কয়েক দশক আগে বাংলাদেশ যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে হাম নির্মূলের প্রায় স্বীকৃতির দোরগোড়ায় পৌঁছেছিল, তখন এই অর্জনকে দেখানো হতো দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি মুকুটমণি হিসেবে।
টিকাদানের হার ছিল শতকরা পঁচানব্বই ভাগের কাছাকাছি বা তারও বেশি এমন এক সংখ্যা, যা মহামারিবিদদের ভাষায় ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি করে দেয় এবং একটি জনগোষ্ঠীর ভেতর রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাকে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনে। সেই অর্জনটুকু রাতারাতি ভেঙে পড়েনি। বরং তা ক্ষয়ে গেছে ধীরে ধীরে একটি স্থগিত কর্মসূচি, একটি বাতিল অভিযান, আর কেনাকাটার নিয়মে একটি প্রশাসনিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে। আর সেই ক্ষয়ের ফল এখন দেশ ভোগ করছে ভয়ংকরতম আকারে।
চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ছয় মাসেরও কম সময়ে হাম সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা হাজারের কোঠা ছাড়িয়েছে। এই সময়ে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে, পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে প্রায় বিশ হাজার রোগী, আর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দেড় লাখের কাছাকাছি শিশু। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স উভয়ের হিসাবেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের শিকার দেশ।
সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে আঁতকে উঠার মতো একটি চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২২ সালে সারা দেশে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র তিনশ এগারোজন। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় দুইশ বিরাশিতে। ২০২৪ সালে আরও কমে দুইশ সাতচল্লিশ, আর ২০২৫ সালে একশ বত্রিশ অর্থাৎ একটি ধারাবাহিক নিম্নগামী রেখা, যা বলছিল রোগটি নিয়ন্ত্রণে আসছে। অথচ ২০২৬ সালে এসে সেই সংখ্যা এক লাফে প্রায় বিশ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। এই লাফ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, কোনো নতুন ভাইরাসের আবির্ভাবও নয়; এটি একান্তই মানুষের তৈরি এক সংকট।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ২০২৪ সাল থেকেই বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে টিকা পরিস্থিতি নিয়ে অন্তত দশবার মৌখিকভাবে সতর্ক করেছিল। শুধু তাই নয়, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচটি চিঠি পাঠিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। সবশেষ চিঠিটি পৌঁছেছিল ঠিক নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগমুহূর্তে।
এখানেই এই সংকটের প্রকৃত চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন নয় যে, তথ্যের অভাবে হাম মহামারির আকার ধারণ করেছে। বরং তথ্য থাকা সত্ত্বেও নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জড়তার কারণে আজকে দেশকে বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। হাম নিয়ে দশটি মৌখিক সতর্কতা আর পাঁচটি লিখিত চিঠি— এই পনেরোটি সংকেতের প্রতিটিই ছিল একেকটি সুযোগ। সতর্ক হলে লাখো শিশুকে সময়মতো টিকার আওতায় আনা যেত। অথচ প্রতিটি সতর্ক সংকেতই যেন প্রশাসনিক গোলকধাঁধার ভেতরে হারিয়ে গেছে। এই ঘটনা আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়— রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে সতর্কবার্তা পাঠানোর পথ যতটা খোলা, তার শোনার এবং তাতে সাড়া দেওয়ার পথ ততটাই সংকীর্ণ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে স্বীকার করেছেন, টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণেই মূলত এই সংকট তৈরি হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ২০২৪ সালে একটি নির্ধারিত টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত এবং ২০২৫ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। একটি সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়মকানুন বদলাতে গিয়ে, একটি ক্রয়প্রক্রিয়া পুনর্বিন্যস্ত করতে গিয়ে লাখো শিশু কার্যত টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে।
হামে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে অভিভাবকদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে— শয্যা খালি নেই, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি, আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা রোগীর চাপ। হাম নিজে থেকে যতটা না প্রাণঘাতী, তার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে এর জটিলতাগুলো নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, তীব্র অপুষ্টি। আর ঠিক এই জটিলতাগুলো মোকাবিলার জন্যই প্রয়োজন হয় সুসংগঠিত ও প্রস্তুত একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা যা বর্তমান পরিস্থিতিতে হিমশিম খাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই একই সময়ে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের টিকা এসেছে প্রায় এক কোটি আটাত্তর লাখ ডোজ যা মোট চাহিদার তুলনায় সামান্য একটি অংশ মাত্র। এই সংখ্যাটি আসলে পুরো সংকটের একটি নির্মম সারসংক্ষেপ। টিকা সরবরাহের এই ঘাটতি বোঝায় সমস্যাটি কেবল অর্থের নয়; এটি পরিকল্পনার, পূর্বাভাসের এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার। একটি ক্রয়নীতি বদলানোর আগে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা, একটি কর্মসূচি স্থগিত করার আগে তার বিকল্প পরিকল্পনা রাখা এসব মৌলিক প্রশাসনিক বিচক্ষণতার অভাবেই আজ দেশ এই মূল্য দিচ্ছে।
প্রশ্ন এখানে উঠাই স্বাভাবিক; একটি প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময়সীমা কি শিশুদের জীবনরক্ষার সময়সীমার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে? উত্তরটি সহজ, কিন্তু বাস্তবায়নে সেই সারল্য যেন হারিয়ে যায় বারবার। রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় যখন একটি রুটিন কর্মসূচি ‘সাময়িকভাবে স্থগিত’ রাখা হয়, তখন প্রশাসনিক খাতাপত্রে তা হয়তো একটি সাধারণ প্রশাসনিক নোট হিসেবেই থেকে যায়। বাস্তবে সেই স্থগিতাদেশের খেসারত দিতে হয়েছে হাজারো শিশুকে। প্রশাসনিক ভাষা আর জৈবিক বাস্তবতার মধ্যে এই দূরত্বই বোধহয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাঁক।
শুধু সরবরাহ সংকট নয়, এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে আরেকটি কম আলোচিত কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া টিকাবিরোধী ভুল তথ্য এবং জনমনে তৈরি হওয়া সংশয়। বিশ্বজুড়েই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানের হার কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন এই আস্থার ঘাটতিকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যখন সরবরাহ ব্যবস্থা টালমাটাল, ঠিক তখনই যদি জনমনে টিকা নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধে, তা হলে দুটি সংকট মিলেমিশে তৈরি করে আরও একটি গভীর বিপর্যয়। প্রাপ্যতার সংকট আর আস্থার সংকট এই দুটি যখন একই সঙ্গে ঘটে, তখন কেবল টিকা সরবরাহ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হয় না; পাশাপাশি প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, যা প্রতিটি অভিভাবকের মনে টিকার নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি করতে পারে।
এখানে একটি তুলনা প্রাসঙ্গিক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়, বন্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসিত একটি মডেল তৈরি করেছে। পূর্বাভাস পাওয়ার পর ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এই দেশের আছে। অথচ একই দেশ যখন জনস্বাস্থ্যের একটি পূর্বাভাসযোগ্য সংকটের মুখোমুখি হলো যার জন্য প্রস্তুতির সময় ছিল বছরের পর বছর, সতর্কবার্তা ছিল একাধিক তখন সাড়া দেওয়ার গতি হয়ে গেল শ্লথ। এই বৈপরীত্যই বলে দেয়, সক্ষমতার অভাব এখানে মূল সমস্যা নয়; সমস্যা হলো অগ্রাধিকার নির্ধারণ আর প্রাতিষ্ঠানিক সাড়াদানের সংস্কৃতিতে।
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার তাৎক্ষণিক পথ স্পষ্ট— জরুরি ভিত্তিতে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা, হাসপাতালে শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা এবং যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে বিশেষ ক্যাচ-আপ টিকাদান অভিযান পরিচালনা করা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন আরও গভীর একটি সংস্কার যাকে বলা যেতে পারে ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি’ তৈরি করা। একটি ব্যবস্থা যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কবার্তা, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ কিংবা মাঠপর্যায়ের তথ্য কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক মেয়াদের ওপর নির্ভর করে হারিয়ে যাবে না। মন্ত্রী বদলাবেন, সরকার বদলাবে, নীতিনির্ধারকরা আসবেন এবং যাবেন কিন্তু শিশুদের টিকা পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জিম্মায় থাকতে পারে না।
টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়তো প্রয়োজনীয় সংস্কারের অংশ ছিল। কিন্তু যেকোনো সংস্কারের একটি মৌলিক নীতি হলো পুরোনো ব্যবস্থা ভাঙার আগে নতুন ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা, একটি সেতুবিহীন গিরিখাতের ওপর দিয়ে হাঁটতে না দেওয়া। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই নীতি বিশেষভাবে প্রযোজ্য, কারণ এখানে প্রতিটি বিলম্বিত সিদ্ধান্তের মূল্য পরিশোধ করে সবচেয়ে অরক্ষিত মানুষরা; যাদের নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর নেই, যারা নিজেদের হয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না। হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, এই সত্যটিই এই মৃত্যুগুলোকে আরও বেশি অসহনীয় করে তোলে।
বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে ছিল। সেই অর্জন কোনো অলৌকিক ঘটনা ছিল না। বছরের পর বছর ধারাবাহিক পরিশ্রম, সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা আর অগণিত স্বাস্থ্যকর্মীর নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই সংক্রামক রোগের ওপর লাগাম টেনেছিল বাংলাদেশ। সেই অর্জন আজ ধূলিসাৎ হয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে এই বিপর্যয় এড়ানো যেত। এই বৈপরীত্য থেকে যে শিক্ষা নেওয়ার, তা হলো জনস্বাস্থ্যের অর্জন কখনো স্থায়ী নয়; তা প্রতিদিনের সতর্কতা, প্রতিটি সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব না করার দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে। দশবার ঘণ্টা বাজানোর পরও যদি কেউ দরজা না খোলে, তা হলে দোষ ঘণ্টার নয়; দোষ সেই কানের, যা শুনতে অস্বীকার করেছিল। বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ আছে সেই কান খুলে রাখার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করার, যাতে পরের সতর্কবার্তাটি আর কোনো ফাইলের নিচে চাপা না পড়ে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে