চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল, ছাত্র সংসদগুলো দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে। আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেবে। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে গণতান্ত্রিক চর্চা শুরু হবে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হলো?
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ছাত্র সংসদ দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ চোখে পড়ে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রত্যাশিত পরিবর্তন এখনও দৃশ্যমান নয়। কোথাও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, কোথাও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ, আবার কোথাও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ছাত্র সংসদের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন সন্তোষজনক নয়। আবাসন সংকট, পরিবহন সমস্যা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, একাডেমিক সংস্কার ও শিক্ষার্থী কল্যাণের মতো মৌলিক বিষয়গুলোয় অগ্রগতি সীমিত। অন্যদিকে কিছু সাংস্কৃতিক আয়োজন, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা প্রশাসনিক কিছু সুবিধা চালুর মতো উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
প্রায় সব প্যানেলই নির্বাচনের সময় নিজেদের শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। ডাকসুকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অবস্থান, রাজনৈতিক প্রচারে অংশগ্রহণ কিংবা বিবৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
জাকসুতেও নির্দলীয় রাজনীতির প্রতিশ্রুতির সঙ্গে পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার রাকসু ও চাকসুর ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রতীকী কার্যক্রম বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অবশ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই কাজ করছেন। প্রশাসনিক বাস্তবতার কারণে তাদের অনেক উদ্যোগ কাক্সিক্ষত গতি পাচ্ছে না।
ছাত্র সংসদের অধিকাংশ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা, বাজেট, নীতিগত অনুমোদন ও সমন্বয় প্রয়োজন। কোনো কোনো ছাত্রনেতা দাবি করেছেন, প্রশাসনের সহযোগিতার অভাব, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, নির্বাচনকালে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবতা সম্পর্কে প্রার্থীদের আগে থেকেই ধারণা থাকার কথা।
ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে সেটাই স্বাভাবিক। ছাত্র সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দলীয় পরিচয় থাকতে পারে। তবে ছাত্র সংসদের কোনো কাজে দলীয় প্রভাব থাকা কাম্য নয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচনি ইশতেহারকে বাস্তবসম্মত ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে। নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ছাত্র সংসদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করতে হবে, যাতে যৌক্তিক প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়।
ছাত্র সংসদ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি। কোনো রাজনৈতিক শক্তির প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়া বা ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি করা ছাত্র সংসদের কাজ নয়। শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, ক্যাম্পাসের সমস্যা সমাধান এবং ভবিষ্যতের দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলাই আদর্শ ছাত্র সংসদের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারছেন সেটা ভালো দিক। তবে ছাত্র সংসদের কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালনে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
এই বাস্তবতা হতাশার বিষয় নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ। ছাত্র সংসদ যদি দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে পারে তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার সংরক্ষণের মধ্যেই ছাত্র সংসদের সার্থকতা নিহিত আছে।
সময়ের আলো/আআ