ফিকে হচ্ছে সহিংসতামুক্ত ক্যাম্পাসের স্বপ্ন

মো. শাহিন আলম

মতামত

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল এক স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটায়নি; বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, রাজনৈতিকসংস্কৃতি এবং সামগ্রিক নাগরিক সচেতনতায় তা এক নতুন সমীকরণও

2026-08-09T06:31:33+00:00
2026-08-09T06:31:33+00:00
 
  রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
মতামত
ফিকে হচ্ছে সহিংসতামুক্ত ক্যাম্পাসের স্বপ্ন
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৩১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল এক স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটায়নি; বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, রাজনৈতিক 
সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক নাগরিক সচেতনতায় তা এক নতুন সমীকরণও তৈরি করেছিল। সেই অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলো। বৈষম্যহীন, ভয়হীন, দখলদারিত্বমুক্ত এবং সহনশীল এক রাজনৈতিক পরিবেশের স্বপ্ন দেখেছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল এক স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটায়নি; বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক নাগরিক সচেতনতায় তা এক নতুন সমীকরণও তৈরি করেছিল। সেই অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলো। 

বৈষম্যহীন, ভয়হীন, দখলদারিত্বমুক্ত এবং সহনশীল এক রাজনৈতিক পরিবেশের স্বপ্ন দেখেছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কিন্তু অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাঙ্গনে সাম্প্রতিক যে সংঘাত, দখলদারিত্বের প্রতিযোগিতা ও আধিপত্য বিস্তারের রেষারেষি দেখা যাচ্ছে, তা কেবল শিক্ষার পরিবেশকেই ব্যাহত করছে না, বরং রক্তার্জিত জুলাই চেতনার সঙ্গে তা এক স্পষ্ট আমানতদারিতার লঙ্ঘন এবং চরম বিশ্বাসঘাতকতাও বটে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতির একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ভূমিকা আছে। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির চালিকাশক্তি ছিল এই ছাত্রসমাজ। কিন্তু নব্বই-উত্তরকালে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বিস্তার ঘটে এবং বিগত সাড়ে পনেরো বছরে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র দখলদারিত্ব, গেস্টরুম কালচার, টর্চার সেল, সিট বাণিজ্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন দেশের ছাত্র রাজনীতিকে এক চরম কলঙ্কিত ও চরমপন্থি পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভেবেছিল, সেই বিষাক্ত সংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটবে।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ছাত্রলীগের শূন্যস্থান দখলের এক অলিখিত মহোৎসব ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আর তার সবচেয়ে নগ্ন প্রকাশ দেখা গেল জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীকে ঘিরেই। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে একের পর এক ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা মুখোমুখি হয়েছে সংঘর্ষে। এসব ঘটনায় ছাত্রনেতা, সাংবাদিক, এমনকি প্রতিষ্ঠান প্রধান পর্যন্ত আহত বা লাঞ্ছিত হয়েছেন। স্পষ্টতই, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পূর্ববর্তী ছাত্রলীগের মতোই ক্ষমতা চর্চার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর একটা প্রবণতা কাজ করছে এখানে। 

জামায়াত ও বিএনপির সঙ্গে যুক্ত এই ছাত্র সংগঠনগুলো পড়াশোনা কিংবা শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস-জীবনের মান উন্নয়নে বিন্দুমাত্র আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না; বরং তারা মত্ত আছে কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে সেই দখলদারিত্বের লড়াইয়ে। অথচ জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা- যারা একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চা করত এবং পথের কাঁটা মনে হওয়া যেকোনো শিক্ষার্থীকে আতঙ্কিত করত। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিবির ও ছাত্রদল কি সত্যিই কিছু শেখেনি?

এই প্রশ্নের উত্তর যা-ই হোক, বিএনপি ও জামায়াতের জন্য বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক বা দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতার এক বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ এবং এই জেনারেশন জি বা তরুণ ভোটাররা আর আগের মতো কোনো দলের আদর্শিক বা পারিবারিক পরিচয়ে চালিত হয় না। তারা বিচার করে পেশাদারিত্ব, সুশাসন, সহনশীলতা ও আইনের শাসন দিয়ে। ক্যাম্পাসে সহিংসতা কিংবা লেজুড়বৃত্তিক পেশিশক্তির রাজনীতি এই প্রজন্মের কাছে চরমভাবে ঘৃণিত। ফলে তরুণ নেতৃত্বকে সংস্কার করতে ব্যর্থ হলে দুই দলই দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই ভোটব্যাংক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

জুলাই চেতনার মূল কথাই ছিল সংস্কার ও দায়বদ্ধতা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ভিত্তি ছিল তোষণমূলক ক্ষমতাচর্চা এবং একক দখলদারিত্বের অবসান ঘটানো। দেশের মানুষ কিংবা শিক্ষার্থীরা নতুন কোনো ছাত্রলীগ সংস্কৃতির উত্থান মেনে নেবে না। ছাত্রদল বা ছাত্রশিবির যদি ভেবে থাকে যে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সুযোগে হলের নিয়ন্ত্রণ বা ক্যাম্পাসের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেবে, তবে তারা একটি ঐতিহাসিক ভুল করছে। জনগণের চোখে বিগত শাসনামলের ছাত্রলীগের নিপীড়নের সঙ্গে আজকের যেকোনো সহিংস আচরণ খুব দ্রুতই সমার্থক হয়ে ওঠে। 

আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মূল রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মকাণ্ডের দায় এড়াতে পারে না। বিএনপি ও জামায়াত যদি জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে তার প্রথম ও সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ মিলবে তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর আচরণেই। যে দল নিজের অঙ্গসংগঠনকে সংযত রাখতে পারে না, তারা জাতীয় পর্যায়ে সুশাসন কীভাবে নিশ্চিত করবে- এই প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত যৌক্তিক।

উভয় ছাত্র সংগঠনের কর্মীরাই তাদের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য এককভাবে দায়ী হলেও মূল রাজনৈতিক দলগুলো এই দায় এড়াতে পারে না। জামায়াত ও বিএনপি উভয় দলকেই তাদের ছাত্র সংগঠনের লাগাম টেনে ধরতে হবে এবং স্পষ্ট জানিয়ে দিতে হবে যে সহিংসতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না, আর তা কেবল মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিএনপি ক্ষমতাসীন দল হিসেবে ক্যাম্পাসে শান্তি বজায় রাখতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। জামায়াতকেও নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা উসকানিমূলক কাজ থেকে বিরত থাকে, যেমন মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করে এমন ব্যানার প্রদর্শন কিংবা ছাত্রলীগ খোঁজার নামে হয়রানিমূলক অভিযান চালানো যার মধ্যে পড়ে।

বাস্তবে করণীয়ও একেবারে অস্পষ্ট নয়। হল দখল, চাঁদাবাজি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন বা সহিংসতায় জড়ানো কোনো ছাত্রনেতা বা কর্মীকে কেবল দলীয় পদ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে দায়িত্ব শেষ করলেই চলবে না, বরং তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মূল দলকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে, জিরো টলারেন্স নীতিতে। হল পরিচালনার দায়িত্ব থাকা উচিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হাতে, কোনো রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের হাতে নয়। লেজুড়বৃত্তি ও হল দখলের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এই নীতি উভয় দলকে তাদের ছাত্র ফ্রন্টগুলোর ওপর কঠোরভাবে চাপিয়ে দিতে হবে।

প্রথাগত পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতির বদলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরকে বুদ্ধিভিত্তিক, পরিবেশমুখী, একাডেমিক সহায়তামূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডভিত্তিক রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে স্থানীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে- অভ্যুত্থানের অর্জন কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়, কোটেশন ও ক্ষমতার রাজনীতি এখানে চলবে না।

এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর ভূমিকাও পরীক্ষার মুখে। আওয়ামী লীগ আমলের মতো নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করা বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোকে পরিস্থিতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। সহিংসতায় অংশগ্রহণকারী সবার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রত্যাশিত, যাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভয় ও আতঙ্কমুক্ত পরিবেশে আবার তাদের ক্যাম্পাসে ফিরে আসতে পারে।

জুলাইয়ের অভ্যুত্থান কোনো নতুন নিপীড়ক বা দখলদারগোষ্ঠী তৈরি করার জন্য হয়নি। শত শত শহিদের রক্ত এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থীর অঙ্গহানির মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, তা রক্ষা করার প্রাথমিক দায় দেশের প্রধান দলগুলোরই। বিএনপি ও জামায়াতকে বুঝতে হবে, তাদের ছাত্রসংগঠনগুলোর বর্তমান আচরণই তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে যাচ্ছে। এখনই তাদের ছাত্র ফ্রন্টগুলোর লাগাম টেনে না ধরলে, সুস্থ, মুক্ত ও গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে না পারলে ইতিহাস এই ব্যর্থতাকে জুলাই চেতনার সঙ্গে এক অন্যায় বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেই চিহ্নিত করবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   ফিকে  সহিংসতামুক্ত  ক্যাম্পাস  স্বপ্ন  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: