জীবনের শেষ প্রান্তে একা যেজন

সৈয়দা নাসরিন সুলতানা

মতামত

প্রবীণ মানে বয়সের ভারে নুয়েপড়া মানুষ। বয়সের ভার, চোখে কম দেখা বা না দেখা, শরীরের ব্যথা কিংবা অসুস্থতা, খেতে পারা

2026-09-12T05:58:11+00:00
2026-09-12T05:58:11+00:00
 
  শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
জীবনের শেষ প্রান্তে একা যেজন
সৈয়দা নাসরিন সুলতানা
প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৫৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রবীণ মানে বয়সের ভারে নুয়েপড়া মানুষ। বয়সের ভার, চোখে কম দেখা বা না দেখা, শরীরের ব্যথা কিংবা অসুস্থতা, খেতে পারা না-পারা— সবকিছু মিলিয়েই একজন মানুষ প্রবীণ হয়ে ওঠেন। এই প্রবীণ মানুষটিকে আমরা কতটা মূল্যায়ন করি? 

এই প্রবীণ মানুষটি কারও বাবা-মা, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানি। তাদের হাতেই আমরা বাজারের ব্যাগ তুলে দিই, নিশ্চিন্ত মনে সন্তানদের রেখে যাই। তাদের কাছ থেকে সবটুকু সুবিধা নেওয়ার পরও আমরা তাদের প্রাপ্য অধিকার ও সম্মানটুকু দিতে পারি না। এর প্রকাশ ঘটে নানা ছোট ছোট ঘঁনায়— খাবারের টেবিলে সবচেয়ে ছোট টুকরাটি তার প্লেটে দেওয়া, শোবার ঘরে সবচেয়ে কমদামি চাদরের বিছানা দেওয়া, পুরোনো মগে পানি দেওয়া কিংবা ব্যবহৃত তোয়ালে ব্যবহার করতে দেওয়া।

একজন বাবা যখন জীবনের সবকিছু উজাড় করে সন্তানকে দেন, সেই বাবাকেই একসময় সন্তানের কাছে ওষুধ কেনার টাকা হাত পেতে নিতে হয়। কী আশ্চর্য এই পৃথিবী! বাবা-মায়েরা কষ্ট করে সন্তানদের লালন-পালন করেন, তাদের প্রতিষ্ঠিত করেন; অথচ সেই প্রতিষ্ঠিত সন্তানদেরই আবার বাবা-মায়ের সাহায্য করতে হয়। সারাজীবন কষ্ট করে সন্তান মানুষ করার পরও অনেক সন্তান বাবা-মায়ের শেষ সম্বল, আশ্রয়টুকু কেড়ে নিতে দ্বিধা করে না।

বাবারা বাইরের কাজে, মায়েরা ঘরের কাজে সাহায্য করেন। বাবারা বাজার করেন, মায়েরা রান্নাবান্না করেন, নাতি-নাতনিদের স্কুলে নিয়ে যান— সন্তানরা নানা কাজ তাদের দিয়ে করিয়ে নেয়। সামান্য ভুল হলেই অনেকে তাদের কটু কথা বলতে ছাড়ে না। 

ছেলেমেয়ের সংসারে থাকলে প্রবীণ বাবা-মাকে কত যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তা লিখে শেষ করা যাবে না। বাবার সিগারেট খাওয়া, মায়ের পান খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখা যায় না। বন্ধুবান্ধবের কথা তো বাদই দিলাম। এককথায় বাবা হয়ে যান গৃহকর্মী আর মা হয়ে যান আয়া বা গৃহপরিচারিকার মতো। নিজের বলে আর কিছুই থাকে না।

ধনী সন্তানদের ক্ষেত্রে চিত্রটি অনেক সময় আরও ভিন্ন। তারা নতুন বাড়ি কিনে অন্যত্র চলে যায়। আসার কথা বলেও আসে না; ফোনেই দায়িত্ব সারে। বাবা-মা অসুস্থ হলে হাসপাতালে রেখে আসে অথবা নার্স রাখে। তারপরও নিজেরা নিয়মিত দেখভাল করে না।

প্রবীণদের মধ্যে নারীদের কষ্ট অনেক সময় আরও বেশি। স্বামী-স্ত্রী একই বয়সি হন বা বয়সে কমবেশি হলেও স্ত্রীই অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর দেখভাল করেন। এর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের আবদার, নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা— সবই তাকে করতে হয়। এমনও দেখা যায়, মেয়ে ও জামাই কিংবা ছেলে ও পুত্রবধূ চাকরি করে। তখন পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে প্রবীণ নারীর ওপর। কী রান্না হবে, কখন রান্না হবে, কে কী খাবে— সবকিছুর দায়িত্ব তার কাঁধে।

কাজে যাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের প্রস্তুত করে দেওয়া, বাচ্চাদের স্কুলের ব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া, এমনকি তাদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও অনেক সময় এই প্রবীণ নারীর ওপর পড়ে। কোনো কোনো সন্তান ছুটির দিনে বাজারের বড় ফর্দ তৈরি করে, খাবারের মেনু ঠিক করে, বন্ধুবান্ধবকে দাওয়াত দেয় এবং বাড়তি কাজের চাপ তৈরি করে। এতে প্রবীণ নারীর ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ বাড়ে। অবসর নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় দিন কাটাতে হয়। অথচ এই সন্তানরাই বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে সপ্তাহে দুদিন রান্না করে নিতে পারে অথবা বাইরে খেয়ে নেয়।

সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রবীণ মানুষগুলো বড়ই একা। সন্তানদের সান্নিধ্য পাবেন— এই আশায় তারা সন্তানদের কাছে থাকেন। অথচ সন্তানরা নিজেদের ব্যস্ততার অজুহাতে অনেক দূরে সরে থাকে। তখন তাদের আপনজন হয়ে ওঠে বন্ধুবান্ধব। যে সন্তানরা মায়ের গর্ভে থাকাকালে একান্তে তার সবচেয়ে কাছের ছিল, বড় হয়ে সেই সন্তানরাই আর কাছে থাকে না। এমনকি কাছে বসে দুটো কথা বলার সময়ও তাদের হয় না। সান্নিধ্য নামের বিষয়টিই যেন তারা ভুলে যায়।

বয়সের ভারে যখন বাবা-মায়েরা ঠিকমতো চলতে পারেন না, তখন তাদের হাত ধরার মতো কাউকে পাওয়া যায় না। ছোট ছোট চাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকেও তারা বঞ্চিত হন। বাবা-মায়েরা বেশি দিন বেঁচে থাকলে তাদের অনেক কিছুই দেখতে হয়— ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, বেদনা-বিয়োগ। একসময় অনেক সন্তানের কাছেই তারা বোঝাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ান। তখন এসব বাবা-মায়ের যন্ত্রণা না তারা পারেন বলতে, না পারেন সহ্য করতে।

প্রবীণরা আমাদের বোঝা নন। তারা আমাদের শিকড়, আমাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার এবং আমাদের জীবনেরই এক দীর্ঘ অধ্যায়। যে বাবা-মা আমাদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে তাদের হাত ধরে হাঁটানোই আমাদের দায়িত্ব। তাদের প্রয়োজন শুধু অর্থ নয়; প্রয়োজন সম্মান, সময়, সঙ্গ, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা। একটি সমাজ কতটা মানবিক, তার বড় পরীক্ষা হলো সেই সমাজ তার প্রবীণ মানুষদের কীভাবে দেখে ও কীভাবে তাদের সঙ্গে আচরণ করে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   জীবনের শেষ প্রান্ত  প্রবীণ 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: