দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে পরিবারতন্ত্র, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিবাদের চক্রে বন্দি ছিল। তবে গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে এক অভাবনীয় রাজনৈতিক রূপান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজপথ থেকে শুরু করে ডিজিটাল স্পেস- সবখানেই এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটেছে। তারা হলো ‘জেন জি’। নব্বই দশকের শেষভাগ থেকে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে জন্মগ্রহণকারী তরুণ প্রজন্ম। প্রথাগত রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট না হয়ে এই তরুণরা আজ ন্যায়বিচার, বাকস্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরাসরি ফ্যাসিবাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলছে।
কেন ফুঁসে উঠছে নতুন প্রজন্ম জেন জি প্রজন্ম এমন এক বিশ্বায়িত পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে তথ্যের অবাধ প্রবাহ বিদ্যমান। ফলে শাসকগোষ্ঠীর পুরোনো প্রপাগান্ডা, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা ভয় দেখানোর সংস্কৃতি এদের কাছে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানের নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ায় তারা স্পষ্ট বুঝতে পারছে কীভাবে রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ তাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করছে। অন্যায়, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন যখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে, তখন এই ডিজিটাল সচেতনতাই রাজপথের সরাসরি প্রতিরোধে রূপান্তরিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও তরুণদের ক্ষোভ দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের অসন্তোষের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি গভীর অর্থনৈতিক সংকট। উচ্চশিক্ষা শেষে বেকারত্ব, আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি ও চরম বৈষম্য আজ তরুণদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে সেই সম্ভাবনাই একসময় রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নেয়; মেধার অপচয় ঘটে এবং থমকে যায় উন্নয়ন।
পাশাপাশি উন্নয়নের সুফল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে বন্দি থাকলে বঞ্চনার ক্ষোভ আরও তীব্র হয়, যা পরবর্তীতে গণআন্দোলনে বিস্ফোরিত হয়। তাই তরুণদের ক্ষোভকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া না দেখে, একে মানসম্মত কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির আকুলতা হিসেবে দেখা উচিত। তরুণদের মেধা ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগের মাধ্যমেই কেবল টেকসই উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব।
শ্রীলঙ্কা : ফ্যাসিবাদের মূলে তরুণদের আঘাত
দক্ষিণ এশিয়ায় জেন জি আন্দোলনের আধুনিক সূচনা ঘটেছিল শ্রীলঙ্কায়। চরম অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতি এবং রাজাপক্ষ পরিবারের ফ্যাসিবাদী শাসনের দাপটে দেশ যখন দেউলিয়া হয়ে পড়ে, তখন দেশটির তরুণ সমাজ রাজপথে নেমে আসে। শ্রীলঙ্কার সিংহলি ভাষায় ‘আরাগলায়া’ (সংগ্রাম) নামে পরিচিত এই আন্দোলন কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দলের অধীনে পরিচালিত হয়নি। তরুণরা কলম্বোর ‘গল ফেস গ্রিন’-এ তাঁবু খাটিয়ে মাসের পর মাস অহিংস প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষকে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, গণদাবি ও তরুণদের ইস্পাতকঠিন ঐক্যের সামনে ফ্যাসিস্ট শক্তির পতন অনিবার্য।
বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব : রক্তে লেখা জয়ের গল্প
২০২৪ সালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী কিন্তু সফল তরুণ বিপ্লবের সাক্ষী হয়। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই স্বৈরাচারী শাসনের পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে জেঁকে বসা স্বৈরাচার যখন ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে বুলেট, বুট এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর দমন-পীড়ন চালায়, তখনও জেন জি রাজপথ ছেড়ে যায়নি। আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ শত শত তরুণের আত্মত্যাগ এবং হাজারো মানুষের রক্তে অর্জিত হয় এক নতুন স্বাধীনতা। বাংলাদেশের এই গণঅভ্যুত্থান বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু সাহসের জোরে তরুণরা কীভাবে একটি নির্মম স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করতে পারে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে নেপালের তরুণরা
হিমালয়কন্যা নেপালেও জেন জি প্রজন্ম তাদের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ও অবস্থান স্পষ্ট করেছে। প্রতিনিয়ত সরকার পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং প্রবীণ নেতাদের অদক্ষতায় অতিষ্ঠ হয়ে দেশটির তরুণ সমাজ ‘যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়’ আন্দোলনের সূচনা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সচেতনতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা সুশাসনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেট ও পরিবারতন্ত্রের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে তরুণ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মেয়র এবং সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে শুরু করেছেন। নেপালের জেন জি প্রমাণ করেছে যে, কেবল রাজপথের উত্তাল আন্দোলনই নয়, ব্যালট বাক্সের নীরব বিপ্লবেও ফ্যাসিবাদী মানসিকতা ও প্রথাগত পরিবারতন্ত্রকে উৎখাত করা সম্ভব।
ভারতের ফ্যাসিবাদবিরোধী নতুন গণজাগরণ
দক্ষিণ এশিয়ার এই তরুণ প্রতিরোধের ঢেউ ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও স্পষ্ট দৃশ্যমান। উগ্র জাতীয়তাবাদ, তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণ এবং ভিন্নমত দমনের ফ্যাসিবাদী নীতির বিরুদ্ধে ভারতের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ কিংবা পশ্চিমবঙ্গ- সর্বত্রই তরুণরা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে নিজেদের কণ্ঠস্বর জোরালো করছে। লাগামহীন বেকারত্ব, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ভারতের জেন জি আজ একতাবদ্ধ হচ্ছে। সামাজিক বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে তারা রুটি-রুজি ও মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন তুলে ধরে শাসকগোষ্ঠীকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বৈশ্বিক মানবিক সংকটের চিত্র ও পরিসংখ্যান
জাতিসংঘের প্রাক্কলন ও পূর্বাভাস অনুযায়ী বৈশ্বিক মানবিক সংকট ও সংঘাতের তীব্রতা দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের শুরুর দিকে যেখানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে বিশ্বজুড়ে সংকটে থাকা ও সহায়তাপ্রত্যাশী মানুষের এই সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখে দাঁড়িয়েছে। মূলত ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত এবং তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণে এই বৈশ্বিক সংকট প্রতিনিয়ত আরও বিস্তৃত রূপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের ফলে যখন সাধারণ জনগণ এই চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে, তখন অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জেন জি বা তরুণ প্রজন্মের সামনে রাজপথের একমুখী ও আপসহীন আন্দোলন ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকে না।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রাজপথ
দক্ষিণ এশিয়ার এই তরুণ বিপ্লবের প্রধানতম শক্তি হলো তাদের অভিনব ও বৈচিত্র্যময় আন্দোলন কৌশল। তারা প্রথাগত কোনো একক বা দৃশ্যমান নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়, যার ফলে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী আন্দোলন দমন বা নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে গিয়ে চরম বিভ্রান্তিতে পড়ছে। হ্যাশট্যাগ কূটনীতি, ব্যঙ্গাত্মক ‘মিম’, দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতি, র্যাপ সংগীত এবং দ্রুত যোগাযোগের জন্য এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে তারা চোখের পলকে হাজার হাজার মানুষকে সংগঠিত করছে। শাসকরা যখন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও গণমাধ্যমে কঠোর সেন্সরশিপ চাপায়, তখনও এই তরুণরা বিকল্প প্রযুক্তির সাহায্যে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার সত্য চিত্র পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় জেন জি বিপ্লব
বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভারতের তরুণ জাগরণ আজ আর কেবল নিজ নিজ ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই; এর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়। বিশেষ করে পাকিস্তান, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মির কিংবা মিয়ানমারের মতো কঠোর সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থাকা অঞ্চলের অবরুদ্ধ তরুণ সমাজ এই আন্দোলনগুলো থেকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নতুন অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। এই অঞ্চলের জেন জি বিশ্বকে স্পষ্ট দেখিয়ে দিয়েছে- শাসকগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রযন্ত্র যতই শক্তিশালী বা নির্মম হোক না কেন, দেশের তরুণ প্রজন্ম যদি একবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়, তবে কোনো ফ্যাসিস্ট শক্তির পক্ষেই তাদের পদদলিত করে টিকিয়ে থাকা সম্ভব নয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় জেন জির এই ফুঁসে ওঠা কেবল সরকার বদলের আন্দোলন নয়, এটি ব্যবস্থা পরিবর্তনের সংগ্রাম। তরুণরা এমন এক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছে যেখানে মৌলিক অধিকার, সামাজিক বিচার ও বাকস্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকবে। এই পথ রক্তস্নাত ও কাঁটাযুক্ত, কিন্তু তরুণদের এই অদম্য স্পৃহা প্রমাণ করে যে ফ্যাসিবাদের দিন শেষ হয়ে আসছে। ইতিহাস সর্বদা রূপান্তরকামীদের পক্ষেই কথা বলে, আর একবিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ায় সেই ঐতিহাসিক রূপান্তরের অগ্রযাত্রীর নাম- জেন জি।
প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ
জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ
রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/আআ