বাংলাদেশে পথশিশুদের জীবন নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ট্রাফিক সিগন্যালে ফুল বিক্রি করা কোনো শিশু, রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঘুমিয়ে থাকা কোনো কিশোর, অথবা শহরের ব্যস্ত ফুটপাতে দিন কাটানো অসহায় কিছু মুখ। কিন্তু এই দৃশ্যমান বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও ভয়াবহ একটি সংকট- মাদকাসক্তি। পথশিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আজ বিভিন্ন ধরনের মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, যা তাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটি কেবল শিশু সুরক্ষার প্রশ্ন নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, মানবাধিকার এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বহুমাত্রিক সমস্যা।
বাংলাদেশে পথশিশুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হলেও বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে দেখা যায়, দেশের কয়েক মিলিয়ন শিশু কোনো না কোনোভাবে রাস্তা-নির্ভর জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও অন্যান্য বড় শহরে এদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। এদের একটি অংশ পুরোপুরি রাস্তায় বসবাস করে, যাদের কোনো স্থায়ী বাসস্থান নেই। আরেকটি অংশ দিনের বেলা রাস্তায় কাজ করে এবং রাতে বস্তি বা অস্থায়ী আবাসে ফিরে যায়। তারা ভিক্ষাবৃত্তি, হকারি, কুলি, রিকশা গ্যারেজে সহকারী, গাড়ি পরিষ্কার, বর্জ্য সংগ্রহ কিংবা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত থাকে।
পথশিশুদের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অনিশ্চয়তা। তারা প্রতিদিন জানে না কোথায় খাবার পাবে, কোথায় ঘুমাবে কিংবা পরদিন কীভাবে বেঁচে থাকবে। এই অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেয় ভয়, হতাশা ও মানসিক চাপ। শিশু মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। মাদক তখন তাদের কাছে বাস্তবতা থেকে সাময়িক মুক্তির একটি উপায় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে পথশিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত আঠা বা গ্লু, যা স্থানীয়ভাবে “ড্যান্ডি” নামে পরিচিত। একটি পলিথিনের মধ্যে আঠা নিয়ে তা নাক দিয়ে টানার মাধ্যমে শিশুরা কয়েক ঘণ্টার জন্য এক ধরনের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, এই আঠার মধ্যে থাকা টলুইনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এছাড়া গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, ঘুমের ওষুধ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যও পথশিশুদের মধ্যে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়াবার সহজলভ্যতা কিছু অঞ্চলে পথশিশুদের মধ্যেও এর বিস্তার ঘটিয়েছে।
মাদকাসক্তির পেছনে শুধু দারিদ্র্য নয়, আরও নানা কারণ কাজ করে। পারিবারিক সহিংসতা, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, সৎ বাবা-মায়ের নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, শিশুশ্রম, সামাজিক অবহেলা এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব এদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক শিশু পরিবার থেকে পালিয়ে রাস্তায় আসে। প্রথমদিকে তারা ভয় ও একাকীত্বে ভোগে। পরে বড় বয়সী পথশিশু বা অপরাধী গোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। টিকে থাকার জন্য তারা ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায় এবং ধীরে ধীরে মাদক গ্রহণ শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাদক গ্রহণে বাধ্য করা হয়, যাতে তাদের ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সহজ হয়।
ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট, গাবতলী, সায়েদাবাদ, টঙ্গী, চট্টগ্রাম রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক পথশিশু নিয়মিত মাদক ব্যবহার করে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু প্রতিদিন অন্তত একবার নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে। কারণ হিসেবে তারা ক্ষুধা কম অনুভব করা, শীত ভুলে থাকা, দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকা এবং বন্ধুদের প্রভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করেছে।
মাদকাসক্তির ফলে শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্য ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন আঠা শোঁকার ফলে মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস হতে শুরু করে। স্মৃতিশক্তি কমে যায়, শেখার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের সমস্যা, যকৃত ও কিডনির ক্ষতি, হৃদরোগ এবং স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। অপুষ্টির সঙ্গে মাদকাসক্তি যুক্ত হলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যগত প্রভাব আরও গভীর। মাদকাসক্ত শিশুদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যাপ্রবণতা, হিংস্র আচরণ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বেশি দেখা যায়। অনেকেই বাস্তবতা ও কল্পনার পার্থক্য করতে পারে না। দীর্ঘদিন নেশার কারণে ব্যক্তিত্ব বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মাদকাসক্ত পথশিশুরা অপরাধচক্রের সহজ শিকারে পরিণত হয়। তাদের দিয়ে চুরি, ছিনতাই, মাদক পরিবহন, চাঁদাবাজি কিংবা অন্যান্য বেআইনি কাজ করানো হয়। অনেক শিশু মানবপাচার ও যৌন শোষণের ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে মাদকাসক্তি শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে না; এটি সমাজে অপরাধ ও সহিংসতার পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ সরকার শিশু অধিকার সুরক্ষা এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। সমাজসেবা অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা পথশিশুদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণগুলো দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, শিশুশ্রম, নগরায়ণের চাপ এবং সামাজিক বৈষম্য দূর না করা গেলে কেবল পুনর্বাসন কর্মসূচি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া কঠিন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল। পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, বিনামূল্যে শিক্ষা, পুষ্টি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, শিশুশ্রম হ্রাস, নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। স্কুল, পরিবার, স্থানীয় সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
পথশিশুরা সমাজের প্রান্তিক কোনো জনগোষ্ঠী নয়; তারা বাংলাদেশেরই সন্তান। তাদের হাতে বইয়ের পরিবর্তে যদি মাদকের প্যাকেট উঠে যায়, তবে তা শুধু একটি শিশুর নয়, একটি জাতির ভবিষ্যতের পরাজয়। তাই পথশিশুদের মাদকাসক্তির বিষয়টিকে দয়া বা দান-খয়রাতের দৃষ্টিতে নয়, বরং মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি শিশুকে মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন ফিরিয়ে দিতে পারলে কেবল তার জীবনই বদলাবে না, বদলাবে পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ।
লেখক ও কলামিস্ট
সময়ের আলো/জেডআই