রোডক্র্যাশের আগেই চাই প্রতিরোধ

তরিকুল ইসলাম

মতামত

দেশের সড়ক-মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে চলছে ছোট ছোট

2026-09-16T04:52:05+00:00
2026-09-16T04:52:05+00:00
 
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
সড়ক নিরাপত্তা আইন
রোডক্র্যাশের আগেই চাই প্রতিরোধ
তরিকুল ইসলাম
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৫২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দেশের সড়ক-মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে চলছে ছোট ছোট যানবাহন। কোথাও সড়কে খানাখন্দ, কোথাও ভাঙাচোরা অবকাঠামো, আবার কোথাও নির্ধারিত গতিসীমা না মেনে চলছে যানবাহন। এর সঙ্গে দুর্বল আইন প্রয়োগ ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব যুক্ত হয়ে সড়ককে অনেক ক্ষেত্রেই মরণফাঁদে পরিণত করেছে। ফলে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় রোডক্র্যাশ, ঝরছে অসংখ্য প্রাণ।

রোডক্র্যাশের ক্ষতি শুধু একজন মানুষের মৃত্যুতে শেষ হয় না। এর প্রভাব পড়ে একটি পরিবারের মানুষের শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে। দুর্ঘটনায় আহত একজন মানুষ দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তায় ভোগেন। অনেকে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারান। আর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রোডক্র্যাশে নিহত বা গুরুতর আহত হলে সেই পরিবারটি পড়ে যায় দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মুখে। একটি রোডক্র্যাশ শুধু একটি জীবন কেড়ে নেয় না; অনেক সময় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও বিপন্ন করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত ২০২৩-এর তথ্যানুযায়ী বিশ্বব্যাপী ৫-২৯ বছর বয়সের মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ রোডক্র্যাশ। এতে আরও বলা হয় প্রতি মিনিটে ২ জনের বেশি এবং প্রতিদিন কমপক্ষে তিন হাজার ২০০ জনের মৃত্যু হচ্ছে এই রোডক্র্যাশে এবং বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ নিহত হয়। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী সব বয়সের মানুষের মৃত্যুর ১২তম প্রধান কারণ রোডক্র্যাশ।

বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ৩৪ হাজার ৮৯৪টি রোডক্র্যাশে ৩৭ হাজার ৩৮২ জন নিহত এবং ৫৯ হাজার ৫৯৭ জন আহত হয়েছেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মে, জুন ও জুলাই মাসে সড়ক, রেল ও নৌপথে ১ হাজার ৭৭৪টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিন মাসের গড় হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই— সড়ক নিরাপত্তা এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটার পর তদন্ত, মামলা কিংবা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যা দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি কমাবে।

বর্তমান সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ মূলত পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক। আধুনিক সড়ক নিরাপত্তার বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ গতি, পথচারী সুরক্ষা, নিরাপদ অবকাঠামো, যানবাহনের নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবাকে আরও সমন্বিতভাবে আইনি কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, হেলমেট ও সিটবেল্টের ব্যবহার, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো বন্ধ, শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা— এসব ক্ষেত্রেও কঠোর ও বাস্তবায়নযোগ্য বিধান জরুরি।

শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; এর প্রয়োগেও থাকতে হবে জবাবদিহিতা। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি ও চেকপোস্ট বাড়াতে হবে। পাশাপাশি রোডক্র্যাশের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে প্রয়োজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্তব্যবস্থা। একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে। রোডক্র্যাশের পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবাও জীবন বাঁচানোর অন্যতম প্রধান শর্ত। 

মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ২৪ ঘণ্টা ট্রমা সেন্টার, হাইওয়ে অ্যাম্বুলেন্স এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। প্রতি ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পরপর প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী, অক্সিজেনসহ অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ডবাই রাখা গেলে দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। কারণ দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক মিনিট ও ঘণ্টা একজন আহত মানুষের জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।


সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস, চালকের দক্ষতা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ, জরুরি চিকিৎসা— সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে চালক ও পথচারী উভয়ের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে সচেতনতার পাশাপাশি জবাবদিহিতাও প্রয়োজন।

সড়কে প্রাণহানি কমাতে এখন আর বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি স্বতন্ত্র, সমন্বিত ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন। রোডক্র্যাশের পর বিচার নয়, দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধ— এই দর্শনকে সামনে রেখে সড়ক নিরাপত্তা নীতির পরিবর্তন জরুরি।

অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন)
রোড সেফটি প্রকল্প, ঢাকা আহছানিয়া মিশন

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি  
  বিষয়:   রোডক্র্যাশ  প্রতিরোধ  সড়ক নিরাপত্তা আইন 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: