যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন, আশ্রয়প্রার্থী, কাজের অনুমতি এবং মানবিক সুরক্ষা সবকিছুই এখন দেশটির রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অভিবাসন নীতির পরিবর্তন শুধু অভিবাসীদের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না, এর প্রভাব সরাসরি পড়ে শ্রমবাজার, ছোট ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস বা টিপিএস কর্মসূচি সীমিত ও বাতিল করার উদ্যোগ সেই বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
টিপিএস হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি মানবিক কর্মসূচি। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মহামারি বা অন্য কোনো গুরুতর সংকটের কারণে যেসব দেশের নাগরিকদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া নিরাপদ নয়, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে এটি স্থায়ী অভিবাসন মর্যাদা নয়, গ্রিন কার্ডও নয়। এই সুরক্ষা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা নবায়ন, সীমিত বা বাতিল করা যেতে পারে।
গত কয়েক বছরে হাইতি, এল সালভাদর, ভেনেজুয়েলা, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, সুদান, সোমালিয়া, ইউক্রেন, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ টিপিএস সুবিধার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করেছেন। তাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, পরিবার গড়ে তুলেছেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়েছেন, বাড়ি কিনেছেন, কর দিয়েছেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে শ্রম দিয়েছেন। এখন তাদের একটি বড় অংশের কাজের অনুমতি ও আইনি সুরক্ষা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কয়েকটি দেশের টিপিএস সুরক্ষা বাতিল বা সীমিত করার পথ সহজ করেছে। এর ফলে কয়েক লাখ মানুষ ধাপে ধাপে কাজের অনুমতি হারাতে পারেন। হাইতি এবং কয়েকটি দেশের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কাজের অনুমতি প্রথম দফায় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এরপর এল সালভাদরের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার নাগরিকও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। এদের অনেকেই দুই দশক বা তারও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
সমস্যাটি শুধু এই নয় যে, কয়েক লাখ মানুষ বৈধ কাজের অনুমতি হারাবেন। বড় প্রশ্ন হলো, তাদের জায়গায় কারা কাজ করবেন এবং কত দ্রুত নতুন কর্মী পাওয়া যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার এমনিতেই অনেক খাতে কর্মী সংকটে ভুগছে। নির্মাণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিচ্ছন্নতা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, হোম কেয়ার, প্রবীণসেবা, পরিবহন এবং গুদামজাতকরণ খাতে অভিবাসী শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। টিপিএসধারীদের একটি বড় অংশ এসব খাতে কাজ করেন।
একজন কেয়ারগিভার যদি কাজের অনুমতি হারান, প্রভাব শুধু তার নিজের পরিবারের ওপর পড়ে না। যে বৃদ্ধ ব্যক্তি তার ওপর নির্ভরশীল, সেই পরিবারও সমস্যায় পড়ে। একইভাবে একজন নির্মাণকর্মী কাজ করতে না পারলে শুধু তার আয় বন্ধ হয় না, সংশ্লিষ্ট নির্মাণ প্রকল্প বিলম্বিত হয়, ঠিকাদারের খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাড়ির মালিক বা গ্রাহককে বেশি মূল্য দিতে হয়।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও এই কারণেই উদ্বিগ্ন। ইউএস চেম্বার অব কমার্স কংগ্রেসকে সতর্ক করে বলেছে, বিপুলসংখ্যক বৈধ কর্মীকে হঠাৎ শ্রমবাজারের বাইরে ঠেলে দিলে দেশের কর্মশক্তিতে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু মানবিক সংকটই তৈরি করবে না; বরং ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়াবে, উৎপাদন কমাবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রমিকের সংখ্যা হঠাৎ কমে গেলে মজুরি বাড়তে পারে। সাধারণভাবে বেশি মজুরি শ্রমিকের জন্য ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু বাস্তবে যখন ছোট ব্যবসা প্রয়োজনীয় কর্মী না পেয়ে বেশি বেতন দিতে বাধ্য হয়, তখন তারা পণ্যের দাম বাড়ায়, কাজের সময় কমায় অথবা ব্যবসা সীমিত করে। কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে যেতে পারে। ফলে লাভবান হওয়ার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্ষেত্রে প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বাংলাদেশ বর্তমানে টিপিএস মনোনীত দেশের তালিকায় নেই। তাই শুধু বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার কারণে কেউ এই নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে সরাসরি তার গ্রিন কার্ড, নাগরিকত্ব, বৈধ ভিসা বা কাজের অনুমতি হারাবেন না। মার্কিন নাগরিক, গ্রিন কার্ডধারী, এইচ-১বি, এল-১, স্টুডেন্ট ভিসা, আশ্রয় আবেদনকারী বা পারিবারিক অভিবাসন প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশিদের আইনি অবস্থান টিপিএস থেকে আলাদা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশিরা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও ব্যবসা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকার কারণে বাংলাদেশি অভিবাসী ও ব্যবসায়ীরা পরোক্ষভাবে বড় ধরনের প্রভাব অনুভব করছেন।
বাংলাদেশি গ্রোসারি ও ডেলি ব্যবসাতেও একই ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এসব দোকানে পণ্য গ্রহণ, সাজানো, স্টক ম্যানেজমেন্ট, ক্যাশ কাউন্টার, মাংস কাটার বিভাগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ডেলিভারির জন্য কর্মী প্রয়োজন হয়।
কর্মী সংকট হলে দোকান পরিচালনার সময় কমে যেতে পারে এবং পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে চাল, ডাল, মাছ, মাংস, সবজি এবং অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে। নির্মাণ ও বাড়ি সংস্কারের ব্যবসাতেও বাংলাদেশিদের বড় অংশ রয়েছে। নিউইয়র্ক এবং আশপাশের এলাকায় বহু বাংলাদেশি ঠিকাদার বেজমেন্ট সংস্কার, ছাদ মেরামত, পেইন্টিং, ড্রাইওয়াল, ফ্লোরিং, প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল কাজ এবং বাড়ির অন্যান্য সংস্কারসেবা দিয়ে থাকেন।
তাদের কর্মীদের মধ্যে অনেকেই লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল বা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসী। বাড়ির মালিককেও বেশি খরচ বহন করতে হবে। যে বেজমেন্ট সংস্কারের কাজ আগে ৩০ হাজার ডলারে করা যেত, শ্রমব্যয় ও সময় বেড়ে গেলে সেই কাজের দাম আরও বাড়তে পারে। একইভাবে ছাদ, পেইন্টিং বা রান্নাঘর সংস্কারের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে বৈধ কাজের অনুমতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য কিছু সুযোগও তৈরি হতে পারে। কর্মী সংকট হলে নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং পরিচ্ছন্নতা খাতে মজুরি বাড়তে পারে। কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে এটি একপাক্ষিক লাভ নয়। কারণ আয় বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্যের দাম, সেবার মূল্য এবং বাড়ি সংস্কারের খরচ বাড়তে পারে।
টিপিএস সুবিধাভোগীদের মধ্যে শুধু শ্রমিক নন, ব্যবসার মালিকও রয়েছেন। কেউ রেস্তোরাঁ চালান, কেউ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, কেউ পরিবহন ব্যবসা, আবার কেউ ছোট দোকান পরিচালনা করেন। তাদের আইনি মর্যাদা হারালে শুধু একটি পরিবার নয়; সেই ব্যবসার কর্মচারী, গ্রাহক, সরবরাহকারী এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কাজের অনুমতি হারানো মানুষদের কেউ কেউ অন্য আইনি পথ খুঁজবেন, যেমন আশ্রয় আবেদন, পারিবারিক আবেদন বা অন্য কোনো ভিসা। কিন্তু এসব সুযোগ সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। আবার কেউ বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হতে পারেন। এতে শোষণ, কম মজুরি, অনিরাপদ পরিবেশ, মজুরি না দেওয়া এবং আইনি সহায়তা না পাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অভিবাসন আইন প্রয়োগ করা একটি দেশের অধিকার। তবে যেসব মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে কাজ করছেন, কর দিচ্ছেন এবং সমাজে অবদান রাখছেন, তাদের নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নেওয়া প্রয়োজন। কয়েক লাখ কর্মীকে একসঙ্গে শ্রমবাজার থেকে সরিয়ে দেওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ব্যবসা, পরিবার এবং সাধারণ ভোক্তার ওপর প্রভাব ফেলে।
কংগ্রেস চাইলে একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন বসবাসকারী, কর্মরত, কর প্রদানকারী এবং অপরাধমুক্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ আইনি সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। কাজের অনুমতি ধাপে ধাপে শেষ করা, ব্যবসাগুলোকে নতুন কর্মী নিয়োগের সময় দেওয়া অথবা নির্দিষ্ট খাতে অস্থায়ী সুরক্ষা বাড়ানোও একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান হতে পারে।
বাংলাদেশিরা এই নীতির সরাসরি লক্ষ্য না হলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব থেকে পুরোপুরি আলাদা নন। একজন অভিবাসী হিসেবে তারা প্রতিবেশী কমিউনিটির মানবিক সংকট দেখবেন। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মী সংকট, মজুরি বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয়ের চাপ অনুভব করবেন। একজন কর্মী হিসেবে হয়তো নতুন সুযোগ পাবেন, আবার একজন ভোক্তা হিসেবে বেশি দাম দিতে হবে।
অভিবাসনকে শুধু সীমান্ত, কাগজপত্র বা রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অভিবাসী শ্রম, উদ্যোক্তা, কর প্রদান এবং ভোক্তা ব্যয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই নীতিনির্ধারণের সময় নিরাপত্তা, আইনের শাসন, মানবিক দায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজন সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি।
টিপিএস নিয়ে বর্তমান বিতর্ক সেই বড় বাস্তবতারই অংশ। যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে মনে রাখতে হবে, একটি কাজের অনুমতি হারানোর পেছনে শুধু একজন অভিবাসীর গল্প থাকে না। সেখানে একটি পরিবার, একটি ব্যবসা, একজন বৃদ্ধ রোগী, একটি নির্মাণ প্রকল্প এবং একটি স্থানীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎও জড়িত থাকে।
প্রযুক্তিবিদ, যুক্তরাষ্ট্র
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/আআ