আধুনিক নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে বেকারিপণ্য। চটজলদি ক্ষুধা মেটাতে রুটি, কেক, বিস্কুটের শরণাপন্ন হন অনেকেই। গ্যাস সংকটের এই সময়ে নগরবাসীর অনেকেরই ভরসা বেকারিপণ্য।
শনিবার থেকে বেকারি পণ্যের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ। সাধারণ মানুষের খরচের বোঝাও ভারী হলো। খেটে-খাওয়া মানুষ বিশেষ করে রিকশাচালক, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের অনেকেই বনরুটি, পাউরুটি বা কেকের মতো তুলনামূলক সস্তা খাবার দিয়ে ক্ষুধা মেটান। এসব খাবারের দাম বাড়লে তাদের সীমিত আয়ের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে।
বেকারি মালিকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। এক বছরে ৫০ কেজি ময়দার দাম ২ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। চিনির ৫০ কেজি বস্তার দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা। ভোজ্য তেল ও ডালডার দামও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় অনেক বেকারিকে বাড়তি খরচে এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এসব কারণে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় বাড়া স্বাভাবিক। তাই ব্যয় সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করা যায় না। তবে বেকারিপণ্য উৎপাদনে বাড়তি খরচের সব দায় কেবল ভোক্তার কাঁধেই চাপবে কি না সেটা একটা প্রশ্ন।
বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আবার কিছু পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রেখে ওজন কমানোর কথাও বলা হয়েছে। যেমন ৪০০ গ্রামের পাউরুটির ওজন কমে ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রাম হতে পারে। ১০ টাকার বনরুটির ওজনও কমানোর কথা রয়েছে।
দাম একই রেখে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া কার্যত মূল্যবৃদ্ধিরই একটি পদ্ধতি। ভোক্তাকে সঠিক তথ্য না জানিয়ে পণ্যের ওজন কমানো আইনসিদ্ধ কি না সেটা আমরা জানতে চাইব। দাম অপরিবর্তিত রাখার স্বার্থে কোনো পণ্যের ওজন যদি কমাতেই হয় তা হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টির ফয়সালা করতে হবে। পণ্যের মোড়কে দাম ও ওজন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
শুধু বেকারিপণ্যই মানুষের দুশ্চিন্তার একমাত্র কারণ নয়। এমন এক সময়ে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ল যখন অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বাড়ছে। সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলো লিটারপ্রতি পাঁচ টাকা। দাম বাড়ানোর পরও তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। খোলা আটা ও ময়দার দামও বেড়েছে।
ডজনপ্রতি ডিমের দাম এখন কমবেশি ১৫০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি কিনতে কেজিপ্রতি গুনতে হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। কিছু সবজির দাম কম, আবার কিছুর দাম ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। মাছের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না, খরচের পারদ ঠিকই চড়ছে। তারা তাই বাধ্য হয়ে বাজারের ফর্দ দিনকে দিন ছোট থেকে ছোটই করে চলেছেন।
মূল্যস্ফীতি কমেছে। এর মানে এই নয় যে, দ্রব্যমূল্যের দাম কমেছে বা স্থির হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ার গতিটা হয়তো একটু ধীর হয়েছে। তবে মানুষের আয় না বাড়লে বা কাজ হারিয়ে তাদের আয়ের পথ রুদ্ধ হলে ধীরগতির মূল্যস্ফীতিও তাদের কাজে আসবে না।
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণগুলো খুঁজে বের করে যেমন ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, মানুষের আয়ের উপায় করাও তেমন গুরুত্বপূর্ণ। বেকারি শিল্পের কাঁচামালের বাজারকে স্থিতিশীল করতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বেকারি পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
সময়ের আলো/এসএকে