আজ শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে এই পূর্ণিমা একাধিক কারণে অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিনেই বুদ্ধাঙ্কুরের মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ, রাজপুত্র সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ, বারাণসীর মৃগদাবে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদের উদ্দেশে ভগবান বুদ্ধের ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র দেশনা এবং শ্রাবস্তীর গণ্ড আম্রবৃক্ষতলে যমক ঋদ্ধি প্রদর্শনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছিল।
গভীর রাত, রাজরানি মহামায়া রাজপালঙ্কে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি স্বপ্নে দেখলেন সৌম্যোজ্জ্বল দেবদূতরা তাকে এক মনোরম পালঙ্কে বসিয়ে এক হ্রদের তীরে নিয়ে এলো। চাঁদের জ্যোছনা ছড়ানো রমণীয় সে হ্রদ। অতলায়িত সে জলে সহস্রদল পদ্ম লাবণ্যে আর লালিমায় রক্তিম। এক সাদা হাতি সে অমৃত নির্ঝর সরোবরে জলকেলিতে মত্ত। হাতিটি রাজরানি মহামায়াকে দেখতে পেয়ে কাছে এগিয়ে এলো। একটি বর্ণময় পদ্ম মহামায়ার ডান কুক্ষিতে (গর্ভ) প্রবেশ করিয়ে দিল।
হঠাৎ মহামায়ার ঘুম ভেঙে গেল। তিনি পড়িমরি করে রাজপালঙ্কে উঠে বসলেন। শাক্যরাজ্যের প্রাণপুরুষ রাজা শুদ্ধোদনের রাজমহীয়সী তিনি। তুষার মৌলিধবল গিরি হিমালয়ের পাদদেশের সে রাজা। রাজধানী কপিলাবস্তু। রাজ্যে তার প্রবল প্রতাপ। দৌরাত্ম্যে আর মাহাত্ম্যে আদিগন্ত মুখরিত।
রানী মহামায়া রাজা শুদ্ধোদনকে স্বপ্নের বিস্তারিত খুলে বললেন। রাজা এ ধরনের স্বপ্নের কথা রানীর মুখে শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি রাজ্যের রাজজ্যোতিষীদের কাছে রাজরানীর প্রচ্ছন্ন স্বপ্ন-বৈভবের বিশদ ব্যাখ্যা চাইলেন। শুরু হলো ব্রহ্মবাদী শ্রুতধর রাজজ্যোতিষীদের বিচার-বিশ্লেষণ, গণনা, তর্ক।
দিন যায়। মহামায়ার দিন এগিয়ে আসতে থাকে। রাজা শুদ্ধোদন হিমালয়ের সূর্যোদয়ের আরক্তিম আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। শ্যামল শান্ত মূর্তি। স্বপ্নের অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন। শেষে একদিন রাজজ্যোতিষীরা রাজসভাতে হাজির হলেন। সবাই আসন গ্রহণ করল। রাজা শুদ্ধোদন বিচলিত। তিনি সৌম্যোজ্জ্বল চোখে সবার মুখের দিকে তাকালেন। শুদ্ধতায় আর প্রতীক্ষায় উজ্জ্বল। সামনে বসে থাকা গণতকাররা কী বলবে কে জানে। রাজজ্যোতিষীরা কিন্তু প্রাণচঞ্চল। সর্বাতীতভাবে স্বয়ং প্রকাশ।
রাজজ্যোতিষীরা সবার সামনে পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা দিলেন, রাজরানি রাজেন্দ্রানি মহামায়ার গর্ভে এক ভাবি মহাপুরুষ জন্ম নেবেন। দিব্যদর্শন এক পুরুষোত্তম আসছেন। চিত্তসমাহিত এই পুরুষের জন্ম হবে দিব্য যোনিতে। পুরো রজতগিরি উদ্ভাসিত হবে এই শিশু ভোলানাথের জ্ঞানসূর্যে। তবে এ শুভ সংবাদে কিছু অশুভ সংবাদও আছে যা বিয়োগ-বিচ্ছেদ সংক্রান্ত। রাজা এ কথা শুনে বিস্ময়ে তাকালেন চারদিকে। গণকরা বললেন, পুত্রের জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে মায়াদেবীর মৃত্যু হবে। এ মৃত্যু অমোঘ, অনিবার্য।
পুত্রের জন্ম সংবাদ শুনে রাজা শুদ্ধোদন একদিকে যেমন প্রফুল্লতার প্রাচুর্যে প্রাণবন্ত হলেন, অপরদিকে শোকে মুহ্যমান হতেও দেরি হলো না। প্রাণের প্রিয়তমা রানীর আসন্ন মৃত্যু সংবাদে তিনি শুধু বিচলিত হলেন না, বিমূঢ় আর বিস্মিতও হলেন। রাজা বললেন, এ মৃত্যু খণ্ডনের কি কোনো ব্যবস্থা নেই! রাজজ্যোতিষীরা একযোগে জানালেন, অমোঘ অনিবার্য মৃত্যু পূর্বনির্ধারিত। রাজা এ কথা শোনে নীরব হয়ে গেলেন।
রাজরানির আসন্ন মৃত্যুসংবাদে একদিকে যেমন শাক্য রাজ্যে গভীর শোক নেমে এলো, অপরদিকে মহাপুরুষের জন্মের আগাম সংবাদে রাজ্যময় মুখরিত হলো। প্রজাদের মনে আনন্দের স্রোত বইতে থাকল। উল্লিখিত ঘটনাগুলো আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথি সংশ্লিষ্ট হওয়ায় আজকের দিনটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যবহ।
আজকের এই শুভক্ষণের সঙ্গে বুদ্ধের আরও কয়েকটি ঘটনাবলি বিদ্যমান। আসন্ন প্রসবা মহামায়ার রূপ যেন বাঁধ মানছে না। যেন লাবণ্যবারি উদ্বেলিত হয়ে উঠছে। সে রূপ সূর্যাস্তের রক্তিমে আদিগন্ত সমাহিত। স্তব্ধতায় বাক্সময়। ধনধারিণী বসুন্ধরায় সচ্চিদানন্দ শিবের জন্ম হবে। ভূকৈলাসের রাজা আসবেন মর্ত্যভূমিতে। ক্লেদাক্ত, প্রবঞ্চিত, লোভ-লালসা আর আশা-আকাক্সক্ষায় নিমজ্জিত এই পৃথিবীকে করে তুলবেন করুণাদ্রবা। জ্যোতি রূপোজ্জ্বলা, প্রাণময়ী পরামার্থা। যুগে যুগে মহাপুরুষরা এভাবেই পৃথিবীতে এসেছিলেন।
আজকের দিনের কর্মসূচি শুরু হয়েছে বিশ্বশান্তি কামনায় বিশেষ সূত্র পাঠের মধ্য দিয়ে। এরপর বুদ্ধ পূজা, গৃহীদের পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ। কোনো কোনো বিহারে বিকাল বেলায় খণ্ডকালীন বিদর্শন ভাবনা হবে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিহারে করা হবে আলোকসজ্জা। রাতেও প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল থেকে তিন মাসব্যাপী শুরু হবে ‘বর্ষাবাস’। এই ক্ষণটি আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির অনন্য অবদান।
আজকের আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথির আলোকে বলতে চাই, মহামানব গৌতম বুদ্ধ মানবমুক্তির জন্যে কতকগুলো বিধিবিধানের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। আমরা এর সঠিক প্রতিফলন কি সমাজ বা ব্যক্তিজীবনে ঘটাতে পেরেছি? মনে হয় পারিনি। তার কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে ধর্মীয় কার্যাদিতে বুদ্ধনীতি মোতাবেক আমরা তেমন অগ্রসর হতে পারছি না। ভিক্ষুসংঘের মধ্যে রয়েছে মতের অমিল। আমরা জড়িয়ে যাচ্ছি নানা কলহে।
ধর্মীয় অনুশাসন মানে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন। পুরো এশিয়া ভূখণ্ডে বুদ্ধ সাম্যবাদের কথা প্রচার করেছিলেন। প্রতিটি মানুষের মর্যাদাবোধকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন, বুদ্ধ জগতের শ্রেষ্ঠ সাম্যবাদী। দুঃখের বিষয়, আজ মানুষে মানুষে ঘৃণা, অবজ্ঞা আর অবহেলার শেষ নেই। মানুষের এই অসম্মান শুধু ব্যক্তি মানুষেরই নয়, সমগ্র জাতির। এ বোধ জাতীয় সংহতির বাধাস্বরূপ হয়ে আজ জনজীবনকে আঁকড়ে ধরছে। দিকে দিকে তাই মানুষ ব্যর্থতার গ্লানিতে ও অকৃতকার্যতায় ভারাক্রান্ত।
বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, অপবিত্র ভেদবুদ্ধির নিষ্ঠুর মূঢ়তা। ধর্মের নামে আজ রক্তে পঙ্কিল করে তুলেছে এই ধরাতল। পরস্পর হিংসার চেয়ে সাংঘাতিক ঘৃণায় মানুষ এখানে পদে পদে অপমানিত। সর্বজীবে মৈত্রীকে মুক্তির পথ বলে ঘোষণা করেছিলেন বুদ্ধ। এই ভ্রাতৃবিদ্বেষ কলুষিত হতভাগ্য দেশে ভগবান বুদ্ধ একদিন রাজসুখ, সম্পদ ত্যাগ করে তপস্যায় বসেছিলেন। যে তপস্যার উদ্দেশ্য ছিল- সব মানুষের দুঃখ মোচন। এই তপস্যার মধ্যে কি অধিকার ভেদ ছিল? কেউ কি ছিল ম্লেছা, কেউ কি ছিল অনার্য? বুদ্ধ তার সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন দীনহীন মানুষের জন্যে। তার এই তপস্যার মধ্যে ছিল নির্বিচারে সব দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা।
বর্তমান সময়টা বিশ্ববাসীর জন্য তেমন সুখকর নয়। প্রতিদিন সংঘাত কোথাও না কোথাও ঘটছে। অধিকাংশ সংঘাত ব্যক্তি পর্যায়ে পড়ে। বুদ্ধনীতিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে-‘ত্যাগই শান্তি। ত্যাগ আমরা করতে পারছি না বলে নানা কলহে জড়িয়ে যাচ্ছি। তাই আজকের আষাঢ়ী পূর্ণিমার শুভক্ষণে বলতে চাই- বুদ্ধের মাতৃগর্ভে যেভাবে আগমন ঘটেছে সেভাবে যদি প্রত্যেক কিছুতে এর প্রভাব পড়তে পারে তা হলে যত ধর্মীয় নীতি মোতাবেক সৎ পথের সন্ধানে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারি তবে দুঃখের ভার কিছুটা হলেও আমাদের লাঘব হবে।
আজকের এই দিনে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত চরণগুলো স্মরণ করি- পাষাণের মৌনতটে যে বাণী রয়েছে চিরস্থির- / কোলাহল ভেদ করি শতাব্দীর/ আকাশে উঠিছে অবিরাম- / অমের প্রেমের মন্ত্র- ‘বুদ্ধের শরণ লইলাম।’
প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি