ঢাকা শুধু একটি শহর নয়, দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনের প্রধান কেন্দ্র। সবচেয়ে বড় কথা ঢাকা হচ্ছে বাংলাদেশের রাজধানী। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ এবং সমন্বয়হীন ব্যবস্থাপনায় রাজধানী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। যানজট, ফুটপাথ দখল, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি, জলাবদ্ধতা, বায়ু ও শব্দদূষণ এখন নগরজীবনের রোজকার সমস্যা। শহরে অনেক অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে রাজধানীর জনসংখ্যা, পরিবেশ ও নাগরিক সেবার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব অবকাঠামো তৈরি করা যায়নি।
ঢাকার পরিবেশগত অবনতির চিত্রটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ঢাকায় সবুজ এলাকা ও খোলা জায়গা ছিল ৫৩ দশমিক ১১ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৮৫ বর্গকিলোমিটারে। গত আট বছরে রাজধানী প্রায় অর্ধেক সবুজ ও উন্মুক্ত এলাকা হারিয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলাধার ও খাল দখল। এ কারণে বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। একটি শহরে প্রয়োজন অনুযায়ী জলাধার ও সবুজ না থাকলে তার পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়। নানা গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার তাপমাত্রা বাড়ছে, বায়ুর মান অত্যন্ত খারাপ। বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান বরাবরই ওপরের দিকে।
শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা ও প্রশাসনিক সেবার বেশিরভাগই রাজধানীকেন্দ্রিক। যে কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ঢাকায় আসতে বাধ্য হচ্ছে। গ্রাম ও জেলা শহরে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। আর্থ-সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে রাজধানীতে আসছেন। নদীভাঙন ও নানা দুর্যোগও মানুষকে শহরমুখী করছে।
শুধু ঢাকার ভেতরে আরও অবকাঠামো তৈরি করে এই সংকটের টেকসই সমাধান হবে না। এ জন্য প্রয়োজন কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ। জেলা ও বিভাগীয় শহরে ভালো হাসপাতাল ও মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। রাজধানীর বাইরে পর্যাপ্ত শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া নেওয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ রাজধানীর আশপাশের নগরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উন্নত করে কার্যকর স্যাটেলাইট নগর হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
ঢাকার সব সমস্যার কারণ শুধু জনসংখ্যা নয়। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও অনেক সমস্যা তৈরি করে। একই সড়ক এক সংস্থা সংস্কার করার পর আরেক সংস্থা আবার সেটা কাটছে। ফুটপাথগুলো দখল হয়ে গেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল। রাষ্ট্রের দুর্বল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাগরিকের দায়িত্বহীনতা। অনেকেই যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলছে, অপ্রয়োজনে হর্ন বাজাচ্ছে, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। এসব কারণে রাজধানী ধীরে ধীরে বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে হলে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আবার এটিও ঠিক যে, নাগরিক দায়িত্ব পালনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে রাষ্ট্রকেই।
রাজধানীকে বাসযোগ্য করার জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার। খাল, পুকুর ও জলাধার দখলমুক্ত করে সংরক্ষণ করতে হবে। বাড়াতে হবে সবুজের সীমানা। ফুটপাথগুলোকে পথচারী চলাচলের উপযোগী করতে হবে। বিভিন্ন সংস্থার সড়ক কাটার কাজে সমন্বয় নিশ্চিত করা দরকার। সব ধরনের দূষণ রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
সর্বোপরি জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নগর পরিকল্পনা ও বিকেন্দ্রীকরণ করা না গেলে রাজধানীর সংকট ভবিষ্যতে আরও তীব্র হবে। দেশের সব সুযোগ এক শহরে কেন্দ্রীভূত থাকা অর্থনৈতিকভাবে অস্বাস্থ্যকর। তাই সময় থাকতে ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি