বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ‘ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি’ স্লোগানে নতুন লোগোর জন্য আইডিয়া ও নকশা আহ্বান করেছে রাষ্ট্রীয় এই সম্প্রচারমাধ্যমটি। অথচ বিটিভির লোগোর সঙ্গে আমাদের শৈশবের স্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
বিটিভির বর্তমান লোগোটির সঙ্গেও দীর্ঘ ইতিহাস যুক্ত। সবুজ বেষ্টনীর মধ্যে উদীয়মান লাল সূর্যের প্রতীকসমৃদ্ধ লোগোটির নকশার সঙ্গে শিল্পী ইমদাদ হোসেন, কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার ও মহিউদ্দিন ফারুকের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিশেষ করে মুস্তাফা মনোয়ারের তত্ত্বাবধানে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারের সময়ে ১৯৮০ সালে বিটিভি রঙিন সম্প্রচারে যাওয়ার সময়ও লোগোটির রঙিন রূপ ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন তিনি। এই স্মৃতি এবং তার বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্টকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের মতো ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ক যা করে গিয়েছেন, তা কয়েকটি মৌলিক ও অনেকগুলো গুণগত পরিবর্তন এনেছিল। একে পরিবর্তন করার জন্য একজন যোগ্য ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক কাজী জেসিন কেন এ ধরনের ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন, তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্ম ও ভূমিকার ঐতিহাসিক তাৎপর্য আগামী যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের উদ্যোগে ১৯৬৪ সালের ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানের লাহোরে প্রথম টেলিভিশন সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়। দ্বিতীয় টেলিভিশন সেন্টারটি করা হয় বাংলাদেশে (তখন পূর্ব পাকিস্তান)। ঢাকার ডিআইটি ভবনে (বর্তমান রাজউক ভবন) ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তান টেলিভিশন করপোরেশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হয়।
টেলিভিশনে প্রচারিত প্রথম অনুষ্ঠানে প্রথম গান গেয়েছিলেন ফেরদৌসী রহমান। গানটি ছিল আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা— ‘এই যে আকাশ নীল হলো আজ/ এ শুধু তোমার প্রেমে’। টেলিভিশন কেন্দ্রের প্রথম প্রযোজক ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার, জামান আলী খান ও মনিরুল আলম। অনুষ্ঠান বিভাগের প্রথম ব্যবস্থাপক ছিলেন কলিম শরাফী। সে সময় প্রযুক্তির অভাবে সব অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। তখন চ্যানেল ছিল একটিই এবং তা চলত সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত। টিভির সম্প্রচার সীমা ছিল ঢাকা শহরের চারপাশে ১০ মাইল; তবে এর বাইরে ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও ফরিদপুর থেকেও দেখা যেত। ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপন, সেটি পুরোপুরি চালু করা এবং কিছুদিন দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল জাপানি টেলিভিশন কোম্পানি এনএইচকে।
১৯৭১ সালের ৪ মার্চ পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ঢাকা টেলিভিশন’ নামে পরিবর্তিত হয় এবং টেলিভিশন শিল্পীরা পাকিস্তান টেলিভিশনের কাজ প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানের পতাকা ও জাতীয় সংগীতের পরিবর্তে তৎকালীন বাংলাদেশের পতাকা ও জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ দেখানো শুরু হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’ নাম ধারণ করে এবং পিটিভির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়। ১৯৭২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত করপোরেশন থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭৪ সালে নেটওয়ার্কটি নাটোর উপকেন্দ্র উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রথম শাখা বিস্তার করে।
জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ঢাকার রামপুরায় বিটিভির নিজস্ব ভবন, দফতর ও স্টুডিও নির্মিত হয়। ১৯৭৭ সালে ফজলে লোহানী বিবিসির ‘দ্য ডেভিড ফ্রস্ট শো’-এর আদলে বিটিভির জন্য একটি নতুন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’ শুরু করেন, যা উনার মৃত্যুর ঠিক পরেই শেষ হয়।
১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের সময়েই বাংলাদেশ টেলিভিশন রঙিন সম্প্রচার শুরু করে, যার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম আনুষ্ঠানিক পূর্ণকালীন রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচারের সূচনা হয়। বিটিভির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে শিক্ষণীয় বিষয় ভিত্তিক ‘নতুন কুঁড়ি’ নামক প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে।
পরে ১৯৮৫ সালে সাতক্ষীরা উপকেন্দ্রের মাধ্যমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও বিটিভির টেরেস্ট্রিয়াল সিগন্যাল পৌঁছাতে শুরু করে। এটি ১৯৯২ সালে বিবিসি এবং সিএনএনের সম্প্রচার রিলে করা শুরু করে, যা বাংলাদেশে বিদেশি টেলিভিশনের প্রথম উপস্থিতি চিহ্নিত করে। ১৯৯৪ সালে বিটিভি প্রথম প্যাকেজ নাটক আতিকুল হক চৌধুরী পরিচালিত ‘প্রাচীর পেরিয়ে’ প্রচার করে। পরে আবারও নতুন করে শুরু হয় ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বরে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশন অনেকগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান তৈরি করেছে। যেমন— ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’ ইত্যাদি। এতে ‘আলিফ লায়লা’ এবং ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’-এর মতো বিদেশি ধারাবাহিক ও অনেক জনপ্রিয় কার্টুন প্রচারিত হতো, যা নেটওয়ার্কটির তুমুল সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
পরবর্তীতে বিটিভির পাশাপাশি স্যাটেলাইট ও বেসরকারি টেলিভিশনের উত্থান ঘটে, যেখানে প্রথমে এটিএন বাংলা ও চ্যানেল আই যাত্রা শুরু করে। এরপর ২০০০ সালে প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন হিসেবে একুশে টেলিভিশন আত্মপ্রকাশ করে। বিগত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৭ সালের এক জরিপে দেখা যায়, কেবল টেলিভিশন দর্শকদের মধ্যে মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ স্থানীয় টেলিভিশন দেখেন। এর মধ্যে বিটিভি সবচেয়ে কম দর্শকসংখ্যা পেত, যার বড় অংশই ছিলেন গ্রামীণ দর্শক, যাদের কাছে শুধুমাত্র টেরেস্ট্রিয়াল বিটিভি দেখার সুবিধা ছিল।
২০০৫ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন ১৪টি উপকেন্দ্র স্থাপন করে, যার মাধ্যমে দেশের ৯৩ শতাংশ এলাকায় সম্প্রচার পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। ২০০৪ সালে ‘বিটিভি ওয়ার্ল্ড’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিভিশন আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট সম্প্রচার শুরু করে। এরপর ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারিতে সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়, যা জাতীয় সংসদ ভবন থেকে সরাসরি অধিবেশন ও অনুষ্ঠান প্রচার করে আসছে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের এই ইতিহাস দীর্ঘ। যেসব বিশিষ্ট শিল্পী ও কার্টুনিস্টদের যৌথ প্রচেষ্টায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং যেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ অসংখ্য দুর্লভ স্মৃতি ও তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে, সেই বিটিভির লোগো পরিবর্তনের এই উদ্যোগ নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনা চলছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
লেখক : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি