হামে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু কোনো সাধারণ স্বাস্থ্যসংকট নয়। এটা দেশের টিকাদান ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার। হামে আক্রান্ত হয়ে ও রোগের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার নয়জন। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশ হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছিল। সেখান থেকে এমন বিপর্যয় কীভাবে ঘটল, সেটা একটা প্রশ্ন। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এই প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।
কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি থাকলে হামের বড় প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা সম্ভব। সময়ের আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩১১, ২৮২ ও ২৪৭। ২০২০-২১ সালের পর দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের হারও কমেছে। ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদানের হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৫ সালে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। সে বছর প্রয়োজনের তুলনায় টিকা কেনা হয় কম। তখন রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য যথাসময়ে বিশ্লেষণ ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না, সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর বিএনপি সরকার এপ্রিল-মে মাসে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ করে। তবে এই কর্মসূচির প্রকৃত আওতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১০৯ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে একই বয়সি শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত শিশুর সংখ্যা এবং হামের টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচিতে ২ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ৫০৯ শিশু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আর হামের টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ শিশু। এই পরিসংখ্যান সঠিক হলে বলতে হবে, মাঠপর্যায়ে অনেক শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে।
হামের টিকার প্রশ্নে নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে দুর্বলতার অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার হামের ঝুঁকিকে যথেষ্ট অগ্রাধিকার দিয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। এখন নতুন করে ৪০ লাখ ডোজ টিকা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নতুন টিকা আনা যথেষ্ট নয়। বাদপড়া শিশুদের শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। বাদপড়া শিশুরা সত্যিই টিকা পেল কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। দুর্গম, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রচলিত টিকাদান কর্মসূচিতে নয় মাস ও ১৫ মাস বয়সে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়। এবার ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের বিশেষ টিকাদানের আওতায় আনা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ২০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম এবং ৫১ শতাংশের বয়স নয় মাসের কম। ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরের বেশি বয়সি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
একসময়ের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি রোগ এত বড় প্রাদুর্ভাবে পরিণত হলো কেন, সেটার স্বাধীন ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতে এমন ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সে জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা