অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের ভূমিকা পালনের প্রয়োজন রয়েছে। অভিভাবকদের অবশ্যই তাদের শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় তাদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া এবং বিষয়টি তদারক করা। শিশুদের বয়স ও চাহিদা অনুযায়ী ডিভাইস দিতে হবে।
এখন শিশুরা টিভি দেখার চেয়ে মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাব ব্যবহারে অধিক আগ্রহী। তাই ওই সব ডিভাইসে চাইল্ড লক ও অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ব্যবহারের বিষয়ে তাদের সতর্ক করতে হবে।
ডিজিটাল স্ক্রিন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্ব ধীরে ধীরে ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তরিত হচ্ছে যেখানে অনলাইন ও ডিজিটাল ডিভাইস ছাড়া অনেক কিছু করা সম্ভব হবে না। বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর নেতিবাচক দিকও আছে, যা আমাদের জীবনের অনেক কিছু নষ্ট করে দিচ্ছে।
বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের জন্য এটা অনেকভাবে ক্ষতির কারণ হচ্ছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে আইসিডিডিআরবির একটি গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিন আসক্তির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকার ছয়টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর গবেষণা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে চারটি শিশু অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ শিশু প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে।
এই সময় শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় দুই ঘণ্টার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে শিশুরা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাব, কম্পিউটার ও গেমিং ডিভাইসে দিনে ৪ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট সময় কাটায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় ভুগছে। আর ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই ভুগছে মাথা ব্যথায়। যারা দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ঘুমায়। এই বয়সের শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমের তুলনায় তা অনেক কম।
এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার। যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এই হার বেশি। গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে দুটি শিশু দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।
ডিজিটাল স্ক্রিন তথা কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও স্মার্ট ফোন ব্যবহারকে বোঝায়। শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি, অনলাইন ব্যবসা, সামাজিক মাধ্যম ইত্যাদি কারণে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে যেখানে শিশুদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বছরকয়েক আগে ইউনিসেফ বলেছিল প্রতিদিন ১ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি বা প্রতি আধা সেকেন্ডে একজন শিশু প্রথমবারের মতো অনলাইন জগতে প্রবেশ করে।
ইউনিসেফের ডাটা রিসার্চ ও পলিসি বিভাগের পরিচালক লরেন্স চ্যান্ডি বলেন, ‘প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু প্রথমবারের মতো অনলাইনে যাচ্ছে, যা তাদের জন্য ব্যাপক বিপদের দ্বার উন্মুক্ত করে। অথচ বিপদগুলো চিহ্নিত করার বদলে আমরা কেবল মূল্যায়নই করে যাচ্ছি। অনলাইনে সবচেয়ে ভয়াবহ ঝুঁকিগুলো দূর করার জন্য নীতিমালা প্রণয়নে সরকার ও বেসরকারি খাতগুলো অবশ্য কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে শিশুদের অনলাইন জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বুঝতে ও তা সুরক্ষিত করার জন্য আরও পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। কেননা এখন তাদের শিক্ষার মাধ্যমের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। করোনা ভাইরাসের সময় অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিনের সঙ্গে ব্যাপক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়, যা সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে। এখন তো কেবল শিক্ষা নয়, আরও বহুভাবে শিশুরা ডিজিটাল স্কিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, অনেক ক্ষেত্রে সেটা আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশও এর জন্য দায়ী।
অভিভাবকরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাধ্য, আবার অনেক ক্ষেত্রে উদাসীন কিংবা নিজেরাই বাচ্চাদের ব্যস্ত রাখার জন্য তাদের হাতে ডিজিটাল স্ক্রিন দেন। বিপরীতে বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত খেলাধুলার সুযোগ না থাকা, অভিভাবকের ব্যস্ততা এবং সচেতনতার অভাব বাচ্চাদের সুযোগ দিচ্ছে। সব মিলে আমাদের শিশুরা প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে সময় পার করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শিশুদের মধ্যে প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় কারণে এর ব্যবহার বেশি, যা তাদের অনেকভাবে ক্ষতি করছে।
আমাদের করণীয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবা দরকার। যেহেতু শিশুদের এ মাধ্যম থেকে বিরত রাখা সম্ভব নয়, সেহেতু আমাদের ভাবা উচিত তাদের কতটা সুযোগ দেব। তাদের জন্য একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করাও প্রয়োজন। এ অবস্থার উন্নয়নে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের ভূমিকা পালনের প্রয়োজন রয়েছে।
অভিভাবকদের অবশ্যই তাদের শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় তাদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া এবং বিষয়টি তদারক করা। শিশুদের বয়স ও চাহিদা অনুযায়ী ডিভাইস দিতে হবে। এখন শিশুরা টিভি দেখার চেয়ে মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাব ব্যবহারে অধিক আগ্রহী। তাই ওই সব ডিভাইসে চাইল্ড লক ও অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ব্যবহারের বিষয়ে তাদের সতর্ক করতে হবে। অবশ্যই সময় সময় তাদের ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করা অভিভাবকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ভালো হয় যদি অভিভাবক নিজেই শিশুদের সঙ্গে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার করেন।
অনেক অভিভাবক শিশুশিক্ষার্থীদের আধুনিক ও দামি মোবাইল দেন, যা কাম্য নয়। বিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে মোবাইল নিয়ে যায়, যদিও অনেক বিদ্যালয়ে সেটা নিষেধ। অভিভাবকদের এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে তাদের উপযোগী ডিভাইস দেওয়া দরকার। বিদ্যালয়ের যাওয়ার সময় সেগুলো যাতে বাসায় রেখে যায় সেটা নিশ্চিত করা জরুরি।
কেবল শিশুরা নয়, বাবা-মাদেরও অহেতুক ডিভাইস ব্যবহার থেকে বিরত থাকার উদাহরণ তৈরি করতে হবে। শিশুরা অনুকরণ করে, তাই তাদের সামনে অভিভাবকদের আদর্শ হওয়া জরুরি। অভিভাবকদের উচিত ডিজিটাল স্কিনের ক্ষতির বিষয়ে নিজেরা সচেতন থাকবেন ও বাচ্চাদের সচেতন করবেন। বিশেষ করে রাতে বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় অপ্রয়োজনে ডিভাইস ব্যবহার না করার অভ্যাস অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি করতে হবে। এমনকি পেশাগত বা ব্যবসায়িক কাজ বাসায় না করাই উত্তম, যাতে ডিভাইস কম ব্যবহার করতে হয়।
শিশুদের কেবল শাসন ও ধমক না দিয়ে বিকল্প তথা সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করাও অভিভাবকদের দায়িত্ব। বই পড়া, পত্রিকা পড়া, বাসায় ব্যায়াম করা, গল্প করা, মাঝেমধ্যে তাদের নিয়ে সপরিবারে বেড়ানো ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত রাখা যায়। চেষ্টা করা তাদের বাইরের পরিবেশের সঙ্গে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি করা, আউটডোর খেলার সুযোগ দেওয়া। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা তাদের উপযোগী পরিবেশ পেলে নিজেরাই ডিভাইস থেকে দূরে থাকবে। আবার ডিভাইসের মাধ্যমে কীভাবে গঠনমূলক কাজ করা যায় সে বিষয়েও তাদের ধারণা দেওয়া উচিত।
প্রতিদিন সময় করে পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে গল্প বা আড্ডা দেওয়ার অভ্যাস করলে শিশুরা কেবল ডিভাইস থেকে দূরে থাকবে না, সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধনও দৃঢ় হবে। সম্ভব হলে শিশুদের শিক্ষণীয় ও সৃজনশীল কার্টুন বা ভিডিও দেখে তাদের সময়কে আরও গঠনমূলক করা যায়। শিশুদের বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে স্ক্রিন ব্যবহারের কৌশল শিক্ষা দেওয়াও জরুরি যাতে তাদের চোখ ও শরীরের ক্ষতি কমানো যায়। ২০-২০-২০ পদ্ধতির শিক্ষা দেওয়া যাতে তারা নির্দিষ্ট সময় পরপর চোখের যত্ন নেয়। সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের কোনো অ্যাকাউন্ট আছে কি না এবং সেখানে তারা কী করে তা দেখাও অভিভাবকদের দায়িত্ব।
শিশুদের মধ্যে এর ব্যাপকতার কথা চিন্তা করেই গত ডিসেম্বরে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করেছে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার এই পথ অনুসরণ করে ব্রিটেনও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ডেনমার্ক ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ফ্রান্সের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য একই ধরনের একটি বিল অনুমোদন করেছে। গ্রিস, স্লোভেনিয়া এবং পোল্যান্ডও ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তুতি নিচ্ছে। নরওয়ে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ন্যূনতম বয়স ১৩ থেকে বাড়িয়ে ১৫ করার পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া ইতালি ও জার্মানিতে নির্দিষ্ট বয়সের নিচে এসব প্লাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অনুমতির বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সরকারের উচিত হবে এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করা। শিক্ষার্থীদের ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করার জন্য বিদ্যালয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সেমিনার আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয়গুলোতে অপ্রয়োজনে ডিভাইস নিয়ে আসার বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে একই রকম উদ্যোগ অভিভাবকদের জন্যও আয়োজন করা দরকার।
একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক ও প্রয়োজনে জরিমানার বিধান করার বিষয়টি ভাবা দরকার। আমাদের প্রজন্মগুলোকে সঠিক পথ দেখানো আমাদের দায়িত্ব। অভিভাবক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের যৌথ উদ্যোগ না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকে ভালো কিছু আশা করা কঠিন হবে। আশা করি এ বিষয়ে সরকার উদ্যোগী হবে।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে