এইচএসসি : মূল্যায়ন ব্যবস্থার চরম ক্ষতের বহির্প্রকাশ

মাছুম বিল্লাহ

মতামত

সব ধরনের শিক্ষককে খাতা পরীক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। খাতা দিতে হবে অল্পসংখ্যক পরীক্ষককে, পরীক্ষকদের পারিশ্রমিক কিছুটা বাড়াতে হবে। তারপরও

2026-09-13T04:27:14+00:00
2026-09-13T04:27:14+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
এইচএসসি : মূল্যায়ন ব্যবস্থার চরম ক্ষতের বহির্প্রকাশ
মাছুম বিল্লাহ
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সব ধরনের শিক্ষককে খাতা পরীক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। খাতা দিতে হবে অল্পসংখ্যক পরীক্ষককে, পরীক্ষকদের পারিশ্রমিক কিছুটা বাড়াতে হবে। তারপরও খাতা দ্বিতীয় পরীক্ষক দিয়ে দেখাতেই হবে। এসব বিষয় কার্যকর করতে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকই যথেষ্ট, যেহেতু বোর্ডগুলো স্বায়ত্তশাসিত। কিন্তু আমাদের এসব পদে যারা আসেন তারা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছাড়া কিছু করেন না, করতে চান না, করতে পারেনও না।

পাবলিক পরীক্ষায় ৫৬ হাজার খাতার ফল পরিবর্তন করতে হলে সেটি অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা যত কিছুই করি না কেন এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। আমি প্রথম ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষক হই ১৯৯১ সালে। সে সময় থেকে দেখে আসছি প্রতি বছর একই ধরনের ভুল হচ্ছে। এই সংখ্যা ও ভুলের ধরন প্রতি বছরই বাড়ছে।

বোর্ড পরীক্ষক থাকাকালে প্রতিটি মিটিংয়ে অংশ নিতাম। দেখতাম মিটিংয়ে অর্ধেকের বেশি শিক্ষক উপস্থিত থাকতেন না। অর্থাৎ সম্মিলিত আলোচনা ও সিদ্ধান্তের অনেক কিছুই একভাবে হতো না। লিখে দেওয়া নিয়ম-কানুনও অনেকে পড়ে দেখেন না। বোর্ড পরীক্ষক ও প্রশ্নপ্রণেতা হিসেবে যত সমস্যা দেখে এসেছি, তার সবই বহুবার বহু ফোরামে আলোচনা করেছি, বহুবার লিখেছি। কিন্তু দেখছি, সমাধানের চেয়ে সমস্যা যেন বেড়েই চলছে।

এটি এমন ধরনের সমস্যা নয় যে, হুট করে বিরাট একটি বক্তব্য দিলাম, কয়েকজন শিক্ষককে ভয় দেখালাম, তাতেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বিষয়টি তা নয়। এখানে দরকার গবেষণা, পরিকল্পনা, কাজ এবং নতুনত্বের ধারণা। কে এসব নিয়ে চিন্তা করবে? আমরা সবসময় হঠাৎ কিছু করার কথা, বড় বড় পরিকল্পনার কথা এবং বিশ্বের বড় বড় দেশ কী করছে, তা দেখে একই ধরনের কিছু করার কথা শুনি। কিন্তু আসল সমস্যায় হাত দেওয়া হয় না।

শিক্ষক, বোর্ড, মূল্যায়ন ব্যবস্থাপনা তথা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাপনার গলদ দিন দিন বাড়ছে। আর আমরা কথা বলি কিছু ইউটোপিয়ান ধারণা নিয়ে। ১৯৯১ সাল থেকে দেখে আসছি, এক শিক্ষার্থী গণিতে পেয়েছিল ৮২। কিন্তু গোল্লা পূরণ করা হয়েছিল ২৮। সেই সময়ের ৮২ পাওয়া আর বর্তমান যুগের তথাকথিত উদার নম্বর দিয়ে ৮২ পাওয়া এক কথা নয়। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক— কারোরই ঘুম নেই। তারা বোর্ডের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। বহু পরে দেখা গেল, ছেলেটি আসলেই ৮২ পেয়েছিল।

শিক্ষার্থীদের এই মানসিক অশান্তি ও ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর দায়দায়িত্ব কে নেবে? সে সময় দেখা যেত, একটি বোর্ডে এক-দুটি ঘটনা এ রকম ঘটত। কিন্তু বর্তমানে কী হচ্ছে? শত শত, এবার দেখা গেল হাজার হাজার। তা হলে এই মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বস্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা কোথায় গিয়ে ঠেকে?

প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ জন শিক্ষার্থী ফল পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করেছিলেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ লাখ ৫৬ হাজার খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে ২৭ হাজার ৮৩৬ শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। আর ৫৬ হাজার ২৫১টি খাতায় নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে।

দিন যত যাচ্ছে, আমরা তত মেশিননির্ভর হয়ে পড়ছি। কিন্তু মানবিকতা কমেই যাচ্ছে। আমাদের সময়ে শিক্ষকরা খাতা দেখতেন নিজের হাতে, ফল তৈরি করতেন হাতে। আর এখন এত কম্পিউটার ও ডিভাইস দিয়ে ফল তৈরি করা 
হয়। কিন্তু ফলের উপস্থাপন যদি এ রকম হয় তা হলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়।

এবারের পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়নে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীর নতুন করে জিপিএ-৫ পাওয়া, ফেল থেকে পাস, গ্রেড পরিবর্তন এবং সর্বোচ্চসংখ্যক খাতার নম্বর পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে গত ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের পর থেকে টানা এক মাস ধরে চলা মানসিক ট্রমা থেকে মুক্তি পেয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। কিন্তু এটি কি কাম্য?

দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক বোর্ডের খাতা দেখতে চান না। প্রধান কারণ তারা প্রাইভেট পড়িয়ে অনেক উপার্জন করেন। বোর্ডের খাতা দেখে আর কত টাকা পাবেন? কিন্তু বোর্ডের খাতা দেখা মানে শুধু কিছু উপার্জন নয়। এটি পুরো শিক্ষাদান পদ্ধতির একটি মূল্যবান অংশ। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলে, এ নিয়ে বছরের পর বছর কাজ না করলে, পুরো শিক্ষকতা আয়ত্তে আসে না; একজন প্রকৃত শিক্ষক হওয়া যায় না।

এখানে সরকার কী করবে? সরকার কি জোর করে তাদের দিয়ে খাতা পরীক্ষণ করাবে? তাতে কি লাভ হবে? ভালো প্রতিষ্ঠানের ভালো শিক্ষকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

বোর্ড বাধ্য হয়ে অনেক অনভিজ্ঞ, একেবারে নতুন ও উৎসাহহীন শিক্ষকের মাধ্যমে খাতা মূল্যায়ন করিয়ে থাকে। এ ধরনের বহু শিক্ষক আমি দেখেছি, যারা বোর্ডের খাতা দেখার একেবারেই উপযুক্ত নন। অথচ বোর্ড থেকে খাতা নিয়ে এসে তাদের স্ত্রী, পুত্র কিংবা শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাতা পরীক্ষণ করিয়ে থাকেন।

বোর্ডকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফল তৈরি করতে হবে। সময় পিছিয়ে দেওয়া যাবে না। আমার মনে আছে, আমি কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে থাকাকালে কুমিল্লা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক খাতা জমা দিয়ে আসার পর আবার খাতা নেওয়ার অনুরোধ করতেন। কলেজে ফোন করতেন— তখন মোবাইল ফোন ছিল না। দুটি কারণে তিনি এমন করতেন। একটি হলো তার বিশ্বাস ছিল ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকরা ভালোভাবে খাতা মূল্যায়ন করেন। দ্বিতীয়ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এত খাতা কাদের দিয়ে দেখাবেন?

তাই অনেকে তিন-চারবার করেও বোর্ডের খাতা আনতেন। এখনও অনেকেই তা করেন, যা ঠিকমতো দেখা হয় না। আমি নিজে কখনো একবারের বেশি খাতা আনতাম না। আবার কিছু অনুপযুক্ত শিক্ষক বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে, বিশেষ করে নিয়ন্ত্রকের ব্যক্তিগত সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে, বারবার খাতা আনেন। গত সরকারের আমলে যেহেতু ফেল করার নজির তেমন ছিল না তাই এসব শিক্ষক বেশি বেশি নম্বর দিয়ে পাস করানোর কাতারে শামিল হতেন। ফলে কোনো সমস্যা ধরা পড়ত না।

সব ধরনের শিক্ষককে খাতা পরীক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। খাতা দিতে হবে অল্পসংখ্যক পরীক্ষককে, পরীক্ষকদের পারিশ্রমিক কিছুটা বাড়াতে হবে। তারপরও খাতা দ্বিতীয় পরীক্ষক দিয়ে দেখাতেই হবে। এসব বিষয় কার্যকর করতে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকই যথেষ্ট, যেহেতু বোর্ডগুলো স্বায়ত্তশাসিত। কিন্তু আমাদের এসব পদে যারা আসেন তারা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছাড়া কিছু করেন না, করতে চান না, করতে পারেনও না।

কারণ তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ বা পেশাদার নয়। নিয়োগ হয় কে কার আত্মীয়, কে কার বন্ধু, কে কোন রাজনৈতিক দলে কতটা অবদান রেখেছেন— এসব বিবেচনার ওপর। ফলে এসব বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বা চেয়ারম্যানরা অনেক কিছুই করতে পারেন না।

দেখা যায়, অখ্যাত কোনো কলেজের অধ্যক্ষ সারাজীবন হয়তো শিক্ষা-সংক্রান্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু উপরোক্ত কোনো এক পরিচয়ের বদৌলতে তিনি বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কিংবা চেয়ারম্যান হয়েছেন। তার পক্ষে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না।

এখানে নৈতিক সাহস থাকতে হয়, পড়াশোনা জানতে হয়, কাজ করতে হয়, নেতৃত্ব দিতে হয়। শিক্ষার মূল সমস্যাগুলোর ভেতরে ঢোকার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু প্রধান অতিথি হিসেবে নয়, শিক্ষক হিসেবে যেতে হয়। নিজে দায়িত্ব নিয়ে অনেক কিছু করতে হয়।

যারা শিক্ষা প্রশাসনের পদগুলোতে আসেন, তারা অনেক সময় ভালো শিক্ষকও নন, ভালো প্রশাসকও নন। ভালো ও প্রকৃত শিক্ষক হলে তারা এসব পদে যেতে চাইবেন না— অথচ মারাত্মক লবিং করে এসব পদ দখল করেন একদল শিক্ষক।

বর্তমান রাজনৈতিক ও নৈতিক বাস্তবতায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদান এখন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তাই কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে বাঁচতে চান। এটিও আরেকটি বাস্তবতা। কিন্তু যখন তারা শিক্ষা প্রশাসনের কোনো পদে আসেন, তখন তারা ভালো প্রশাসকও নন। কারণ সে ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা তাদের থাকে না।

তারা কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালে সরকারি সংগঠনের 
তথাকথিত ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মানিয়ে চলেছেন। এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রশাসন শেখা যায় না। বোর্ডে এসে নতুনভাবে তারা কী করবেন? তাদের একার পক্ষে অনেক কিছু করা সম্ভবও নয়।

তবে শুরুটা তাদেরই করতে হবে। কারণ রাজনীতিবিদ কিংবা সরকারের নীতিনির্ধারকরা এসব সমস্যা পুরোপুরি বুঝতে চাইবেন না। সমাধানও হয়তো সেভাবে দিতে যাবেন না। এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষকদেরই।

আপনি চেয়ারম্যান হোন আর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হোন— মনে রাখতে হবে আপনি একজন শিক্ষক। আপনি পুরো শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

কয়েক বছর আগে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে দেশের সব বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের ডাকা হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে আমাকেও কিছু কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেদিন বিভিন্ন বোর্ডের প্রশ্নের নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলেছিলাম। কয়েকজন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেছিলেন, ‘বোর্ডের প্রশ্নও করেন শিক্ষকরা, প্রশ্ন মডারেটও করেন তারা। এসব সমস্যা থাকলে আমরা কী করব?’

এই কথার মধ্য দিয়েই বোর্ডের অনেক কিছু উঠে আসে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা অনেক সময় মনেই করেন না যে, তারাও শিক্ষক। তারা প্রশাসকের ভূমিকায় থাকতে চান। ফলে কোনোটিই ঠিকমতো হচ্ছে না।

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   এইচএসসি  মূল্যায়ন ব্যবস্থা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: