সাহসী ভাষায় তারুণ্যের ক্রোধ দেখল ভারত সরকার

মো. তাহমিদ রহমান

মতামত

ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তরুণ সমাজ বরাবরই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে জরুরি অবস্থাবিরোধী আন্দোলন কিংবা দুর্নীতিবিরোধী গণআন্দোলন

2026-07-28T06:41:17+00:00
2026-07-28T06:41:17+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬,
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
মতামত
সাহসী ভাষায় তারুণ্যের ক্রোধ দেখল ভারত সরকার
মো. তাহমিদ রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৬:৪১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তরুণ সমাজ বরাবরই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে জরুরি অবস্থাবিরোধী আন্দোলন কিংবা দুর্নীতিবিরোধী গণআন্দোলন প্রতিটি পর্যায়েই তরুণ প্রজন্মের ছাত্রসমাজ তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। 

২০২৪ সালের নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক এবং শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতার সংকটকে কেন্দ্র করে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ ছিল না বরং এটি ভারতের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিয়ে তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। 

২০২৬ সালের ৩ মে নিট পরীক্ষার আয়োজন করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি। ২২ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল সেই পরীক্ষায়। পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসে। বহু ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক এবং কোচিং প্রতিষ্ঠান দাবি করছে পরীক্ষার আগের রাতেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে। ভারতে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট পরীক্ষায় অংশ নেয়। 

২০২৪ সালেও ২৪ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু ফল প্রকাশের পরই একাধিক অস্বাভাবিকতা সামনে আসে। একই কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক পূর্ণ নম্বর, ‘গ্রেস মার্কস’ নিয়ে বিতর্ক, বিহারসহ কয়েকটি রাজ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে দোষী ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও তদন্ত সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। সেই ঘটনার তদন্তে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। 

একই সঙ্গে ভারতের জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার (এনটিএ) কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছিল। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত একাধিক শুনানিতে স্পষ্ট করে যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে এবং এর তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন হওয়া উচিত। তবে আদালত একই সঙ্গে এটিও পর্যবেক্ষণ করেন যে, সমগ্র দেশের পরীক্ষা বাতিল করার মতো সর্বব্যাপী প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে পুনরায় সর্বভারতীয় পরীক্ষা নেওয়ার আবেদন শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়নি। 

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো ২০২৪ সালে নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত প্রধান আসামি সঞ্জীব কুমার ওরফে সঞ্জীব মুখিয়াকে ক্লিনচিট দিয়েছে সিবিআই। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, তদন্তে সঞ্জীব কুমারের বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁসের কোনো প্রমাণ মেলেনি। তাই তাকে ক্লিনচিট দেওয়া হলো। 

এরই মাঝে ২০২৬ সালের নিট পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে দিল্লিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তাল হতে দেখে কেন্দ্রীয় সরকার নিট পরীক্ষা বাতিল করে এবং পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ঘটনার তদন্তভার তুলে দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইর হাতে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে দিল্লির শাস্ত্রী ভবনের সামনে বিক্ষোভে থাকা ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার অভিযোগ, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষার স্বচ্ছতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এনটিএ। সংস্থাটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি তোলা হয়। 

ভারতে প্রশ্নফাঁস কোনো নতুন ঘটনা নয়। শুধু নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়, ব্যাপারটা এমনও নয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন ভর্তি বা চাকরির পরীক্ষার অহরহই প্রশ্নফাঁস হয়। সম্প্রতি ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের শিক্ষক যোগ্যতা নির্ধারণ বাছাই পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে প্রায় ছয় লাখ চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। ওই ঘটনার প্রায় এক মাস পর গত শনিবার থানে সিটি পুলিশপ্রধান অভিযুক্ত বিজেন্দ্র গুপ্তকে বিহার রাজ্য থেকে গ্রেফতার করেছে। 

বিজেন্দ্র গুপ্ত মহারাষ্ট্র থেকে পালিয়ে ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে বিহারে বসবাস করছিল। নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দিল্লির যন্তরমন্তরে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন শুরু করে। ৬ জুন থেকে বিক্ষোভ শুরু করে সম্প্রতি গড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্মের ককরোচ জনতা পার্টি। 

ক্রমশ বিক্ষোভ দাবানলে রূপ নেয়। এরপর ২০ জুন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ শুরু করেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। বিক্ষোভ মঞ্চে যোগ দেন লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, দায়ীদের শাস্তি এবং পরীক্ষা পরিচালনায় কাঠামোগত সংস্কার। 

এই আন্দোলন ভারতীয় তরুণদের একটি গভীর হতাশার প্রতীক হয়ে ওঠে। কারণ শুধু একটি পরীক্ষা নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল, প্রশ্নফাঁস এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব লাখ লাখ তরুণের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। 

গত ১০ বছরে ভারতে বিভিন্ন পরীক্ষায় ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও একটি মামলায়ও দোষীদের সাজা হয়নি। এক দশকে ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে একটি করে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এসব ঘটনায় কোটি কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানেই গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। 


আদালতের কাজ আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া; কিন্তু রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নির্ধারণের দায়িত্ব জনগণ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার। তাই আদালতের পর্যবেক্ষণকে রাজনৈতিক রায় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি রাজনৈতিক দায় এড়ানোর ঢাল হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত নয়। সংগত কারণেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে। ক্রমশ বাড়তে থাকা আন্দোলনের চাপের মুখে শনিবার দুপুরে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। 

ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রভাব বিস্তার করছে। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার আবারও ক্ষমতায় ফিরলেও চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সমালোচনা, সংসদীয় বিতর্ক এবং জনমতের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নিট কেলেঙ্কারি সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি প্রতীক। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে, সরকার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। 

সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হয়েছে, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করার জন্য আইন ও প্রশাসনিক সংস্কার আনা হচ্ছে। 

ককরোচদের আন্দোলন মোদি সরকারকে এই বার্তা পৌঁছাতে সফল হয়েছে যে ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থায় বড় ধরনের অবিশ্বাস জন্মেছে। একটি দেশের উন্নয়নের ভিত্তি তার শিক্ষাব্যবস্থা। যখন একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পরিশ্রম করার পর প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ শোনে, তখন শুধু একটি পরীক্ষা নয়, রাষ্ট্রের প্রতি তার বিশ্বাসের অনাস্থা সৃষ্টি হয়। মেধার পরিবর্তে প্রতারণা যদি সুযোগ তৈরি করে, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং জাতীয় সক্ষমতারও ক্ষয় ঘটায়। 

আজকের ভারতের তরুণরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, বেশি সচেতন এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের মত প্রকাশের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ফলে কোনো অনিয়ম এখন আর সহজে আড়াল করা যায় না। নিট বিতর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং আদালতের কার্যক্রম মিলিয়ে একটি নতুন ধরনের জনপরিসর তৈরি হয়েছে, যেখানে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গণতন্ত্রে প্রতিবাদ কখনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়, বরং রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক করার একটি সাংবিধানিক মাধ্যম। সরকারেরও উচিত সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে নীতিগত সংস্কারের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। 

নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো পরীক্ষা পরিচালনা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বও। পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, স্বাধীন নিরীক্ষা, স্বচ্ছ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট ফিরে আসতে পারে। 

ভারতের তরুণ সমাজ আজ যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, তার ভাষা কেবল প্রতিবাদের ভাষা নয়; এটি ন্যায্য প্রতিযোগিতা, সমান সুযোগ এবং স্বচ্ছ রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবির ভাষা। দেশটির সরকার যদি এই বার্তা উপলব্ধি করে শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে এই সংকট একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। আর যদি এই সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়, তবে প্রশ্নফাঁসের চেয়েও বড় সংকট হবে তরুণদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা। রাষ্ট্রের শক্তি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নয়, জনগণের বিশ্বাসে নিহিত। 

সেই বিশ্বাস রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ভারতের তরুণরা আজ সেই বিশ্বাসেরই দাবি জানিয়েছে স্পর্ধার ভাষায়, কিন্তু গণতন্ত্রের অধিকার নিয়ে। তাই পৃথিবীর সব সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ুক অধিকার আদায়ে তারুণ্যের ক্রোধের এই স্পর্ধার ভাষা।

শিক্ষক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   সাহসী  ভাষা  তারুণ্য  ক্রোধ  ভারত সরকার 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: