রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও আদর্শিক প্রশিক্ষণ সুস্থ গণতন্ত্রের ভিত্তি

মোহাম্মদ আরিফ ইমাম

মতামত

গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি কেবল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু শত্রুতা থাকবে

2026-08-10T04:49:57+00:00
2026-08-10T04:49:57+00:00
 
  সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
মতামত
রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও আদর্শিক প্রশিক্ষণ সুস্থ গণতন্ত্রের ভিত্তি
মোহাম্মদ আরিফ ইমাম
প্রকাশ: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৯ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি কেবল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু শত্রুতা থাকবে না; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু অশালীনতা থাকবে না; ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ কখনোই বিসর্জিত হবে না। একটি রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান নির্ধারিত হয় সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষা, আচরণ, নৈতিকতা এবং আদর্শিক দৃঢ়তার মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মৌলিক মূল্যবোধগুলো দিন দিন দুর্বল হতে দেখা যাচ্ছে।

রাজনীতি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার বিজ্ঞান এবং জনগণের সেবা করার শিল্প। অথচ আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতি যেন প্রতিপক্ষকে অপমান করার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। সংসদ, জনসভা, টেলিভিশনের টকশো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা এবং কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য এখন প্রায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক পরিবেশকেই দূষিত করছে না বরং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনা ও সামাজিক মূল্যবোধকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি কেবল তার জনসমর্থনের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার আদর্শিক ভিত্তি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের নৈতিকতা এবং কর্মীদের রাজনৈতিক শিক্ষার ওপর। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার নেতৃত্বের বৈধতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছিলেন। একইভাবে রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মানের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এসব তত্ত্ব আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে তার সমর্থকরা একজন শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংগঠনমুখী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তার বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য, ‘I will make politics difficult for the politicians’ রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এর তাৎপর্য ছিল, রাজনীতি যেন ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের সহজ মাধ্যম না হয়ে ওঠে; বরং তা হোক জবাবদিহি, আত্মত্যাগ, সততা এবং জনকল্যাণের কঠিন অঙ্গীকার।

বিএনপির সাংগঠনিক ইতিহাসে এ. কে. এ. ফিরোজ নুনের নাম রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের প্রসঙ্গে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। দলীয় সূত্র ও স্মৃতিচারণায় তাকে আদর্শিক ও আচরণগত প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ সব বিবরণ বিএনপির রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও, নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ দলিলভিত্তিক মূল্যায়ন গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তবে একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ খুবই কম : সুস্থ রাজনীতির জন্য প্রশিক্ষিত, সংযত ও নৈতিক নেতৃত্ব অপরিহার্য।

বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দল তাদের সদস্যদের জন্য নিয়মিত রাজনৈতিক শিক্ষা ও নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করে। সেখানে সংবিধান, আইনের শাসন, মানবাধিকার, সংসদীয় রীতি, গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রদান, নৈতিক নেতৃত্ব, সংঘাত নিরসন এবং জনসম্পৃক্ততার মতো বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে শেখানো হয়। ফলে মতবিরোধ থাকলেও রাজনৈতিক ভাষা সাধারণত শালীন ও প্রাতিষ্ঠানিক থাকে।

বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে বাধ্যতামূলক আদর্শিক প্রশিক্ষণ চালু করার। এই প্রশিক্ষণ কেবল দলীয় মতাদর্শ শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং সংবিধানের মৌলিক নীতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবিক মর্যাদা, রাজনৈতিক সহনশীলতা, দুর্নীতিবিরোধী নৈতিকতা, জনসেবার দর্শন এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের শিষ্টাচারকে এর অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে রাজনৈতিক অশালীনতা অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে নেতৃত্বের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আচরণ এবং প্রতিটি প্রতিক্রিয়া কর্মীদের জন্য একটি অনুকরণীয় মানদণ্ডে পরিণত হয়। নেতৃত্ব যদি শালীন হয়, কর্মীরাও শালীন হবে; নেতৃত্ব যদি বিদ্বেষ ছড়ায়, সেই বিদ্বেষ সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়বে।

গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য হলো ভিন্নমতের সহাবস্থান। তাই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়; ব্যক্তিগত অপমান দিয়ে নয়। কারণ অশালীন ভাষা সাময়িক করতালি আনতে পারে, কিন্তু তা কখনো স্থায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে পারে না।

বাংলাদেশের সংবিধান জনগণের মর্যাদা, আইনের শাসন, গণতন্ত্র, সাম্য ও ন্যায়বিচারের আদর্শকে ধারণ করে। ফলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নৈতিক দায়িত্ব হলো এমন নেতৃত্ব গড়ে তোলা, যারা সংবিধানের চেতনার সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক আচরণকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখবে। রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ সেই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।

তরুণ প্রজন্ম আজ রাজনীতিকে যেভাবে দেখছে, আগামী দিনের বাংলাদেশও অনেকাংশে সেভাবেই গড়ে উঠবে। তারা যদি দেখে রাজনীতি মানেই বিদ্বেষ, অপমান ও সংঘাত, তবে ভবিষ্যতের রাজনীতিও একই পথে এগোবে। কিন্তু তারা যদি দেখে রাজনীতি মানে আদর্শ, শৃঙ্খলা, যুক্তি, নৈতিকতা এবং জনসেবা, তবে দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে।

আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন। প্রয়োজন দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি জাতীয় দায়বদ্ধতার চর্চা। প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা নিজেদের আচরণ দিয়ে কর্মীদের শিক্ষা দেবেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গেও ন্যূনতম সৌজন্য বজায় রাখবেন।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও পরিণত ও স্থিতিশীল করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেই আদর্শিক শিক্ষা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং আচরণগত প্রশিক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান; বিদ্বেষ নয়, যুক্তি; প্রতিহিংসা নয়, সহনশীলতা; ক্ষমতা নয়, জনকল্যাণকে রাজনীতির মূল দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই একটি সভ্য, দায়িত্বশীল ও টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণ সম্ভব হবে। সেই পথেই নিহিত রয়েছে একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।


লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, বেলচোঁ কারিমাবাদ ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর

মতামত লেখকের নিজস্ব



সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে


  বিষয়:   রাজনৈতিক  শিষ্টাচার  গণতন্ত্র  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: