ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের পরিচিত জ্বর নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। সাধারণ জ্বরের মতো শুরু হলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকায় এ সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
ডেঙ্গুকে ভয় পাওয়ার চেয়ে রোগটির প্রকৃতি, লক্ষণ, বিপদের সংকেত এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করাই বেশি জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৩১৪ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২১ জনে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৩ হাজার ৯০৪ জনে। এর মধ্যে ৪০ হাজার ৭০৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে ডেঙ্গু কোনো সাময়িক মৌসুমি সমস্যা নয়। এটি প্রতি বছর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কেবল আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার দিকে নজর দিলেই হবে না; মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। অনেকেই মনে করেন, বড় জলাশয় বা নোংরা পানিতেই শুধু মশা জন্মায়। বাস্তবে এডিস মশা বাড়ির আশপাশে জমে থাকা অল্প পরিমাণ পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। ফুলের টব, বালতি, ড্রাম, পরিত্যক্ত বোতল, কৌটা, প্লাস্টিকের পাত্র, পুরোনো টায়ার, ছাদের বিভিন্ন অংশ, নির্মাণাধীন ভবনের পাত্র বা গর্ত এবং অন্যান্য ছোট পানির আধার নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বৃষ্টির পর এসব স্থানে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে বাড়ি ও আশপাশ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি জায়গা আজ পরিষ্কার থাকলেও কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে আবার পানি জমতে পারে। তাই একবার পরিষ্কার করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
ডেঙ্গুর সবচেয়ে পরিচিত উপসর্গ হলো জ্বর। তবে জ্বরের সঙ্গে আরও কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন— তীব্র মাথা ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, প্রচণ্ড দুর্বলতা, বমি বা বমিভাব, ক্ষুধামন্দা এবং ত্বকে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাতও হতে পারে। তবে রক্তপাত না থাকলেও গুরুতর ডেঙ্গু হতে পারে। তাই শুধু রক্তপাত হচ্ছে কি না এটিকে রোগের তীব্রতা বোঝার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণ সবসময় একইভাবে প্রকাশ পায় না। জ্বরের পাশাপাশি খাওয়ার অনীহা, দুর্বলতা, বমি, অস্বাভাবিক অস্থিরতা বা অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব দেখা দিতে পারে। শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে তীব্র পেট ব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা, অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, শ্বাসকষ্ট, তীব্র তৃষ্ণা, ত্বক ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এসব লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর বাড়িতে বসে অপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ। ডেঙ্গুর গুরুতর পর্যায়ে রোগীর অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বিপদের সংকেত চেনার সক্ষমতা রোগীর পরিবার ও স্বজনদের থাকা অত্যন্ত জরুরি।
গুরুতর ডেঙ্গুতে শরীরের রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ার ফলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এতে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। গুরুতর রক্তপাতও হতে পারে। এ ছাড়া শ্বাসতন্ত্রে তরল জমা বা অন্যান্য সমস্যার কারণে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় যকৃত, কিডনি, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব জটিলতার কারণে ডেঙ্গু কখনো প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই ডেঙ্গুর চিকিৎসায় শুধু জ্বর কমানোই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, তরল ভারসাম্য, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফলাফল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
ডেঙ্গু শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি, খাবার স্যালাইন, স্যুপসহ উপযুক্ত তরল দেওয়া যেতে পারে। বমি থাকলে একবারে বেশি না দিয়ে অল্প অল্প করে বারবার তরল পান করানো ভালো।
রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। ভাত, খিচুড়ি, ডাল, স্যুপ, শাকসবজি ও ফলসহ স্বাভাবিক পুষ্টিকর খাবার খাওয়া যেতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা পানীয় ডেঙ্গু সারিয়ে দেয়— এমন ধারণার ভিত্তিতে চিকিৎসা বাদ দেওয়া উচিত নয়।
জ্বর ও শরীর ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। নিজের ইচ্ছায় ব্যথানাশক বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়। বিশেষ করে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনজাতীয় কিছু ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
জ্বর হলেই যে ডেঙ্গু হবে, এমন নয়। আবার ডেঙ্গু সন্দেহ হলে শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়াও ঠিক নয়। রোগের সময়কাল ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফলাফল, রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসক পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করেন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যাদের আগে থেকে অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় না থেকে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা। শুধু সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। প্রতিটি পরিবারকে নিজেদের বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, হাসপাতাল, বাজার, কারখানা এবং নির্মাণাধীন ভবনেও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতে হবে। কোনো জায়গায় পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে জমে থাকা পানি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণকাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়মিতভাবে এসব স্থান পরিদর্শন করে পানি জমার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়ি ও আশপাশ পরিদর্শনের অভ্যাস করা প্রয়োজন। কোথাও পানি জমে আছে কি না, ফুলের টব বা পাত্রে পানি আটকে আছে কি না, পুরোনো টায়ার বা পরিত্যক্ত পাত্র পড়ে আছে কি না— এসব দেখতে হবে।
শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলে হবে না। পাশের বাড়ি, ছাদ, গলি, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা আশপাশের পরিত্যক্ত স্থানে পানি জমে থাকলেও স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে তা অপসারণ করতে হবে। কারণ মশার কোনো সীমানা নেই; একটি বাড়ির পরিচ্ছন্নতা অন্য বাড়ির ঝুঁকি দূর করে না।
উপরোক্ত কোনো ওষুধই রোগের নামের ভিত্তিতে নিজে নিজে সেবন করা উচিত নয়; রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণ ও সামগ্রিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসক ওষুধ নির্বাচন করেন। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণের আগে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত ও অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ও গুরুতর রোগীর ঘটনাও আমাদের জন্য সতর্কবার্তা বহন করে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় তাই শুধু রোগী হাসপাতালে এলে চিকিৎসা দেওয়ার ওপর নির্ভর করলে চলবে না; সংক্রমণের উৎস অর্থাৎ এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করাই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য। জ্বর হলে অবহেলা করা যাবে না। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং রোগীর অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও বিপদের সংকেত দেখা দিতে পারে— এই বিষয়টি পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে জানতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুরু হয় ঘর থেকেই।
লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি