শিশু নির্যাতন : বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ

তরিকুল্লাহ তরিক

মতামত

কওমি মাদরাসাগুলোর শতভাগ আবাসিক ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সুযোগ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক বা নিয়মিত ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে

2026-09-13T04:34:08+00:00
2026-09-13T04:34:08+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
শিশু নির্যাতন : বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ
তরিকুল্লাহ তরিক
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৩৪ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
কওমি মাদরাসাগুলোর শতভাগ আবাসিক ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সুযোগ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক বা নিয়মিত ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক সীমানার বাইরে পারিবারিক আবাসন নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে, যেন তারা নির্দিষ্ট সময়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন শেষে আবাসে ফিরে যান। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘনিষ্ঠতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত পাঁচ দশকে দুর্নীতি, অপশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার মতো যে বিষয়গুলো নিয়ে বহু সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর দৃশ্যমান কোনো সমাধান মেলেনি। বেশিরভাগ প্রতিশ্রুতিই কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে আরও একটি মারাত্মক বিষয়। শিশু নির্যাতন ও যৌন অপরাধ এখন আর কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং তা এক আশঙ্কাজনক জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্ম ইসলাম; দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ এই ধর্মের অনুসারী। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, আচার-আচরণ ও সংস্কৃতিতে ধর্মীয় আদর্শের গভীর প্রভাব রয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতির দিক থেকেও এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জায়গা। ইসলাম নিজেকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে উপস্থাপন করে।

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা ও শিশু বলাৎকার। বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও প্রচলিত পরিভাষায় সাধারণত ছেলে শিশুদের ওপর সংঘটিত যৌন নির্যাতন বোঝাতে ‘বলাৎকার’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সম্প্রতি দেশে এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা লক্ষ্যণীয়ভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে কওমি মাদরাসা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, যা পুরো বিষয়টিকে এক মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

কওমি মাদরাসাগুলো ধর্মীয় শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে সমাজে বিবেচিত। মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রাখতে আলেমসমাজ এই শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করে আসছেন। সরকারি কোনো নিয়মিত অনুদান ছাড়া মূলত সাধারণ মানুষের দান, সদকা ও জাকাতের অর্থেই এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। দেশের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুদের জন্য কওমি মাদরাসা তুলনামূলক সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী একটি শিক্ষাব্যবস্থা।

তবে সম্প্রতি প্রকাশিত শিশু নিরাপত্তার মারাত্মক লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রতি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে সংঘটিত যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত হানছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে ধর্ষণ ও বলাৎকারের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০২৫ সালে এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসের পরিসংখ্যানে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়; এই সময়েই ১২ বছরের কম বয়সি অন্তত ৫৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই এই চিত্র উদ্বেগের। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং ১৮ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে শিশু। গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচিত— যার মধ্যে নিকটাত্মীয়, শিক্ষক, প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তিরা থাকেন।

বাংলাদেশে ছেলে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও সামাজিক লোকলজ্জা, পরিবারের মান-সম্মান এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কায় বেশিরভাগ ঘটনাই চেপে যাওয়া হয়। ফলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যানে আক্রান্ত ছেলে শিশুদের যে সংখ্যা উঠে আসে, বাস্তব চিত্র তার চেয়েও বহুগুণ বেশি বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

অপরদিকে যৌন সহিংসতার মামলাগুলোতে বিচার ও দণ্ডপ্রাপ্তির নিম্ন হার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে প্রায় দুই লাখ মামলা বিচারাধীন। অথচ বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দণ্ডপ্রাপ্তির হার মাত্র ৩.৬ শতাংশের কাছাকাছি। বিচারে এই দীর্ঘসূত্রতা ও নিচু দণ্ড হার অপরাধীদের বেপরোয়া করে তোলার পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিচার পাওয়ার আশাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে।

শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও নৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সর্বপ্রধান দায়িত্ব। কিন্তু সম্প্রতি সাভারের একটি মাদরাসায় বলাৎকারের ঘটনায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের গুরুতর অবহেলার চিত্র সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি হাদিসের অপব্যাখ্যা করে সেখানে বলা হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি পৃথিবীতে কারও দোষ গোপন রাখবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন।’ শিশু নির্যাতনের মতো মারাত্মক অপরাধ ঢেকে রাখার জন্য এ ধরনের ধর্মীয় ব্যাখ্যার আশ্রয় নেওয়া কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই নয়, বরং আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা এবং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

এই জটিল ও আশঙ্কাজনক সংকট মোকাবিলায় কেবল আইনি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; এর জন্য কওমি মাদরাসাগুলোর কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংস্কার এবং সার্বিক সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।

প্রথমত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
কওমি মাদরাসাগুলোর শতভাগ আবাসিক ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সুযোগ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক বা নিয়মিত ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক সীমানার বাইরে পারিবারিক আবাসন নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে, যেন তারা নির্দিষ্ট সময়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন শেষে আবাসে ফিরে যান। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘনিষ্ঠতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডরমিটরি, শ্রেণিকক্ষ ও আঙিনায় সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও নজরদারির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এটি অপরাধ প্রতিরোধে যেমন কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তেমনি যেকোনো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণে সহায়তা করবে। এই ভিডিও ফুটেজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত মানসিক স্বাস্থ্য ও নিবিড় পরিচর্যা
শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মীদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা উচিত। পেশাদার বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে কারও মধ্যে কোনো মানসিক বিকৃতি বা সহিংসতার প্রবণতা দেখা গেলে তাকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার।

তৃতীয়ত অভিভাবকদের সচেতনতা ও নজরদারি
অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের মেজাজ ও আচরণের পরিবর্তনের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া, মেলামেশা এড়িয়ে চলা, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা, পড়াশোনায় অনীহা বা অস্বাভাবিক ভীতি— যৌন নির্যাতনের এসব প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে। কোনো ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়লে দ্রুততম সময়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

চতুর্থত স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা
মাদরাসাগুলোতে একটি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী বা অভিভাবকরা নিরাপদে ও গোপনে যেকোনো অভিযোগ জানাতে পারেন। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা মিললে অবিলম্বে তা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে।

পঞ্চমত সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক চর্চা
আলেম ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে শিশু সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিতে হবে। ধর্মীয় উপদেশের সঠিক ও প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রে অপরাধ গোপন করার প্রবণতা ভেঙে সত্য প্রকাশের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

ষষ্ঠত কঠোর আইন প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ
আইনের সঠিক ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করা অন্যতম প্রধান শর্ত। শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় সম্পদ বৃদ্ধি করতে হবে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষায় বিনামূল্যে আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। এসব সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব না হলে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা সামাজিক আস্থা সংকটে পড়বে, যার ফলে অসংখ্য নিম্নবিত্ত শিশুশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। 

তাই সার্বিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি, যা হতে হবে সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল এবং সর্বোপরি শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা ও কল্যাণকে কেন্দ্রে রেখে।

লেখক : সাহিত্যকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে

  বিষয়:   শিশু নির্যাতন  বাংলাদেশ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: