জাতিসংঘের উদ্বেগ-বিবৃতি-সেমিনারই কি যথেষ্ট

মোছা. মায়া আক্তার

মতামত

বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের অধিকার রক্ষা, তাদের দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ২০০১ সাল

2026-06-24T04:52:43+00:00
2026-06-24T04:52:43+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
মতামত
শরণার্থী সংকট মোকাবিলা
জাতিসংঘের উদ্বেগ-বিবৃতি-সেমিনারই কি যথেষ্ট
মোছা. মায়া আক্তার
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ৪:৫২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের অধিকার রক্ষা, তাদের দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ২০০১ সাল থেকে তা পালন করে আসছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক না কেন, বাস্তবতা হলো- বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সংকট দিন দিন আরও জটিল ও গভীর হয়ে উঠছে।

শরণার্থী হওয়ার অর্থ শুধু একটি দেশ থেকে অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়া নয়; এর অর্থ নিজের পরিচয়, শিকড় এবং নিরাপত্তাবোধ হারিয়ে ফেলা। একটি শিশু যখন যুদ্ধের কারণে বিদ্যালয় হারায়, একজন মা যখন পরিবারের নিরাপত্তার জন্য অনিশ্চিত পথে যাত্রা করেন কিংবা একজন বৃদ্ধ যখন জন্মভূমি ছেড়ে অপরিচিত আশ্রয়শিবিরে জীবন কাটাতে বাধ্য হন, তখন শরণার্থী সংকটের প্রকৃত মানবিক চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিসংখ্যানের সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের কান্না, বেদনা, বঞ্চনা এবং টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম।

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করলেও মানবিক সংকট মোকাবিলায় এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। বিশেষ করে শরণার্থী সংকট আজ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। অথচ এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘকে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না।

জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সংকট মোকাবিলা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরণার্থীর সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে সহিংসতা বন্ধে কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগের অভাব এবং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক স্বার্থসংঘাত অনেক সময় জাতিসংঘের কার্যক্রমকে সীমিত করে দেয়। ফলে মানবিক বিপর্যয় চলমান থাকলেও টেকসই সমাধান অধরাই থেকে যায়।

শরণার্থী সংকটের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এটি কোনো একক রাষ্ট্রের সমস্যা নয়; বরং একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকট। একজন শরণার্থী যখন নিজের ঘর, পরিবার এবং জীবনের নিরাপত্তা হারায়, তখন তার সামনে অপেক্ষা করে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আশ্রয়শিবিরের সীমাবদ্ধ জীবন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক সময় মানবিক প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই বেশি গুরুত্ব পায়।

বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের দিকে তাকালে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সংকট বাড়লেও আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ প্রায়ই বিলম্বিত হয় অথবা কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করতে ব্যর্থ হয়।


বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিষয়টি এ বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের ফলে ভয়াবহ সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগেও কয়েক দশক ধরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও দীর্ঘ প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের কার্যকর ও টেকসই সমাধান এখনও দৃশ্যমান হয়নি।

বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাম্পজীবনে আবদ্ধ থাকার কারণে নানা সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি পাহাড় কেটে আশ্রয়শিবির নির্মাণের ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিপুলসংখ্যক শিশু মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন শরণার্থী সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, খরা, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ প্রতি বছর লাখো মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে। সোমালিয়া বর্তমানে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির অন্যতম ভয়াবহ উদাহরণ। দীর্ঘস্থায়ী খরা, খাদ্যসংকট এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে সেখানে লাখো মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

আফগানিস্তানেও সংঘাতের পাশাপাশি জলবায়ুগত দুর্যোগ শরণার্থী সংকটকে আরও তীব্র করেছে। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র টুভালু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। ভবিষ্যতে দেশটির জনগণকে হয়তো নিজ ভূমি ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুত মানুষের অবস্থান এখনও স্পষ্টভাবে স্বীকৃত নয়। ফলে সম্ভাব্য জলবায়ু শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব এখনও যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।

তবে জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতার জন্য শুধু প্রতিষ্ঠানটিকেই দায়ী করা যায় না। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অনিচ্ছা, জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঘাটতিও এ সংকটের বড় কারণ। জাতিসংঘ কোনো অতিরাষ্ট্রীয় সরকার নয়; এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বিত সদিচ্ছা ও সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। যখন সেই সদিচ্ছার অভাব দেখা দেয়, তখন প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতাও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়- বিশ্ব যখন ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকটের মুখোমুখি, তখন কি শুধু উদ্বেগ প্রকাশ, বিবৃতি এবং সম্মেলনই যথেষ্ট? শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ প্রত্যাবাসন, মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দায়িত্বশীল, ঐক্যবদ্ধ এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

আজ শরণার্থী সংকট কেবল মানবিক ইস্যু নয়; এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। জাতিসংঘ যদি এই সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে ভবিষ্যতে বাস্তুচ্যুতি, অস্থিতিশীলতা এবং মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে।

মানবতার এই সংকটময় সময়ে পৃথিবী এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রত্যাশা করে, যেখানে কোনো মানুষ যুদ্ধ, নিপীড়ন কিংবা জলবায়ু দুর্যোগের কারণে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলে তাকে কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা হবে না; বরং একজন পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তার নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে বিশ্বসমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘের নেতৃত্ব, কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মতামত লেখকের নিজস্ব


  বিষয়:   জাতিসংঘ  উদ্বেগ  বিবৃতি  সেমিনার 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: