বাজারের বহুমুখীকরণ জরুরি। জাপান, কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের মতো নতুন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুর ওপর জোর দিয়ে পোশাকের বৈচিত্র্য বাড়ানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে শুধু রফতানি বাড়ানোর বিষয় নয়, উৎপাদন খরচ কমানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে। শ্রম ও বিদ্যুৎ-গ্যাসের খরচ কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় বর্তমান সংকট দীর্ঘমেয়াদি হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা দেশের অর্থনীতি ও চাকরির বাজারের জন্য হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নতুন পথ খুঁজে বের করা আবশ্যক। সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শুধু তাই নয়, শিল্প-সংশ্লিষ্টরা প্রযুক্তি ও মান উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে অধিক সতর্ক হবেন ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/আআ