হাওর বাঁচুক, শিক্ষাও চলুক!

মোহাম্মদ আলম ফরিদ

মতামত

একদিন ভোরে সুনামগঞ্জের হাওর আমার সঙ্গে কথা বলেছিল।আমি তখন কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিলাম। দূরে একটি নৌকা ভাসছিল, অথচ মাঝি ছিল

2026-06-19T23:42:05+00:00
2026-06-19T23:42:05+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
মতামত
হাওর বাঁচুক, শিক্ষাও চলুক!
মোহাম্মদ আলম ফরিদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ১১:৪২ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একদিন ভোরে সুনামগঞ্জের হাওর আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। আমি তখন কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিলাম। দূরে একটি নৌকা ভাসছিল, অথচ মাঝি ছিল না। পানির ওপর ভেসে উঠছিল ধানের গন্ধ, মাছের আঁশ, মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর এক অদেখা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘণ্টাধ্বনি। মনে হচ্ছিল, হাওরের বুকের ভেতরে কেউ একটি শহর লুকিয়ে রেখেছে, আর শহরের বুকের ভেতরে আটকে আছে এক বিশাল জলরাশি।

হাওর আমাকে জিজ্ঞেস করল— “তোমরা কি আমাকে জ্ঞানের শত্রু ভেবে ফেলেছ?”
আমি উত্তর দিতে পারিনি।
কারণ আমি জানতাম, প্রশ্নটি বিশ্ববিদ্যালয় হবে কি হবে না—সেটি নয়। প্রশ্নটি হলো, বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় হবে।

আজ সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস শান্তিগঞ্জে, সুনামগঞ্জ–সিলেট মহাসড়কের পাশের জলাভূমি সংলগ্ন এলাকায় চলছে। ক্লাস হচ্ছে, স্বপ্ন তৈরি হচ্ছে, তরুণেরা পথ হাঁটছে। কিন্তু অস্থায়ী আশ্রয় কি স্থায়ী ভবিষ্যৎ হয়ে উঠবে—এই প্রশ্ন এখন মানুষের মনে।

হাওর তখন বলল—
“আমার বুক দিয়ে মানুষ শত বছর ধরে যাতায়াত করেছে। কিন্তু আমার বুককে স্থায়ী দেয়াল বানানোর আগে আমার ইতিহাসটাও শোনো।”

সুনামগঞ্জের হাওর কেবল জল নয়। এটি এক জীবন্ত সভ্যতা। মাছ, ধান, পাখি, মানুষের জীবন আর অদৃশ্য অর্থনীতির দীর্ঘ স্রোত এখানে মিশে আছে। দেখার হাওর নিয়ে করা এক গবেষণায় উঠে এসেছিল—এখানে অন্তত ৮৪টি মাছের প্রজাতি পাওয়া গেছে, যেগুলো প্রায় ৩০টি ভিন্ন পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। গবেষকেরা এটিকে শুধু জলজ অঞ্চল নয়, একটি জটিল জীববৈচিত্র্যের বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

হাওর তখন নিচু স্বরে বলল—
“আমার ভেতরে শুধু জল নয়, ৮৪ রকমের স্মৃতি সাঁতার কাটে।”

আরেকটি গবেষণায় স্থানীয় জেলে, মাঠপর্যায়ের সাক্ষাৎকার ও ফোকাস গ্রুপ আলোচনার মাধ্যমে দেখানো হয়েছিল—মাছের বৈচিত্র্য কেবল পরিবেশের বিষয় নয়; এটি মানুষের আয়ের ভাষা, সংসারের হিসাব, শিশুদের ভবিষ্যৎ।

এক বৃদ্ধ জেলে নাকি বলেছিলেন—
“মাছ কমলে নদী চুপ হয় না, ঘর চুপ হয়।”

এর মধ্যে আবার সংবাদে আরেকটি তথ্য ভেসে উঠল—দেখার হাওরের ভেতরে প্রায় ১২৫ একর জমিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।

কারণ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নয়।
মানুষ প্রশ্ন করছে—স্থায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কি শহরকে বাদ দিতেই হবে?

সুনামগঞ্জ শহর তো কেবল প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়। এখানে হাসপাতাল আছে, যোগাযোগ আছে, ব্যবসা আছে, বাসস্থান আছে, মানুষের চলাচল আছে। একটি গবেষণামূলক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল—জেলা শহরভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থানীয় উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার ও আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে গভীর সম্পর্ক তৈরি করে।

সেই রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম— সুনামগঞ্জ শহর আর হাওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
শহর বলল—
“আমি ছাত্রদের প্রতিদিন গ্রহণ করতে পারি।”
হাওর বলল—
“আমি তাদের গবেষণা শেখাতে পারি।”
শহর বলল—
“আমার আছে লাইব্রেরি, ছাত্রাবাস, সংস্কৃতি, প্রতিদিনের জীবন।”
হাওর বলল—
“আমার আছে মাঠ, জল, বাস্তবতা, প্রকৃতির পাঠশালা।”

আমি দেখলাম দুজনের মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়িয়ে আছে—অস্থায়ী পোশাক পরে।
বিশ্ববিদ্যালয় তখন বলল—
“আমাকে একজনকে বেছে নিতে বলো না।”

বিশ্ববিদ্যালয় মানে কেবল জমির পরিমাণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মানে প্রবাহ। ছাত্রদের শুধু ক্লাস নয়—হাসপাতাল, বইয়ের দোকান, চাকরির প্রস্তুতি, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, গবেষণা নেটওয়ার্ক, সাংস্কৃতিক জীবনও লাগে।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে করা আরেকটি গবেষণায় স্থানীয় মানুষদের বক্তব্য উঠে এসেছিল—পানির স্বাভাবিক ছন্দ বদলে গেলে মাছের বৈচিত্র্য ও প্রজননচক্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হাওর তখন ফিসফিস করে বলল—
“আমি ভাঙি, আবার গড়ি। কিন্তু আমাকে স্থির করে ফেলো না।”

একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়ও এমন এক সতর্কতা উচ্চারণ করেছিল—বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য জলাভূমি ভরাটকে উন্নয়নের একমাত্র ভাষা ভাবা উচিত নয়; বিকল্প স্থান নির্বাচনও উন্নয়নের অংশ।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বক্তব্য এল—যদি হাওর অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণ হয়ও, তবে তা হতে হবে ‘হাওর-বান্ধব’; স্থান নির্বাচন, নকশা ও পরিকল্পনায় পরিবেশ ও মানুষের জীবিকার প্রশ্ন বিবেচনায় নিতে হবে।

আর পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩ যেন দূর থেকে একই কথা বলল—উন্নয়ন যদি হয়, তবে তার আগে প্রকৃতির ভাষাও পড়তে হবে।

ভোরে আবার হাওরের কাছে গেলাম।
সে শান্ত।
আমি জিজ্ঞেস করলাম—
“তুমি কি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে চাও না?”
হাওর হাসল।
বলল—
“আমি বিশ্ববিদ্যালয় চাই। কিন্তু আমার বুকের ওপর নয়—আমার দিকে মুখ করে।”

আমি ফিরে এলাম।
শহরের দিকে তাকিয়ে মনে হলো—
স্থায়ী ক্যাম্পাস হোক সুনামগঞ্জ শহরে। শহর হয়ে উঠুক জ্ঞানের কেন্দ্র, আর হাওর হয়ে উঠুক গবেষণার উন্মুক্ত পাঠশালা। ছাত্ররা শহর থেকে বের হবে, গবেষণার জন্য হাওরে যাবে, আবার সন্ধ্যায় ফিরে এসে আলো জ্বালাবে গ্রন্থাগারে।

তখন আর শহর ও হাওর একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না।

তারা হয়ে উঠবে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইটি শ্বাস।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী 

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   হাওর 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: