মোবাইল নম্বরের আড়ালে লুকিয়ে ভয়ংকর বিপদ

মো. নুরে আলম

মতামত

রাতে হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে একজন বলল, আপনি তো অমুক অফিসে কাজ করেন। আপনার বাসা অমুক এলাকায়। আপনার

2026-09-13T19:08:55+00:00
2026-09-13T19:08:55+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
মোবাইল নম্বরের আড়ালে লুকিয়ে ভয়ংকর বিপদ
একটি মোবাইল নম্বর থেকেই ফাঁস হতে পারে পরিচয়, যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্য কতটা ঝুঁকিতে, আর সুরক্ষার দায় কার?
মো. নুরে আলম
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৮ পিএম 
প্রতীকী ছবি
রাতে হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে একজন বলল, আপনি তো অমুক অফিসে কাজ করেন। আপনার বাসা অমুক এলাকায়। আপনার বাবার নামও অমুক, তাই না। মানুষটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গেল। কারণ ফোনের ওপাশে থাকা লোকটিকে তিনি চেনেন না। কিন্তু লোকটি তার এমন কিছু তথ্য জানে, যা সাধারণত কাছের মানুষ ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়।

ধরুন, এই জায়গাটাই আমাদের অস্বস্তির জায়গা। আমরা প্রতিদিন অনলাইনে নিজের পরিচয় রেখে যাচ্ছি। এনআইডি দিচ্ছি, মোবাইল নম্বর দিচ্ছি, ছবি দিচ্ছি, ঠিকানা দিচ্ছি, পাসপোর্টের তথ্য দিচ্ছি। বিনিময়ে একটা সেবা পাচ্ছি। কিন্তু সেই তথ্যটা পরে কোথায় যাচ্ছে, কারা দেখছে, কতদিন রাখা হচ্ছে, কিংবা কারও হাতে চলে গেলে দায় নেবে কে, সেটা আমরা প্রায় কেউই জানি না।

বিষয়টা এখন আর শুধু আশঙ্কা নয়। বাংলাদেশে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা শনাক্ত করেছে টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে। এসব ঘটনায় এনআইডি নম্বর, পাসপোর্টের তথ্য, বায়োমেট্রিকসহ নানা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয় যখন দেখা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাদের সবচেয়ে বেশি নিরাপদে রাখার কথা, সেখানেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিআইডি জানায়, নির্বাচন কমিশনের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৩০ দিনে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬০৮টি এনআইডি রেকর্ড দেখা হয়েছিল। এক সপ্তাহেই দেখা হয়েছিল ১ লাখ ১২ হাজার ১৫০টি রেকর্ড। এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের দুই কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।

এর কয়েক সপ্তাহ পর আরেকটি ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের একটি অনলাইন ব্যবস্থায় প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রায় দুই ঘণ্টা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। নাম, এনআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর, ছবি, স্বাক্ষরসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখা যাচ্ছিল।

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার। তথ্য ফাঁস মানেই সবসময় কোনো হ্যাকার রাতে বসে সার্ভার ভেঙে ফেলেছে, এমন নয়। কখনো একটি ভুল কনফিগারেশন, কখনো দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কখনো ভেতরের কারও অপব্যবহার, আবার কখনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তথ্য হাতবদল হতে পারে।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো আরও ভয়ংকর। এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টাকা দিলেই এনআইডি, টিআইএন ও পাসপোর্টের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি একজনের গত কয়েক মাসের কল ডিটেইল রেকর্ডও টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি বলেছেন।

অর্থাৎ এখন প্রশ্নটা শুধু আপনার এনআইডি নম্বর কেউ জানে কি না, সেখানে নেই। আপনি কার সঙ্গে কথা বলেন, কোথায় যান, আপনার অফিস কোথায়, আপনার পরিবারের সদস্য কারা, এসব তথ্য একসঙ্গে চলে গেলে একজন মানুষকে নজরদারি করা পর্যন্ত সম্ভব হতে পারে।

এই বাস্তবতার মাঝেই ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন হয়েছে। আইনে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, অননুমোদিত প্রকাশ ও প্রবেশ ঠেকানোর দায়িত্ব তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রও এখন স্বীকার করছে, ব্যক্তিগত তথ্য একজন মানুষের সম্পদ এবং সেটির সুরক্ষা দরকার।

কিন্তু আইন করাই শেষ কথা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আইন ভাঙলে কী হচ্ছে।


আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। অচেনা ওয়েবসাইটে এনআইডির ছবি তুলে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন নেই এমন জায়গায় পুরো তথ্য দেওয়া যাবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানে তথ্য দিলে কেন নিচ্ছে, সেটা জানতে হবে। আর ফোনে কেউ ব্যক্তিগত তথ্য বললেই তাকে বিশ্বাস করার অভ্যাসও বাদ দিতে হবে।

তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর। একজন নাগরিক তার তথ্য দিয়ে একটি সেবা কিনতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে যেতে পারে না।

কারণ আজ আপনার তথ্য কারও হাতে গেছে। কাল সেই তথ্য দিয়ে আপনার নামে ঋণ নেওয়া হতে পারে, প্রতারণা হতে পারে, আপনার চলাফেরা নজরদারি করা হতে পারে, এমনকি আপনার পরিচয় ব্যবহার করেও অপরাধ ঘটতে পারে।

একসময় আমরা বলতাম, টাকা হারালে বিপদ। এখন সময় বদলেছে। এখন আপনার পরিচয়টাই যদি অন্য কারও হাতে চলে যায়, বিপদটা আরও বড়। তাই অনলাইনে তথ্য দেওয়ার আগে শুধু একটা প্রশ্ন করুন। আমার তথ্যটা যদি কাল আর আমার হাতে না থাকে, তখন কী হবে? 

সেই প্রশ্নের উত্তর না জেনে তথ্য দেওয়া এখন আর খুব নিরীহ ব্যাপার নয়।

লেখক : সাংবাদিক


সময়ের আলো/এমকে
  বিষয়:   মোবাইল  নম্বর  আড়াল  ভয়ংকর  বিপদ 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: