বাংলাদেশের শিক্ষা অঙ্গনে এসএসসি পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই পরীক্ষার ফলাফল কেবল একজন শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষাজীবনের দিকনির্দেশনা দেয় না, বরং একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক স্বাস্থ্যও প্রকাশ করে। সাম্প্রতিক এসএসসি ফলাফলে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার সংবাদ জাতিকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী— মোট পরীক্ষার্থী: ১৮,৫৭,৩৪৪ জন। গড় পাসের হার: ৬২.২৫ শতাংশ। জিপিএ–৫ পেয়েছে: ১,১৬,৬৭৬ জন। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি, অর্থাৎ প্রায় সাত লাখ। এটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে হাজারো স্বপ্নভঙ্গ, পারিবারিক হতাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন জাগে—এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার দায় কার?
প্রথমেই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই শিক্ষা ব্যবস্থার। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক পাঠদান এবং সৃজনশীল দক্ষতার ঘাটতি বিদ্যমান। পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানে বৈষম্য, শিক্ষক সংকট, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং শিক্ষাসামগ্রীর সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশকে দুর্বল করে দেয়। যখন একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রকৃত শিক্ষার বদলে কেবল পরীক্ষার কৌশল শেখে, তখন ফলাফলের বিপর্যয় অস্বাভাবিক নয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক সমাজের দায়িত্বও কম নয়। শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক। অনেক শিক্ষক আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলেও কোথাও কোথাও ক্লাসে অনিয়মিত উপস্থিতি, প্রাইভেট নির্ভরতা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগের অভাব এবং মূল্যায়নে দায়িত্বহীনতা দেখা যায়। একটি শ্রেণিকক্ষে যদি পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে আলাদা সহায়তা না দেওয়া হয়, তবে তারা ধীরে ধীরে শিক্ষার মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, পরিবারকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। বর্তমান সমাজে অনেক অভিভাবক সন্তানের ফলাফল নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও শেখার প্রক্রিয়া নিয়ে ততটা সচেতন নন। কেউ অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন, আবার কেউ সম্পূর্ণ উদাসীন থাকেন। সন্তানের পড়াশোনার পরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য, সময় ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে পরিবারের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। কেবল ভালো ফলের প্রত্যাশা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের নিজস্ব দায়ও অস্বীকার করা যায় না। নিয়মিত অধ্যয়ন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ এবং অধ্যবসায় ছাড়া সাফল্য সম্ভব নয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল বিনোদনের অতিরিক্ত আকর্ষণ অনেক শিক্ষার্থীর মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করছে। তবে এটিও সত্য যে কিশোর বয়সের শিক্ষার্থীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব বড়দেরই বেশি।
এখানে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, বিদ্যালয়ভিত্তিক মানোন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, নিয়মিত তদারকি এবং দুর্বল অঞ্চলের জন্য বিশেষ কর্মসূচি ছাড়া স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। ফলাফল প্রকাশের পর কেবল পাসের হার নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; কেন এত শিক্ষার্থী ফেল করল তার গভীর বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা বোর্ড, জেলা ও বিদ্যালয়ভিত্তিক কারণ অনুসন্ধান জরুরি।
সাত লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়; এটি একটি সমষ্টিগত সংকট। দায় আছে শিক্ষা নীতির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, শিক্ষকের, অভিভাবকের, শিক্ষার্থীর এবং রাষ্ট্রের। কিন্তু দায় নির্ধারণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সমাধানের পথ খোঁজা। আমাদের এমন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে শিক্ষার্থী ভয় নয়, আগ্রহ নিয়ে শিখবে; মুখস্থ নয়, বুঝে পড়বে; প্রতিযোগিতা নয়, দক্ষতা অর্জন করবে।
আজ যারা ফেল করেছে তারা দেশের বোঝা নয়; তারা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অসম্পূর্ণতার প্রতিচ্ছবি। তাদের ব্যর্থতাকে কলঙ্ক না ভেবে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সময় থাকতে যদি আমরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে মানবিক, দক্ষতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, দায় স্বীকার এবং কার্যকর সংস্কার। শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ রক্ষাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
লেখক ও কলামিস্ট
সময়ের আলো/কেআই