শূন্য দশমিক এক শতাংশ। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান এর চেয়েও কম। অথচ ২৬ আগস্ট ল্যাংটাং জাতীয় উদ্যানের একটি হিমবাহ ধসে যাওয়ার পর যে কাদা-পাথর-বরফমিশ্রিত জলোচ্ছ্বাস ত্রিশূলী নদী বেয়ে প্রায় একশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে রাসুয়া আর নুয়াকোট জেলা ভাসিয়ে দিল, তার আর্থিক হিসাব দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিতে। মৃতপ্রায় তেরোশ মানুষ, নিখোঁজ আরও কয়েক হাজার। যে দেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই ভয়ংকর সংকট তৈরি করেনি সেই দেশকেই এখন সবচেয়ে বেশি মাশুল গুনতে হচ্ছে। এই ঘটনাকে নিছক একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতির চরম ব্যর্থতা এবং একটি অসম বৈশ্বিক কাঠামোর প্রতিচ্ছবি।
উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ল্যাংটাং লিরুং হিমবাহ মাসে গড়ে দশ মিলিমিটার করে সরছিল। কিন্তু ধসের কয়েক সপ্তাহ আগে সেই গতি হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পাহাড়ি অঞ্চলের পারমাফ্রস্ট গলতে শুরু করেছে। এই বরফস্তর গলা মানেই হিমবাহ ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। ২০২১ সালে মেলামচি নদীর বন্যা এবং ২০২৫ সালে একই এলাকায় হিমবাহী হ্রদ বিস্ফোরণ নেপালের হিমালয় অঞ্চলকে বছরের পর বছর ধরে ঠিক একই সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল। প্রকৃতি বারবার জানান দিচ্ছিল সামনে বড় বিপদ আসছে। এবার শুধু সেই বিপদের মাত্রাটা অকল্পনীয়ভাবে বড় হয়ে গেছে। প্রশ্নটা তাই কেন হলো সেটা নয় বরং এরপর কী হবে। আর ঠিক এই জায়গাতেই উন্নত বিশ্বের দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর কঠিন বাস্তবতার ফারাক সবচেয়ে নগ্নভাবে আমাদের সামনে ধরা পড়ে।
জাতিসংঘের বহু প্রতীক্ষিত লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলে এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে নেপাল। দেশটির নীতিনির্ধারকরা আশা করছেন— বোর্ড তাদের ঋণ নয় বরং ক্ষতিপূরণ হিসেবে অনুদান দেবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের এই অপরিমেয় ক্ষতি এবং ভবিষ্যতের চরম ঝুঁকি ইতিমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই তহবিলের ভেতরের হিসাব নিকাশ ঘাঁটলে যে চিত্র বেরিয়ে আসে তা আক্ষরিক অর্থেই এক বিরাট শুভঙ্করের ফাঁকি। পুরো তহবিলের আকার এখন পর্যন্ত মোট সাড়ে তিনশ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। শুরুতে এটি ছিল ২৫০ মিলিয়ন ডলার, পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে আরও ১০০ মিলিয়ন যোগ করা হয়েছে। অথচ প্রথম দফাতেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ১৮০টি প্রকল্প প্রস্তাব জমা পড়েছে, যার সম্মিলিত অর্থের চাহিদা ইতিমধ্যে ২.৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, নিয়ম অনুযায়ী একটি দেশ সর্বোচ্চ বিশ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ পেতে পারে। সহজ হিসাব করলে দাঁড়ায়, নেপালের পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির বিপরীতে তাদের সম্ভাব্য প্রাপ্তি শূন্য দশমিক এক থেকে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক চার শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক তাৎক্ষণিক পাঁচ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে ঠিকই কিন্তু ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে সেটা নিতান্তই প্রতীকী পরিমাণ ছাড়া আর কিছুই নয়। একটি দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা যখন পুরোপুরি ধসে পড়ে, তখন এই ধরনের নামমাত্র সাহায্য কোনো অর্থই বহন করে না।
বাংলাদেশের দিকে তাকালেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। বাংলাদেশও একই তালিকায় থাকা একটি কম নিঃসরণকারী অথচ অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। আমাদের উপকূল প্রতিনিয়ত ক্ষয়ে যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ছে বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ হারে, দ্বীপ ও চর সমুদ্রে বিলীন হচ্ছে, আর যে জমি টিকে আছে, সেখানেও লোনা জল ঢুকে আবাদি জমি অনুর্বর করে দিচ্ছে, লাখো মানুষকে বাধ্য করছে ভিটেমাটি ছাড়তে।
একসময়ের তথাকথিত সাদা স্বর্ণ বা চিংড়ি শিল্পের আগ্রাসন এবং ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের পেশাগত জীবন সম্পূর্ণ বদলে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে তারা কৃষি থেকে অকৃষি পেশায় যুক্ত হচ্ছে অথবা বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। যখন বড় কোনো বিপর্যয়ে আমাদের চূড়ান্ত প্রলয়ের পালা আসবে তখন আমাদেরও ঠিক একই ধীরগতির ফান্ড, একই সাড়ে তিনশ মিলিয়নের অসম ভাগাভাগি এবং একই ঋণ না অনুদান বিতর্কের মুখোমুখি হতে হবে।
এই সংকট সমাধানের পথ অত্যন্ত সুস্পষ্ট, এখানে ঘাটতি রয়েছে কেবল সদিচ্ছার। প্রথমত জলবায়ু অর্থায়নকে পুরোপুরি অনুদান ভিত্তিক মডেলে রূপান্তর করতে হবে। দ্বিতীয়ত লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড নামের এই শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে বেরিয়ে এসে অবিলম্বে একে পর্যাপ্ত পুঁজি দিয়ে সক্ষম করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ অবিলম্বে মওকুফ করা দরকার, যাতে তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য নিজেদের বাজেটে রাজস্বের জায়গা তৈরি করতে পারে।
শিক্ষার্থী, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা