রাজধানী ঢাকার ভেতরে যাতায়াত-যোগাযোগে যাত্রীসাধারণদের প্রতিনিয়ত যেসব ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয় তার মোক্ষম ওষুধ হতে পারে মেট্রোরেল। ইতিমধ্যে উত্তরা-মতিঝিল রুটের মেট্রোরেল দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন হিসেবে রাজধানীবাসীর কাছে সমাদৃত হয়েছে। নগরবাসী চায়, আরও বেশি রুটে মেট্রোরেলের সুবিধা বিস্তৃত হোক।
সরকারেরও এ নিয়ে পরিকল্পনা আছে, উদ্যোগ নিচ্ছে। নতুন একটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। পুরোনো দুটি প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বাড়ানো হয়েছে। ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ৩টি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন নতুন রুট। পাশাপাশি চলমান এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (নর্দার্ন) প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ও সময় বাড়ানোর প্রস্তাবও পাস হয়েছে।
এই উদ্যোগ নগরবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। আবার কিছু প্রশ্নও উঠেছে। মেট্রোরেলের মতো পরিবহনব্যবস্থা নির্মাণে জনগণের কত টাকা কীভাবে খরচ হবে? সেই খরচের ভার শেষ পর্যন্ত বইতে হবে কাকে?
সময়ের আলোয় গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দার্ন রুটের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। তিন প্রকল্পে মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে আড়াই লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এত বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খরচের প্রতিটি ধাপ নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা জরুরি।
পুরোনো দুই প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর কিছু কারণ তুলে ধরেছে সরকার। এসব কারণকে উপেক্ষা করা যায় না। তারপরও বলতে হয়, কোনো প্রকল্পের খরচ যদি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যায় তখন জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়। আবার রুটভেদে খরচের ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন থাকে। নতুন সাউদার্ন রুটে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়ছে প্রায় ২ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এমআরটি লাইন-১-এ তা প্রায় ৩ হাজার ৬৬২ কোটি এবং লাইন-৫ নর্দার্ন রুটে প্রায় ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সব মেট্রোরেলের নির্মাণ খরচ এক রকম হবে না। কোথাও পাতালপথ, কোথাও উড়ালপথ, কোথাও গভীর ভূগর্ভে স্টেশন নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। প্রযুক্তি ও নির্মাণপদ্ধতির পার্থক্যও থাকতে পারে। তারপরও রুটভেদে নির্মাণ খরচের এত বড় পার্থক্যের কারণগুলো জনসমক্ষে পরিষ্কার করা দরকার। এতে মেগা প্রকল্পের কাজে যেমন স্বচ্ছতা বাড়বে, তেমন জনআস্থাও বাড়বে। মেগা প্রকল্পে জরুরি হচ্ছে ভুলচুক যথাসম্ভব কমানো, অনিয়ম-দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করা।
ভাড়ার প্রশ্নও রয়েছে। নির্মাণ খরচ যত বাড়বে, প্রকল্পের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার চাপও তত বাড়বে। সেই চাপ যদি ভাড়ার ওপর পড়ে, তা হলে যাত্রীদের তার ভার বইতে হবে। আবার ভাড়া কম রাখলে সরকারের ভর্তুকি বাড়াতে হবে। তখনও জনগণের টাকাই খরচ হবে। তাই প্রকল্প অনুমোদনের সময়ই নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ এবং সম্ভাব্য ভাড়ার একটি বাস্তবসম্মত হিসাব করা দরকার।
রাজধানীবাসীর মেট্রোরেল অবশ্যই চাই। ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে আরও মেট্রোরেল প্রয়োজন। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শুধু উন্নত ও আধুনিক করলেই হবে না; জনগণের জন্য গণপরিবহন হতে হবে সাশ্রয়ী। জনগণের টাকায় তৈরি মেট্রোরেল যেন শেষ পর্যন্ত জনগণের নাগালে থাকে— সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে