বাবা হলেন পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা, নির্ভরতার প্রতীক এবং এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নাম। নিজের সব কষ্ট ও শখ বিসর্জন দিয়ে যিনি সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে ও ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে আজীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যান, তিনিই বাবা।
বাবা বাচ্চাদের নিরাপদ আশ্রয়। বাবার উপস্থিতি মানেই মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো ছায়া, যা সন্তানের মনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। বাবারা নিঃস্বার্থ ত্যাগ করে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেন। সন্তানের সব আবদার পূরণে নিজের সামর্থ্যরে বাইরে গিয়েও বাবা চেষ্টা করেন। নিজে কষ্ট করে চললেও সন্তানের কোনো অভাব বুঝতে দেন না। বাবার ভালোবাসা সাধারণত একটু গম্ভীর বা নীরব প্রকৃতির হয়, নীরব অভিভাবক। মুখে হয়তো বেশি কিছু বলেন না, কিন্তু প্রতিটি কাজে সন্তানের প্রতি গভীর মায়া ও চিন্তা লুকিয়ে থাকে।
বাবা সন্তানের প্রথম শিক্ষক ও অনুপ্রেরণা। সন্তানের জীবনের প্রথম হিরো বা আদর্শ হলেন বাবা। কীভাবে জীবনে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হয় এবং সৎপথে চলতে হয়, তার প্রথম পাঠ আসে বাবার কাছ থেকেই। বাবা সন্তানের জীবনের চালিকাশক্তি।
পরিবারকে সব ঝড়-ঝাপটা থেকে আড়াল করে রেখে সচল রাখার মূল কারিগর হলেন বাবা। বাবার এই অপরিসীম ভালোবাসা ও ত্যাগের প্রতিদান কোনোভাবেই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে প্রতিদিন তাকে সম্মান ও ভালোবাসা দেখিয়ে এবং তার বৃদ্ধ বয়সের সঙ্গী হয়ে আমরা বাবাদের প্রতি কিছুটা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি।
খুব স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার যে বাবারা সন্তান লালনপালনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন এবং সন্তানের জীবনে বাবার বিরাট প্রভাব আছে। ছেলেমেয়েদের জীবনে শৃঙ্খলা, ভদ্রতা, মানবিকতা, পরোপকার, বিনয়ী, পরিশ্রমী হওয়া সবকিছু শিক্ষায় এবং চর্চায় বাবার ব্যাপক ভূমিকা। বর্তমান সমাজে মানুষের মধ্যে এই গুণগুলোর ব্যাপক অভাব। সেখানে বাবাদের ভূমিকা কি একটু প্রশ্নবিদ্ধ নয়? আমার মতে বেশ প্রশ্নবিদ্ধ।
বিশ্ব জনসংখ্যায় পুরুষ ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অনুপাত এবং বয়োসন্ধির হিসাব অনুযায়ী ধারণা করা হয়, বিশ্বজুড়ে জীবিত বাবার সংখ্যা প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটির (১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন) কাছাকাছি। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৩ শতাংশের বেশি পুরুষ বিবাহিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, তিরিশোর্ধ্ব পুরুষদের প্রায় ৬৩ শতাংশই দাম্পত্য জীবনে আবদ্ধ। দেশের মোট জনসংখ্যার বয়স কাঠামো ও পরিবার গঠনের হার বিশ্লেষণ করলে অনুমান করা যায়, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবাহিত পুরুষদের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি বা তার বেশি পুরুষ বাবা হয়েছেন।
এদের মধ্যে অনেক পুরুষ আবার একাধিক সন্তানের জনক। সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং বাংলাদেশে সন্তানের প্রাথমিক লালনপালনের ক্ষেত্রে বাবার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান জন্মের পর তাদের বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাবারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
বাবারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিছু বাবা আছেন তারা মনে করেন যে তাদের শুধু ইনকাম বা আয় করতে হবে আর তাদের মা একাই বাচ্চার সব আবেগীয় আবদার পূরণ করবে। সে ক্ষেত্রে আয় করাকে অজুহাত হিসেবে দেখেন এই বাবারা। হয়তো তিনি শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে অনুপস্থিত থাকেন বাচ্চাদের মধ্যে।
তিনি হয়তো বাচ্চাদের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলো এড়িয়ে যান, প্রশংসা করতে ভুলে যান, বাচ্চার জন্মদিন ভুলে যান, অথবা বাচ্চার জীবনের প্রতি কখনোই আগ্রহী বলে মনে হয় না। এই অবহেলাপূর্ণ আচরণের কারণে বাচ্চারা যেমন বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়, তেমনি এসব ছেলেমেয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতেও পারে না। অন্যদিকে বাবা-মায়ের আদর্শগত দিকও বাচ্চাদের প্রভাবিত করে।
সমাজে একটা কথা প্রচুর শোনা যায় যে, মানুষ খারাপ হতে পারে কিন্তু বাবারা, মায়েরা ভালো। এটা কীভাবে সম্ভব? ভালো মানুষ না হয় ভালো বাবা হলো, কিন্তু খারাপ মানুষ কীভাবে ভালো বাবা হয়? বাবা চুরি করে, ঘুষ খেয়ে, জোচ্চুরি করে, চাঁদাবাজি করে, মানুষকে ঠকিয়ে হলেও টাকা কামিয়ে বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছেন, পরাচ্ছেন, বাড়ি করে দিচ্ছেন, গাড়ি কিনে দিচ্ছেন বা সামর্থ্য না থাকলেও অন্যায় পথে টাকা কামিয়ে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াচ্ছেন সে জন্য ভালো বাবা?
একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, এই বাবারা যা করেন সব বাচ্চা বোঝে। বাচ্চারা জানে কী পদে কত বেতন, বাবা কীভাবে আয় করেন, কীভাবে ভাবেন এই বাবা, কীভাবে আয় করে বাড়ি-গাড়ি করছেন। তারা এও জানে এই বাবা এভাবে আয় করছেন শুধু বাচ্চাকে মানুষ করার জন্য নয়। এখানে এই বাবা তার প্রতিবেশীর সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন, কলিগের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন, নিজের স্ট্যাটাস বাড়ানোর হীন চেষ্টাও করছেন আবার এই বিনিয়োগে নিজের লাভও খুঁজছেন।
এই বাবারাই আবার বাচ্চাদের সৎ থাকতে বলেন, সৎ থাকার গল্প বলেন সন্তানদের। কিন্ত ছেলেমেয়ে বড় হলে যেন উপরি কামাই (ঘুষ খাওয়ার সুযোগ) করতে পারে তেমন চাকরি পছন্দ করেন ছেলেমেয়ের জন্য। অনেক পরিবার আছে আমাদের দেশে এখনও যাদের ছেলেমেয়েদের উপার্জনেই চলতে হয় বৃদ্ধ বয়সে।
তবে তারা তাদের ছেলেমেয়েরা কতটুকু দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন সেটার দিকে নজর দিতে চান না বা তাদের অবৈধ আয়টাকে সানন্দে গ্রহণ করেন। বাবারা, ছেলে কীভাবে আয় করল জিগ্যেস করেন না যদি বাবার বেশি টাকার চাহিদা থাকে। এটাই ভাবার বা খুব গুরুত্ব দেওয়ার বিষয় যে, এ ক্ষেত্রে বাবারা সৎ হলে পরিবারের ছেলেমেয়ারা বেশিরভাগই সৎ হন।
পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজে বাবারা যেহেতু সংসারে বড় রকমের প্রভাব ফেলেন বা বাবাদের বড় রকমের প্রভাব আছে সংসারে তাই আজকের দিনে বাবাদের বলব তারা যদি সৎ, আদর্শবান সন্তান চান, আদর্শ সমাজ চান তা হলে সেই উদাহরণ বাবাদেরই তৈরি করতে হবে। পৃথিবীর সব বাবার প্রতি শুভকামনা ও শ্রদ্ধা অশেষ!
লেখক: অতিরিক্ত সচিব, সাবেক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে