আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস : সুরক্ষিত থাকুক ত্বক-চোখ

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

মতামত

প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সংরক্ষণ দিবস পালিত হয়। সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীর জীবজগৎকে সুরক্ষায় বায়ুমণ্ডলের

2026-09-16T04:47:56+00:00
2026-09-16T04:47:56+00:00
 
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস : সুরক্ষিত থাকুক ত্বক-চোখ
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৪৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সংরক্ষণ দিবস পালিত হয়। সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীর জীবজগৎকে সুরক্ষায় বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবেশের ভারসাম্যের পাশাপাশি মানুষের ত্বক, চোখ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপরও নানা ধরনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ওজোন সংরক্ষণ তাই শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, শিশুদের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার সঙ্গেও যুক্ত। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও রৌদ্রপ্রধান দেশে অতিবেগুনি রশ্মি সম্পর্কে সচেতনতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

ওজোনস্তর কী?

ওজোন তিনটি অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে গঠিত একটি গ্যাস। বায়ুমণ্ডলের সমতামণ্ডলে ওজোনের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি। সেখানে গড়ে ওঠা ওজোনস্তর সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির বড় অংশ শোষণ করে পৃথিবীর জীবজগতের জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা তৈরি করে। সূর্যের আলো জীবনের জন্য অপরিহার্য হলেও অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মি ত্বক ও চোখের ক্ষতি করতে পারে। তাই ওজোনস্তরকে পৃথিবীর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচ বলা হয়।

ওজোনস্তর ক্ষয়ের কারণ

কিছু মানবসৃষ্ট রাসায়নিক পদার্থ বায়ুমণ্ডলে গিয়ে ওজোন অণু ভেঙে দিতে পারে। ক্লোরোফ্লোরোকার্বন, হ্যালন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড, মিথাইল ক্লোরোফর্ম ও মিথাইল ব্রোমাইড এ ধরনের ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। অতীতে ফ্রিজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফোম উৎপাদন ও বিভিন্ন শিল্প ক্ষেত্রে এসব রাসায়নিক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৯৮৭ সালে মন্ট্রিয়ল প্রটোকল গ্রহণ করা হয়। এর মাধ্যমে ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমানোর জন্য বিশ্বব্যাপী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অতিবেগুনি রশ্মি ও মানবস্বাস্থ্য

ওজোনস্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির একটি বড় অংশ শোষণ করা। অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে ত্বকে রোদে পোড়া, লালচে ভাব, জ্বালাপোড়া ও প্রদাহ হতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত সংস্পর্শে থাকলে ত্বকের অকাল বার্ধক্য এবং কিছু ধরনের ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণে তীব্র রোদ থেকে সুরক্ষা নেওয়া শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ।

বাংলাদেশের স্থানীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাংলাদেশে বছরের উল্লেখযোগ্য সময় উষ্ণ আবহাওয়া ও তীব্র সূর্যালোক থাকে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে তীব্র রোদে বাইরে কাজ করা মানুষের ওপর অতিরিক্ত তাপ ও অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব পড়তে পারে। কৃষক, জেলে, নির্মাণশ্রমিক, রিকশা ও ভ্যানচালক, সড়ককর্মী, পরিবহনকর্মী এবং খোলা জায়গায় ব্যবসা করা মানুষের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে ত্বকের ক্ষতির পাশাপাশি শরীরে অতিরিক্ত তাপের প্রভাব, পানিশূন্যতা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। শহরাঞ্চলেও ঝুঁকি রয়েছে। কংক্রিটের ভবন, পাকা রাস্তা, যানবাহনের ধোঁয়া ও নগর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে তীব্র গরমের অনুভূতি বাড়তে পারে। ফলে নগরবাসীর জন্যও রোদ থেকে সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।


ত্বক সুরক্ষায় ব্যবহারিক করণীয়

সময় বুঝে বাইরে যান : সম্ভব হলে দিনের সবচেয়ে তীব্র রোদে অপ্রয়োজনীয় বাইরে থাকা কমিয়ে দিন; ছায়া ব্যবহার করুন : মাঠ, রাস্তা বা কর্মস্থলে সম্ভব হলে গাছ, ছাউনি বা ভবনের ছায়া বেছে নিন; শরীর ঢেকে রাখুন : ফুলহাতা পোশাক, টুপি ও ছাতা ব্যবহার করা যেতে পারে; মুখ ও ঘাড় সুরক্ষিত রাখুন : দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে শরীরের উন্মুক্ত অংশগুলো অতিরিক্ত সূর্যালোক থেকে রক্ষা করা জরুরি; পর্যাপ্ত পানি পান করুন : গরমে বাইরে থাকলে নিয়মিত পানি পান করুন। তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করা ভালো এবং বিরতি নিন : দীর্ঘসময় রোদে কাজ করতে হলে মাঝেমধ্যে ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত।

চোখ সুরক্ষায় ব্যবহারিক নির্দেশনা

অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মি চোখের স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শের সঙ্গে ছানি ও চোখের পৃষ্ঠের কিছু সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।

চোখ সুরক্ষায়— তীব্র রোদে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করুন। প্রয়োজন হলে অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধকারী মানসম্মত চশমা ব্যবহার করা যেতে পারে। সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকুন। শিশুদের দীর্ঘসময় প্রচণ্ড রোদে খেলতে না দেওয়াই ভালো। চোখে ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী লালভাব, অস্বস্তি বা দৃষ্টির পরিবর্তন হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

শিশুদের বাড়তি সুরক্ষা

শিশুরা খেলাধুলা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বাইরে বেশি সময় কাটাতে পারে। শৈশব ও কৈশোরে অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ পরবর্তী জীবনে ত্বক ও চোখের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুদের পুরোপুরি রোদ থেকে দূরে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং নিরাপদভাবে বাইরে থাকার অভ্যাস তৈরি করা দরকার। খেলার জায়গায় ছায়ার ব্যবস্থা, তীব্র রোদে অবস্থানের সময় কমানো, টুপি ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত।

প্রবীণদের প্রতিও নজর

বয়স্ক ব্যক্তিদের অনেকেই দীর্ঘসময় বাইরে চলাফেরা করেন। তাদের ত্বক ও চোখের বয়সজনিত পরিবর্তনের সঙ্গে অতিরিক্ত সূর্যালোকের প্রভাব যুক্ত হতে পারে। তাই প্রবীণদের বাইরে যাওয়ার সময় ছাতা, টুপি ও প্রয়োজনীয় চোখের সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে দীর্ঘসময় রোদে থাকার কারণে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত গরম অনুভূত হলে দ্রুত ছায়াযুক্ত ও ঠান্ডা স্থানে বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন।

স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করণীয়

শিশুদের সুরক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও ভূমিকা রয়েছে। বিদ্যালয়ের মাঠে পর্যাপ্ত ছায়ার ব্যবস্থা করা, তীব্র রোদের সময় দীর্ঘক্ষণ মাঠে কার্যক্রম না রাখা এবং শিক্ষার্থীদের পানি পান করার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের পরিবেশ, ওজোনস্তর এবং অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সহজ ভাষায় জানানো হলে ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।

ওজোন স্তর ও জলবায়ু পরিবর্তন

ওজোনস্তর ক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তন একই সমস্যা নয়, তবে দুটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। কিছু ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থ একই সঙ্গে শক্তিশালী উষ্ণতাবর্ধক গ্যাস হিসেবে কাজ করে। এসব পদার্থের ব্যবহার কমানো একদিকে ওজোনস্তর রক্ষায় সহায়তা করে, অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলাতেও অবদান রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ওজোন সংরক্ষণ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে সমন্বিত পরিবেশ-স্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

জনসচেতনতাই বড় শক্তি

ওজোনস্তর সম্পর্কে মানুষের ধারণা যত বাড়বে, পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণও তত সহজ হবে। স্কুল-কলেজ, গণমাধ্যম, চিকিৎসক, পরিবেশকর্মী ও সামাজিক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে তীব্র রোদে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষকে অতিবেগুনি রশ্মির ঝুঁকি, ত্বক ও চোখের সুরক্ষা এবং তাপজনিত অসুস্থতার প্রাথমিক সতর্কতা সম্পর্কে সহজ ভাষায় জানানো প্রয়োজন।

আমাদের করণীয়

ওজোনস্তর রক্ষায় ব্যক্তি পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব পণ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার, ক্ষতিকর রাসায়নিকের অপব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং পুরোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও ফ্রিজের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো পরিবেশবিধি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে ধারাবাহিক কর্মসূচি প্রয়োজন।

সুস্থ মানুষের জন্য প্রয়োজন সুস্থ পরিবেশ। সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীর জীবজগৎকে সুরক্ষায় ওজোনস্তরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর সুরক্ষা শুধু পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তারও অংশ। আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সংরক্ষক্ষণ দিবসে অঙ্গীকার হোক— ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করব, পরিবেশ দূষণ কমাতে দায়িত্বশীল হব, তীব্র রোদে ত্বক ও চোখের যথাযথ সুরক্ষা নেব এবং শিশু, প্রবীণ ও বাইরে কর্মরত মানুষের নিরাপত্তায় সচেতন থাকব। ওজোন রক্ষা মানে শুধু বায়ুমণ্ডলের একটি স্তরকে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রত্যাশা।

লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস  সুরক্ষিত  ত্বক  চোখ 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: