বন্যপ্রাণী পাচার থামছে না কেন?

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

মতামত

অপ্রতুল জীববৈচিত্র্য আর বন্যপ্রাণী পাচারের কারণে একটি দেশ কতখানি বিপদে পড়তে পারে তার বড় উদাহরণ লাতিন আমেরিকা। ব্রাজিলের একটি সংস্থার

2026-09-11T04:27:27+00:00
2026-09-11T04:27:27+00:00
 
  শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
বন্যপ্রাণী পাচার থামছে না কেন?
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
অপ্রতুল জীববৈচিত্র্য আর বন্যপ্রাণী পাচারের কারণে একটি দেশ কতখানি বিপদে পড়তে পারে তার বড় উদাহরণ লাতিন আমেরিকা। ব্রাজিলের একটি সংস্থার মতে প্রতি বছর দেশটিতে ১২ মিলিয়ন বন্যপ্রাণী পাচার হয়।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে বেশ কয়েকটি বন্যপ্রাণী পাচারের খবর পাওয়া গেছে। গত ২১ আগস্ট ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পাচারের সময় বিপন্ন প্রজাতির দুটি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করা হয়েছে। বন অধিদফতরের অপরাধ দমন ইউনিট বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে বানর দুটি উদ্ধার করে। গত ৯ জুন প্রকাশিত একটি অনলাইনের খবরে দেখা যায়, কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে পাচারের জন্য রাখা একটি হনুমান ও ১২টি কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট ভোলার চরফ্যাশনে পাচারের প্রস্তুতিকালে ২৫০টি কচ্ছপ উদ্ধার করে বন বিভাগ। এগুলো সুন্দরী কচ্ছপ। বন বিভাগ জানিয়েছে, বিভিন্ন স্থান থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিলুপ্তপ্রায় কচ্ছপ শিকার ও পাচারের অভিযোগ আসছিল।

বন্যপ্রাণী পাচার বলতে সংরক্ষিত উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির অবৈধ ব্যবসাকে বোঝায়। এই অবৈধ ব্যবসা নানা ধরনের হতে পারে। এর মধ্যে খাদ্য, চামড়া, কাঠসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ পাচারও রয়েছে। পাচার হওয়া সব বন্যপ্রাণী হয়তো বিপন্ন প্রজাতির নয়। কিন্তু এই অবৈধ বাণিজ্যের কারণে অনেক এলাকাই এখন বিপদসংকুল হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসার কারণে পৃথিবীর ৬০ ভাগেরও বেশি বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রতি বছর ১০০ মিলিয়ন উদ্ভিদ ও প্রাণী আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ ব্যবসার কবলে পড়ছে। মূলত পোষ মানানো, ওষুধ ও খাদ্যের কাজে ব্যবহারের জন্য এসব বন্যপ্রাণী বিক্রি করা হয়। এতে প্রতিবছর ৪ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ ব্যবসা হচ্ছে। এই ব্যবসা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এর ফলে দূষণ, বন উজাড় ও অন্যান্য আবাসভূমি ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে আমরা ভয়াবহ পরিবেশগত সমস্যার মুখে পড়ছি। সব মিলিয়ে অবৈধ ব্যবসার মধ্যে বন্যপ্রাণী ব্যবসার অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ, অবৈধ নেশাদ্রব্য ও মানবপাচারের পরেই এটি।

কীভাবে এসব ব্যবসা গড়ে উঠছে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। অনেক পাচারকারীর কাছে একটি গন্ডার তার ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণের চেয়েও মূল্যবান। ফলে পাচারকারীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে গন্ডার। গন্ডার ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। আবার কোথাও কোথাও এটিকে সৌভাগ্য ও সফলতার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। গন্ডার শিকারে নিস্তেজকারী বন্দুক ব্যবহার করা হয়। এতে গন্ডারটি পড়ে গেলে পরে রক্তক্ষরণে মারা যায়। আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা এখন অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে গন্ডার শনাক্ত ও হত্যা করছে।

অধিকাংশ জেলে হাঙরের পাখনা সংগ্রহ করতে চায়। কারণ এটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং অনেকে একে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে চড়া দামে কিনে থাকে। হাজার হাজার বছর ধরে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রে হাঙর অন্যতম প্রধান উপাদান। পুষ্টি সরবরাহ ও কার্বন শোষণের মাধ্যমে এরা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। বর্তমানে হাঙর ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র— দুটিই হুমকির মুখে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন হাঙর হত্যা করা হয়। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হাঙর প্রজাতি হুমকির মুখে এবং বেশ কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। হাঙরের সংখ্যা কমে যাওয়া সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। হাঙরের মতো অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান মাছের সংখ্যা কমে যাওয়া বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলোর একটি। এই সমস্যা মোকাবিলায় বিমান চলাচলের রুটেও সতর্কতা বাড়াতে হবে। কারণ বন্যপ্রাণী পাচারে বিমানপথ ব্যবহার করা হয়।

২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিট ১৬ হাজার বন্যপ্রাণী মুক্ত করেছে। সংস্থাটি এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করেছে। অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী ধরার জন্য এই সময়ে মোট ৩৮ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসায় বিশেষ করে বাঘ, কুমির, কচ্ছপসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রাণী বিক্রি হয়।

ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির মতে বছরে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন থেকে ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয় অনিয়ন্ত্রিত অবৈধ মাছ ব্যবসার মাধ্যমে। অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসার পরিমাণ বছরে ৭ দশমিক ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার এবং অবৈধ কাঠ ব্যবসার পরিমাণ বছরে ৭ বিলিয়ন ডলার। নানা কারণে অবৈধ বন্যপ্রাণী পাচার বেড়েই চলেছে। বন্যপ্রাণীর মাংস বিক্রি, ওষুধ তৈরি, অলংকার বানানো ও পোষ মানানোর কাজে বন্যপ্রাণীর ব্যবহার বাড়ছে।

বন্যপ্রাণীর এই অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে জাতিসংঘের একটি সংগঠন— কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এন্ডেঞ্জারড স্পিসিস অব ওয়াইল্ড ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা। বর্তমানে এর ১৭০টি সদস্য রয়েছে। এর মাধ্যমে বন্যপ্রাণী, মাছ ও উদ্ভিদ রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বন্যপ্রাণীর ব্যবহার বন্ধে আইন প্রথম দিকে শুধু বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। পরে কাষ্ঠল উদ্ভিদসহ ওষুধের কাজে ব্যবহৃত উদ্ভিদও এর আওতায় আনা হয়।

বাংলাদেশেও বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসার অন্যতম প্রধান কারণ বন্যপ্রাণীর মাংস বিক্রি। হরিণের মাংস বিক্রির খবর প্রায়ই পত্রিকায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিট সক্রিয় থাকলেও সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাঘ ও কুমিরের শরীরের বিভিন্ন অংশও অবৈধভাবে কেনাবেচা হয়। পত্রিকার খবর থেকে বোঝা যায়, নানা দুর্বলতার সুযোগে বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর দিয়ে পাচারের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা বাড়ছে। যদিও ২০১২ সাল থেকে বন্যপ্রাণী ধরা ও মারা নিষেধ, তবু বন্যপ্রাণী হত্যার প্রবণতা এখনও রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী আইন কার্যকর হয়। এই আইন অনুযায়ী বাঘ বা হাতি হত্যা বা বিক্রির জন্য সাজা ও জরিমানার বিধান রয়েছে। হাতি বা বাঘের কোনো অংশ পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ তিন বছরের জেল অথবা তিন লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণের চাপ, অবৈধ দখল, বনভূমি উচ্ছেদসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে।

নতুন আইনে অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যান সম্পর্কে বেশ কিছু বাধানিষেধ করা হয়েছে। যেমন উদ্যানে বিনা অনুমতিতে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। সেখানে চাষাবাদ করা যাবে না। কোনো শিল্প বা কারখানা স্থাপন বা পরিচালনা করা যাবে না। আগুন লাগতে পারে এমন কাজ করা যাবে না। কোনো বন্যপ্রাণী শিকার, ভয় দেখানো বা বিরক্ত করা যাবে না। বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা যাবে না। বিদেশি ও আগ্রাসী প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রবেশ করানো যাবে না। ময়লা, আবর্জনা, খনিজ পদার্থ বা বর্জ্যরে স্তূপ করা যাবে না। বনভোজনও করা যাবে না।

অধ্যাদেশে আমদানি ও রফতানি সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়া বা সাইটিস সার্টিফিকেট, পারমিট ও অনাপত্তিপত্র ছাড়া কোনো বন্যপ্রাণী বা এর অংশ, ট্রফি, অসম্পূর্ণ ট্রফি বা বিদেশি প্রাণী অথবা কোনো রক্ষিত উদ্ভিদ বা এর অংশ বা এসব থেকে উৎপন্ন দ্রব্য বাংলাদেশে আমদানি বা বাংলাদেশ থেকে রফতানি করতে পারবে না।

অধ্যাদেশের নবম অধ্যায়ে অপরাধ, জরিমানা ও দণ্ড সম্পর্কে বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কোনো বন্যপ্রাণী, বন্যপ্রাণীর কোনো অংশ, মাংস, ট্রফি বা এসব থেকে উৎপন্ন দ্রব্য কিংবা বনজ দ্রব্য ক্রয় বা বিক্রয় করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। একই অপরাধ পুনরায় করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। কোনো ব্যক্তি অভয়ারণ্য বা জাতীয় উদ্যান সম্পর্কিত বাধানিষেধ লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে।

কেউ বাঘ বা হাতি হত্যা করলে সর্বনিম্ন দুই বছর এবং সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। একই অপরাধ পুনরায় করলে সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। বাঘ বা হাতি ছাড়া অন্য কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। একই অপরাধ পুনরায় করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

এসব আইন ও বিধিনিষেধ সত্ত্বেও বন্যপ্রাণী পাচার চলছেই। বন বিভাগের অপরাধ দমন ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে বন বিভাগ, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও বন্যপ্রাণী পাচারের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

পরিবেশবিষয়ক লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   অপ্রতুল  জীববৈচিত্র্য  বন্যপ্রাণী  পাচার  দেশ  বিপদ  লাতিন আমেরিকা  ব্রাজিল  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: