একদা বর্ষার মেঘমালা যখন গগনকোণে সজল নৃত্যে মেতে উঠত, তখনই সবুজ এই বদ্বীপে নেমে আসত এক নীরব ঘাতকের অমোঘ ছায়া। সাম্প্রতিক বছরব্যাপী এডিস মশার ডানার গুঞ্জনে ঘরে ঘরে কান্নার করুণ সুর ধ্বনিত হচ্ছে। সুজলা-সুফলা এই বাংলার বুকে মরণব্যাধি ডেঙ্গু যেন এক নির্মম বিষাদগাথা রচনা করে চলেছে। বিষাক্ত দংশনে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। চলতি মৌসুমে ভাইরাসটির প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। এডিস মশার কামড়ে প্রতিনিয়ত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। দেশজুড়ে ডেঙ্গুর বিস্তার জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
বিভাগগুলোর মধ্যে চলতি মৌসুমে ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গু সংক্রমণ পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ পর্যন্ত ঢাকা জেলায় ৮ হাজার ৩৪০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। গাজীপুর জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ২৫০ জন। নারায়ণগঞ্জ জেলায় এই মৌসুমে ১ হাজার ২০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৫৪০ জন।
নরসিংদী জেলায় ৪১০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। মানিকগঞ্জে ২৩০ জন এবং মুন্সীগঞ্জে ২১০ জন চিকিৎসাধীন। ফরিদপুরে এ পর্যন্ত ৪৫০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। রাজবাড়ীতে আক্রান্তের সংখ্যা ৩২০ জন। শরীয়তপুরে ২৫০ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। মাদারীপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ২৮০ জন। গোপালগঞ্জে ৩১০ জন ডেঙ্গু রোগী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ডেঙ্গু সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বৈজ্ঞানিক ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এডিস মশার প্রজনন চক্র বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ধ্বংস করা জরুরি। স্থির পানিতে মশার ডিম ও লার্ভা দ্রুত বাড়ে। মশার বংশবৃদ্ধি রোধে জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। গাপ্পি মাছ লার্ভা
দমনে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। জলাশয়ে এই মাছ ছাড়লে লার্ভা প্রাকৃতিকভাবে ধ্বংস হয়। এটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী একটি পদ্ধতি।
রাসায়নিক কীটনাশকের সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মশার প্রতিরোধক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ওষুধের মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত লার্ভিসাইড নিয়মিত ছিটানো যেতে পারে। ফগিং মেশিনের মাধ্যমে উড়ন্ত পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন করা যায়। তবে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করা উচিত।
আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় মশার জিনগত রূপান্তর ঘটানো সম্ভব। বন্ধ্যা পুরুষ মশা প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার পদ্ধতিও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে। এই পুরুষ মশাগুলো প্রজননে অংশ নিলে ডিম উর্বর হয় না। ফলে এডিস মশার সামগ্রিক সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা ও প্রয়োগ হয়েছে। বাংলাদেশেও এ প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার বিবেচনা করা যেতে পারে।
ব্যাকটেরিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমেও ডেঙ্গু ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। ওলবাকিয়া নামের একটি ব্যাকটেরিয়া মশার শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এই ব্যাকটেরিয়া মশার দেহে ডেঙ্গু ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে। ওলবাকিয়াযুক্ত মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এটি দীর্ঘমেয়াদি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের একটি সম্ভাবনাময় পদ্ধতি। এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণা ও পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বাড়ানো যেতে পারে।
এডিসের বংশবিস্তার রোধে ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা বা জিআইএস প্রযুক্তিও ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এলাকার মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব। হটস্পট চিহ্নিত করে সেখানে দ্রুত মশক নিধন অভিযান চালানো যায়। প্রযুক্তির সাহায্যে মশার ঘনত্বের পূর্বাভাস দেওয়াও সম্ভব। সঠিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পূর্বপ্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে। তাই বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের যথাযথ ব্যবহার ডেঙ্গু দমনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর টিকার প্রয়োগ ও প্রাপ্যতা নিয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকার অগ্রাধিকারমূলক সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে তদারকি কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। প্রতিটি উপজেলায় সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সাধারণ মানুষকে মশারি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডেঙ্গু পরীক্ষা করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিটি জেলায় ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। লার্ভা ধ্বংস করতে নিয়মিত বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ড্রেন ও ডোবায় মশক নিধন ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। বাড়ির ছাদ ও ফুলের টবে জমে থাকা পানি অপসারণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গুমুক্ত সমাজ গড়ার প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।
দেশব্যাপী ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার রোধে এখনই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা— সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
শুধু মৌসুমি অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বছরব্যাপী এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, ধারাবাহিক ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা।
লেখক : প্রাবন্ধিক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও