প্রয়োজনের সময় চাহিদামতো সার না পেলে কৃষকের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। দেশের অনেক স্থান থেকে সার সংকটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য সরকার বলছে, চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে। বাস্তবে আমন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষককে সার পেতে দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় নির্ধারিত দামে সার মিলছে না।
আবার বেশি দাম দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় একজন কৃষককে এক বস্তার বেশি সার দেওয়া হচ্ছে না। এই সংকট কৃষকদের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, কুড়িগ্রামে ডিলারের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। লালমনিরহাট ও রাজশাহীতে কৃষকরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার সারের মোট মজুদ বেড়েছে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৮৬ হাজার টন সার মজুদ ছিল। মন্ত্রণালয় বলছে, প্রতি মাসের প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়ার মতো মজুদ সরকারের হাতে রয়েছে। রাজশাহীর একটি গুদামেই বরাদ্দের তুলনায় কয়েকগুণ টিএসপি ও ইউরিয়া থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় বেশি মজুদ থাকার পরও কৃষক সার পাচ্ছেন না কেন?
কোনো কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরি, সার গুদামে আটকে রাখা, কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশি দামে সার বিক্রি ও অবৈধ মজুদের প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বস্তা ডিএপিতে ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং টিএসপিতে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুমোদিত ডিলারের কাছে সার পাওয়া যায় না। অননুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে কৃষককে। একটি অসাধু চক্র কৃষকের প্রয়োজনকে পুঁজি করে অন্যায়ভাবে নিজেদের পকেট ভারী করছে।
সার নিয়ে ডিলারদের কারসাজির অভিযোগ করেছে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া কিছু ডিলারের কারসাজির কারণেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ডিলারদের তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা ডিলার নিয়োগ নীতিমালায় বর্তমান সরকার বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বর্তমান সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
সারের চাহিদা নির্ধারণে গরমিলের অভিযোগ রয়েছে। মৌসুম ও অঞ্চলের চাহিদা বিবেচনা নিয়ে সারের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। আবার নভেম্বরের আলু, পেঁয়াজ, ভুট্টা ও শীতকালীন সবজি চাষের জন্য আগাম সার কেনার প্রবণতাও চাপ বাড়াচ্ছে। কৃষকের অতিরিক্ত সার ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষকের সুষম সার ব্যবহারে ভারসাম্যহীনতার কথা উঠে এসেছে।
গুদামে কত সার মজুদ আছে সেই হিসাব কষলেই সমস্যা মিটবে না। গুদাম থেকে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপের হিসাব করতে হবে। কোন জেলায় কত সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কোন ডিলার কতটুকু পেয়েছেন, কতটুকু বিক্রি করেছেন এবং বর্তমানে কত মজুদ আছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিতে হবে।
কোনো এলাকায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মজুদ থাকলে সেটা পুনর্বণ্টন করতে হবে। ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমন মৌসুমে সারের এই সংকটকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না। সামনে রবি ও বোরো মৌসুম। বোরোতে সারের চাহিদা বেশি থাকে। কাজেই এখনই ডিএপি আমদানির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে বন্ধ সার-কারখানাগুলো চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে