প্রতিদিন শান্তিবাগের গৃহিণী মুন্নীকে তার মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যেতে মালিবাগ মোড় পার হতে হয়। ত্রিমুখী এই মোড়ে চারদিক থেকে অটো আসছে আর যাচ্ছে। কোনো অটোর চালক দিব্যি দু-পা তুলে জোরে চালিয়ে যাচ্ছেন। যেন দ্রুততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেতে পারলেই খুশি। আবার লাইন ছেড়ে বেলাইনে এসে অন্য যানবাহনের আগে যাওয়ার জন্য অস্থির। মিনিটের পর মিনিট অপেক্ষা; সামান্য এই রাস্তা পার হতে। কিন্তু পার হতে সময় যেন আর শেষ হয় না। অবশেষে বাধ্য হয়ে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে মেয়ের বইয়ের ব্যাগ নিয়ে পার হতে হয় মুন্নীকে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কোনো পথচারী যে সহজে রাস্তা পার হবে তারও কোনো উপায় নেই। একদিকে দ্রুততার সঙ্গে চলছে অটো। আবার আরেকদিকে উল্টোপথে লাইন ধরে একের পর অটো চলেই যাচ্ছে। অর্থাৎ অটো যেন এখন রাস্তার রাজা বনে গেছে।
দৈনিক বাংলার মোড়ে একের পর এক অটো ধরার চেষ্টা ট্রাফিক পুলিশের। ধরে কখনো ট্রাকে উঠানোর চেষ্টা করে। আবার কখনো রেকারের টাকা নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। কারণ অটো আটকানোর পর শুরু হয়ে যায় তদবির। একইভাবে মালিবাগ মোড়ে অর্থাৎ সিআইডি অফিসের সামনে একই ধরনের দৃশ্য। অটো আটকানো তো দূরের কথা, রেকারের টাকা পেলেই দিব্যি অটোচালক খালাস পেয়ে যাচ্ছেন।
অর্থাৎ অটোর নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে অটোরিকশার জন্য নীতিমালা তৈরি করেছে। এই নীতিমালা কবে বাস্তবায়ন হবে বা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা এখনও অজানা রয়ে গেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, অটোর জন্যে ঢাকা শহরকে আটটি জোনে ভাগ করা হবে। এমনকি তাদের জন্যে নম্বর ও লাইসেন্স দেওয়া হবে।
এ ছাড়া প্রধান সড়কে অটো চলবে না বলে আভাস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু অটোচালকরা এখন কোনো ধরনের কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে দিব্যি বুক ফুলিয়ে প্রধান সড়কে অটো চালিয়ে যাচ্ছেন। সকাল থেকে রাত অবধি ঢাকা শহর হয়ে যায় অটোর শহর। তবে হ্যাঁ কবি শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ঢাকা শহর রিকশার শহর। তবে পায়ে চালানো রিকশা কখনো সাধারণ মানুষ কিংবা
পথচারীর মনে বিরক্তি এনে দেয়নি। কিন্তু এই অটোরিকশার প্রতি দিনে দিনে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে কেন? এর সহজ উত্তর, ওরা মানে না মানা। অর্থাৎ কারও কথায় কান দিচ্ছে না। অটোরিকশা শহর থেকে উঠে যাক কেউ চায় না। কারণ এই অটোর ওপর নির্ভর করে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান গড়ে উঠেছে। এই অটোতে এখন একদিকে যেমন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ড্রাইভার এসেছে। তেমনি এসেছে পোশাক শিল্পের অনেক শ্রমিক। এ ছাড়া খুদে ব্যবসায়ীরা এই অটোরিকশার সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করেছেন।
ঢাকা শহরে এখন ১০ লাখের বেশি অটো চলছে। তা হলে সহজে অনুমান করা যায়— কতজন এই অটোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সরকার অটো নিয়ে চিন্তাভাবন করছে সত্যি; কিন্তু অটোর ওপর সরাসরি আঘাত না দিয়ে এদের শৃঙ্খলায় আনা সম্ভব। তা হলে প্রশ্ন উঠে কীভাবে সম্ভব? প্রথমেই রাস্তার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে এদের শৃঙ্খলায় আনতে হবে।
শৃঙ্খলায় আনতে গেলে একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি তৈরি করা প্রয়োজন। আর তা হলো— দক্ষতা ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলাচলের রোডম্যাপ তৈরি করা। যারা সক্ষম ও পারদর্শী তাদের লাইসেন্স বা নম্বর দেওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। রাস্তায় চলাচলের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রথমেই যা করতে হবে তা হলো, প্রধান সড়কে দিনের বেলায় এদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রধান সড়ক চিহ্নিত করে ট্রাফিক বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া। প্রধান সড়ক বলতে যা বোঝা যায় তা হলো— মিন্টো রোড, বেইলি রোড, বাংলামোটর থেকে ফার্মগেট, ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণি, কাকরাইল থেকে আবদুল গনি রোড, হোটেল শেরাটন থেকে পান্থপথ, হাইকোর্ট থেকে শাহবাগ, শাহবাগ থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে আসাদগেট, আগারগাঁও, আজিমপুর থেকে সায়েন্স ল্যাবটেরি, মালিবাগ থেকে বাংলামোটর, মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে টিকাটুলি, শাপলা চত্বর থেকে পল্টন মোড়সহ আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়ক। তবে যারা প্রতিবন্ধী তাদের জন্য এই নিয়ম শিথিল করা যেতে পারে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রধান সড়কে অটোরিকশা চালানো বন্ধ করা হলে শহরে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারি প্রয়োজন। কারণ অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেইলি রোডে অনবরত অটো চলছে। শুধু তাই নয় ওয়ানওয়ে রাস্তা এখন কেন জানি টুওয়ে হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা উল্টোপথে অটো চালানো একেবারে বন্ধ করা প্রয়োজন। মৌচাক থেকে মগবাজার আসতে অনেক অটোচালককে ওয়্যারলেসের কাছে উল্টোপথে আসতে দেখা যায়। আর এটা যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা বয়ে আনতে পারে। একইভাবে ইস্কাটন থেকে বাংলামোটরে অনেক অটোরিকশাকে উল্টোপথে আসতে দেখা যায়। একসময় বাংলামোটরের মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের এ ব্যাপারে কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ ছিল। এখন সে নিয়ন্ত্রণ যেন শিথিল হয়ে গেছে।
অটো চালকদের জন্য প্রথমে যা প্রয়োজন তা হলো ডোপ টেস্ট করা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অটোচালকদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মাদকাসক্ত। মগবাজার ও ওয়্যারলেসে এমন এক গ্যারেজে শতাধিক অটোরিকশাচালক পাওয়া গেছে— যাদের মধ্যে বেশিরভাগই বয়সে তরুণ ও মাদকাসক্ত। অটোর মালিক বিষয়টি জেনেও তা না জানার ভান করে। এসব অটোচালকরা বেশিরভাগই রাতের বেলায় অটো চালায়। আর তাদের প্রধান রাস্তা হচ্ছে কারওয়ান বাজার। খুব ভোরে যে তরিতরকারি ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য আনা নেওয়া করে— তাদেরই টার্গেট থাকে এসব অটোচালককে। যে কারণে ডোপ টেস্টের মাধ্যমে এদের অটো চালাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বেগুনবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, গুলবাগ, মুগদাসহ আরও অনেক স্থানে অটোরিকশার গ্যারেজের ছাদ টিনের। অটোতে চার্জ দিতে গিয়ে অনেকে দুর্ঘটনার শিকার হন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন চার্জ দিতে গিয়ে তাদের জীবন হারিয়েছেন। আবার কেউ গুরুতর আহত হয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা এসব গ্যারেজে যেভাবে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয় তাদের বিদ্যুতের লাইন অনেকাংশে অবৈধ।
এখন আসা যাক রাস্তায় শৃঙ্খলা আনার বিষয়টি। অনেক রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক বক্স রয়েছে। কিন্তু অনেক ট্রাফিক পুলিশকে রাস্তা নিয়ন্ত্রণে উদাসীনতার মনোভাবে দেখা যায়। প্রথমে যে কথা দিয়ে শুরু করা হয়েছিল তা হলো রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে অনেক স্থানে অটোচালকরা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করে না। পুরান ঢাকার পিলখানা প্রথম গেটের কাছে অনেক অলিগলি রয়েছে। এসব অলিগলি পার হতে একজন পথচারীকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। কারণ একদিক থেকে যেমন জোরে অটোরিকশা আসছে। আবার অন্যদিক থেকে একই গতিতে অটোরিকশা আসছে। এপাশ ওপাশ তাকিয়েও সহজে পথচারী রাস্তা পার হতে পারেন না। এই দৃশ্য শুধু কয়েকটি স্থানের নয়। ঢাকার এমন কোনো স্থান নেই যে অটোর কারণে একজন পথচারীকে রাস্তা পারাপার হতে বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে না হয়।
অটোর এই বিশৃঙ্খলার লাগাম টেনে ধরবে কে? কয়েক দিন আগে সড়ক বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জিগ্যেস করা হয়েছিল, অটোর নিয়ন্ত্রণে কী করছেন, তিনি সাফ জবাব দিলেন, এটি সিটি করপোরেশনের কাজ। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, একজন আরেকজনের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েই খালাস। কয়েক দিন আগে ঢাকা দক্ষিণের সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম জানালেন, অটোর জন্য নীতিমালা তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু কবে নীতিমালা তৈরি হবে। আর কবে তা বাস্তবায়ন শুরু হবে। কারণ ইতিমধ্যে গুঁড়া কৃমির মতো পিলপিল করে নতুন করে জন্ম নিচ্ছে অটো। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ঢাকার বাইরে থেকে আসা অটোর নতুন চালক।
কথা ছিল অটোর কারখানাগুলো বন্ধ করা হবে। কিন্তু অটোর কারখানায় গেলে দেখে মনে হয়, তৈরি করার জন্য মহোৎসব লেগেছে। কামরাঙ্গীরচর, মুগদা, বেগুনবাড়ীতে নিত্যনতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে। আবার মুগদা স্টেডিয়ামের কাছে যেন অটোরিকশার মেলা বসে। প্রতিদিন গড়ে রেডিমেট হাজার অটোরিকশা বিক্রি হচ্ছে। অটো তৈরি কারখানার মালিকরা কর্তৃপক্ষের দিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলেছে— অটো বন্ধ করতে পারবে না; বন্ধ করলেই আন্দোলন। রাস্তা অবরোধ করা হবে। কিন্তু সরকারের উচিত দ্রুততার সঙ্গে অটোর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়া। একই সঙ্গে রাস্তায় অটোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তা না হলে অটো একদিন হতে পারে বিরোধী দলের আন্দোলনের অনুষঙ্গ। কারণ অটোতে থাবা পড়েছে কালো টাকা আর রাজনীতি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
দৈনিক সময়ের আলো
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি