২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাজেট। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা বৈদেশিক ঋণ, অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট বাজেটের প্রায় ৫৯ শতাংশ। এবারের বাজেটের মূল বৈশিষ্ট্য হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মানবসম্পদ উন্নয়নে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় এনে মাসিক ২,৫০০ টাকা সহায়তা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা ১,০০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। বেকারত্ব দূর করতে ও তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য ঋণ সহায়তা, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ১০ লাখ টাকা ঋণ এবং আইসিটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসা ও শিল্প খাতকে এগিয়ে নিতে ডি-রেগুলেশন, ব্যবসা সহজীকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। শিল্পে প্রণোদনা হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে কর অব্যাহতির প্রস্তাবও রয়েছে।
দক্ষতা ও সততার সঙ্গে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা গেলে সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে এটি একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
বাজেটের উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিক
১. কর্মসংস্থানভিত্তিক তথা কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণের প্রস্তাব।
২. চিকিৎসাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্বারোপ।
৩. নার্সদের জন্য মাস্টার্স কোর্স চালুর উদ্যোগ, যা ভবিষ্যতে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রফতানিতে সহায়ক হতে পারে।
৪. উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ওপর জোর।
এই চারটি প্রস্তাব সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের জন্য ব্যাপক কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। কারিগরি শিক্ষা কর্মমুখী শিক্ষা; এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, যা বর্তমানে দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। একইভাবে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্ব দিতে হবে এবং নিরাপদ খাদ্য ও দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বাজেটের যৌক্তিকতা
যদিও বাজেটে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, তবু এই সময়ে বড় বাজেটের পক্ষে প্রধান যুক্তি হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। দেশের বর্তমান পর্যায়ে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ চধঁষ কৎঁমসধহ, যিনি ঔড়যহ গধুহধৎফ কবুহবং-এর চিন্তাধারার অনুসারী, একবার বলেছিলেন যে অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেইনসীয় অর্থনীতির মূল ধারণা হলো- সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি মানুষের আয় ও চাহিদা বাড়ায়, ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। বর্তমান সরকারও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা তহবিল গঠন করেছে, যার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্সিং) স্কিম রয়েছে। এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ
১. রাজস্ব ঘাটতি : বাজেটে আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি। এই ঘাটতি পূরণে কর আদায় এবং দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর
করতে হবে।
২. ব্যাংক ঋণের চাপ : সরকার তফসিলি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে, ফলে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৩. কর-জিডিপি অনুপাতের দুর্বলতা : বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮.৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। তুলনামূলকভাবে মালদ্বীপে ২৩.৫ শতাংশ, চীনে ২০.৪ শতাংশ, ভারতে প্রায় ১৯.৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ১৩.৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১৩.১ শতাংশ এবং ভুটানে ১১.৬ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোতে এই হার গড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ।
৪. ব্যয়ের গুণগত মান : শুধু ব্যয় বাড়ালেই হবে না; ব্যয়কে দক্ষ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হতে হবে। অন্যথায় কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না।
করণীয়
১. করের আওতা বৃদ্ধি : শুধু কর আদায়ের দক্ষতা বাড়ালেই হবে না, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
২. বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়া : সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে।
৩. রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার : রাজস্ব বিভাগে আধুনিকায়ন, অটোমেশন, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং নীতি ও প্রশাসনের কার্যকর বিভাজন নিশ্চিত করতে হবে।
৪. জবাবদিহিমূলক ব্যয় : সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো খাতে ব্যয় যেন উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. প্রকল্প মূল্যায়ন উন্নত করা : প্রকল্প গ্রহণের আগে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ করতে হবে এবং সম্ভাব্য উপকারভোগীদের মতামত বিবেচনায় নিতে হবে। জোগাননির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে চাহিদানির্ভর প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উপসংহার
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে এই সুযোগকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। সঠিক বাস্তবায়ন হলে এই বাজেট কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব
সময়ের আলো/জেডি