রাজনীতি হলো ন্যায়নীতি ও আদর্শ অবলম্বন করে জনগণের কল্যাণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা। রাজনীতির আবির্ভাব হয়েছিল মানুষের অধিকার, কল্যাণ, সেবা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার নিমিত্তে। যুগে যুগে জালিম শাসকদের জুলুম, নির্যাতন ও স্বৈরাচারী কার্যকলাপ থেকে জনগণকে মুক্ত করার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। রাজনীতির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের কল্যাণ।
পরিতাপের বিষয় এই যে, দেশ স্বাধীনের পর থেকে অধিকাংশ রাজনীতিবিদ মানবসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের দিকে ধাবিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে নিজের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করেছে। দিন দিন রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে ন্যায়নীতি ও আদর্শের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজনীতি যখন জনসেবার আদর্শ হারিয়ে অর্থ, ক্ষমতা ও শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয় তখন সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং সমাজে শোষণ ও বৈষম্য তীব্র আকার ধারণ করে।
রাজনীতি এখন আর পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদের হাতে নেই। আজকের দিনে খারাপ মানুষের ভিড়ে ভালো মানুষ রাজনীতি করতে চায় না প্রতারণা ও ক্ষতির ভয়ে। আমাদের দেশের রাজনীতি মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রিক। কোনো দল একবার ক্ষমতায় গেলে আর ছাড়তে চায় না। ক্ষমতার অপব্যহার ও ভোগ করার মানসিকতা আমাদের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ক্ষমতায় গিয়ে তারা যখন দুর্নীতি-লুটপাটে জড়িয়ে পড়ে তখন তারা জনগণের কাছে জবাবদিহির কথা ভুলে যায়।
রাজনীতিবিদরা চিন্তা করেন না যে, জনগণই দেশের মালিক এবং তাদের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। জনগণের কাছে জবাবদিহি ব্যবস্থা চালু থাকলে দেশের উন্নয়ন টেকসই হয়, ক্ষমতার অপব্যহার বন্ধ হয় এবং দেশ সঠিক পথে পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে দুর্নীতি, সরকারি সম্পদ লুণ্ঠন এবং মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন কমে যায়। বর্তমান নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করা।
ক্ষমতাকে একচেটিয়া প্রতিষ্ঠা করতে রাজনৈতিক নেতারা ঢাকা শহরের বড় বড় ময়দানে লাখ লাখ লোক ভাড়া করে নিয়ে আসে এবং ওখানে বক্তৃতা দেয় আর জনগণ হাততালি দেয়। তাদেরই জনগণ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, ভোট দেয়, জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে। একজন ভালো মানুষের মধ্যে যত যোগ্যতাই থাকুক না কেন, জনগণ তাকে ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচিত করে না। যার কাছে টাকা ও ক্ষমতা আছে তাকেই জনগণ ভোট দেয়। আর এসব প্রতিনিধি ক্ষমতায় আসীন হলে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যায় এবং স্বৈরাচারী কার্যকলাপ শুরু করে। এদের পোষা কর্মীরা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অবৈধ কার্যকলাপ শুরু করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতি মূলত অর্থ, ক্ষমতা, দলীয় প্রভাব এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনার বৃত্তে আবর্তিত হয়েছে। একজন রাজনৈতিক নেতাকে মানুষের অভাব, অভিযোগ, সমস্যা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সর্বদা দেশের ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে। রাজনীতি কেবল মাঠপর্যায়ে বক্তৃতা কিংবা মিছিলের বিষয় নয়। রাজনীতি হচ্ছে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জনসমাজের কল্যাণে কাজ করা। সে জন্য রাজনীতি ক্ষমতাকেন্দ্রিক না হয়ে মানবতাকেন্দ্রিক হতে হবে।
রাজনৈতিক নেতা ও শাসকের প্রথম কাজ হচ্ছে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আর সেটা করার জন্য যোগ্য ও নীতিবান নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। সঠিক নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন সততা, দক্ষতা, নৈতিকতা বোধ। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নৈতিকতার অভাব ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার ফলে রাজনীতিবিদরা ন্যায়নীতি, আদর্শ হতে দূরে সরে গিয়ে দুর্নীতিতে জড়িত হচ্ছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য সে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা করছে না।
রাজনীতি যখন মানুষের কল্যাণে করার পরিবর্তে অর্থ, ক্ষমতা ও শোষণের হাতিয়ার হয়ে যায় তখন রাজনীতি আর নৈতিকতার জায়গায় থাকে না। এখন অনেক নেতার একক ক্ষমতাশালী হওয়ার প্রতি আগ্রহ বেশি। নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতার প্রয়োগ নয়; এটি নৈতিকতা, দায়িত্ব, জনসেবা ও মানবিকতার সমন্বিত রূপ। আমাদের দেশে যে রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়েছে এটাকে কোনোভাবে আদর্শ নেতৃত্ব বলা যায় না। এটা একটা লোভ-লালসা ও ব্যবসাভিত্তিক লুণ্ঠন করার রাজনীতি।
রাজনীতি করব একটা লাভজনক ব্যবসায়ী হিসেবে— এ ধরনের প্রবণতা আমাদের রাজনীতিতে ঢুকে গেছে।
রাজনৈতিক দলের নেতা ও দলীয় অভিজাতদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষমতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। সে জন্য রাষ্ট্র দার্শনিক ম্যাক্স ওয়েভার ১৯১৯ সালে এক বক্তৃতায় রাজনীতিকে পেশা নামে অভিহিত করেছেন। তার মতে, রাজনীতিবিদরা শুধু মানবসেবার জন্য রাজনীতি করেন না। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা মাঠে-ময়দানে বলে থাকেন, স্রেফ জনগণের সেবা করতেই নাকি তারা রাজনীতিতে পা রেখেছেন, অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই!
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশ স্বাধীনের পর হতে নেতাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চিত্র যদি দেখা হয় তা হলে দেখা যায় রাজনীতিকে তারা পেশা হিসেবে ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে পেশাগতভাবে যারা রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ব্যবসায়ী। তারা রাজনীতিকে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করে রাতারাতি লাখ-কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আবার সেই একই ব্যবসায়ীরা বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করে জিনিসপত্রের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে দেশের মধ্য কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন।
সেই ব্যবসায়ীরা রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এমন কোনো হীন জঘন্য কাজ নেই তারা করছে না। অর্থ ও ক্ষমতার মোহ রাজনীতিকে বারবার কলুষিত করেছে। অর্থের মোহে বহু রাজনৈতিক নেতা অবৈধভাবে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেকেন্ড হোম তৈরি করছে। রাষ্ট্রকে তারা টাকা ইনকামের মেশিন বানিয়েছে। ধান্ধা করবে আর বিদেশে টাকা পাচার করবে এই লক্ষ্যেই তারা কাজ করছে। অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকায় তাদের বউ-বাচ্চারা বিদেশে আরাম-আয়েশ করছে। বিগত ১৭ বছরে দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এর অধিকাংশ টাকা রাজনীতিবিদরা পাচার করেছে।
রাজনীতি একটি ব্রত, একটি মহৎ উদ্দেশ্য, যেখানে জনগণের সেবা এবং দেশপ্রেম হলো প্রধান লক্ষ্য। তখনকার রাজনীতিবিদরা নিজেকে দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করতেন এবং তাদের জীবনে কোনো ব্যক্তিগত লাভের আশা ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা, দেশের উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির সংজ্ঞা বদলে গেছে।
প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি