আধুনিক নাগরিক জীবনে নিত্যদিনের অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়েছে টুথপেস্ট। দাঁতের সুরক্ষায় ব্যবহার করা এই পণ্য যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে সেটা খুব কম মানুষের ভাবনাতেই ছিল। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার (ইএসডিও) সাম্প্রতিক গবেষণা নাগরিকদের মধ্যে টুথপেস্ট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গবেষণায় বাজারের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বলছে, টুথপেস্টে বর্তমানে অনুমোদিত উপাদানের তালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক নেই।
গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামে উৎপাদিত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। দেশে তৈরি ২৫টি নমুনার মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে ২২টিতে। ভারতের পাঁচটি নমুনার একটিতে, থাইল্যান্ডের দুটি নমুনার একটিতে এবং ভিয়েতনামের দুটি নমুনার দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দেশে আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, টুথপেস্টের ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণের সেই কাঠামো সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না। মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে বিশ্বজুড়েই। অনেক দেশ প্রসাধনী ও অন্যান্য পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের গ্রহণযোগ্য সীমা, পরীক্ষাপদ্ধতি কিংবা বাধ্যতামূলক লেবেলিং কোনোটিই এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়। এ কারণে কোনো পণ্য নিরাপদ কি না সেটা জানার উপায় সাধারণ নাগরিকদের নেই।
ভোক্তা জরিপে অধিকাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির আশঙ্কা সম্পর্কেই জানেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়কে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ব্যবহৃত সিনথেটিক পলিমারের তথ্য দেওয়া হয়নি। যে কারণে ভোক্তারা সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান না। একই কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মিত নজরদারিও কঠিন হয়ে পড়ে। উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের কিছু টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
টুথপেস্ট থেকে মানুষের শরীর ঠিক কীভাবে, কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে, এর প্রভাব কী সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা হয়নি। কাজেই এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যায় না। তবে জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে সতর্কতামূলক নীতি গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। নাগরিকদের নিশ্চিত ক্ষতির প্রমাণের জন্য অপেক্ষা না করে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়াই শ্রেয়।
এই গবেষণার ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে আগেভাগেই দোষী সাব্যস্ত করা সংগত হবে না। গবেষণার ফল যাচাই করার সুযোগ থাকা দরকার। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ উদ্যোগে যাচাইয়ের কাজটি করতে পারে। গবেষণার ভিত্তিতে পণ্যের মান রক্ষায় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে সেটাই হবে দায়িত্বশীলতার পরিচয়। জনস্বার্থে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাও এই কাজ করতে পারে। পণ্য উৎপাদনে মান রক্ষা করা হয় কি না সেটা জানতে হবে। এ বিষয়ে পাওয়া তথ্য জনসাধারণকে জানাতে হবে।
বিএসটিআইকে দ্রুত টুথপেস্টের জাতীয় মান হালনাগাদ করতে হবে। বাজারে থাকা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট নিয়মিত পরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য টুথপেস্টে ব্যবহার করা সব উপাদানের পরিমাণ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। নাগরিকদের নিরাপদ ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
টুথপেস্টের মতো দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এই গবেষণা একটি সতর্ক সংকেত। তবে লক্ষ রাখতে হবে, এ নিয়ে যেন জনমনে আতঙ্ক তৈরি না হয়। আমরা আশা করি, এই গবেষণা মানুষকে সচেতন করবে, উৎপাদকদের পণ্যের মান রক্ষায় উদ্ধুদ্ধ করবে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি