আশুরার পবিত্রতা রক্ষায় বর্জনীয় ও গ্রহণীয় দিক

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মতামত

মহিমান্বিত হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি বিভিন্ন কারণে অত্যন্ত তাৎপর্য ও মর্যাদাপূর্ণ। বিশেষ করে এই মাসের

2026-06-26T05:02:39+00:00
2026-06-26T05:02:39+00:00
 
  শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬,
১২ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
মতামত
আশুরার পবিত্রতা রক্ষায় বর্জনীয় ও গ্রহণীয় দিক
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ৫:০২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মহিমান্বিত হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি বিভিন্ন কারণে অত্যন্ত তাৎপর্য ও মর্যাদাপূর্ণ। বিশেষ করে এই মাসের দশম দিনটি আশুরা হিসেবে মুসলিম উম্মাহর কাছে এক অনন্য ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে উপস্থিত হয়। ২০২৬ সালের ২৬ জুন বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায় পরম শ্রদ্ধায় পালন করতে যাচ্ছে এই পবিত্র দিনটি। আশুরা কেবল একটি বিশেষ দিন বা তিথি নয়, এটি মূলত অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক এবং আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ।

ইসলামের এই সুন্দর ও পবিত্র ইবাদতগুলোর বিপরীতে দুঃখজনকভাবে আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন অনৈসলামিক আচার-অনুষ্ঠান ও কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ইসলামের মূল আকিদা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন সব কর্মকাণ্ড পবিত্র আশুরার মূল চেতনাকে ম
øান করে দেয়। দ্বীনের ভেতর নতুন কোনো প্রথা তৈরি করা বা মনগড়া নিয়মকানুন প্রবর্তন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই আশুরার পবিত্রতা রক্ষার্থে সব ধরনের কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন প্রথা থেকে সমাজকে মুক্ত রাখা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব।

আশুরাকে কেন্দ্র করে শরিয়তবিরোধী বিভিন্ন বেদাত ও কুরআন-হাদিসবিরোধী কাজ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে ইসলামের নামে এমন সব কাজ করা হচ্ছে যার কোনো ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহর কোথাও নেই। মনগড়া ইবাদত বা পদ্ধতি ইসলামের সৌন্দর্যকে বিনষ্ট করে।

আশুরা উদযাপনের নামে বর্তমানে রাস্তাঘাটে যে ধরনের উশৃঙ্খলতা ও শোরগোল দেখা যায়, তা ইসলামের শান্তিপূর্ণ স্বভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ কখনোই অন্যের কষ্টের কারণ হওয়া উচিত নয়। উচ্চস্বরে আওয়াজ করা, ট্রাফিক আইন অমান্য করে মিছিল করা বা জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা কবিরা গুনাহের শামিল। ইসলাম সবসময় শান্তি, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দেয়; তাই উচ্ছৃঙ্খলতা পরিহার করে পরম শান্তিতে এই দিনটি অতিবাহিত করাই বাঞ্ছনীয়।

শোক প্রকাশের নামে তথাকথিত তাজিয়া মিছিল বের করা এবং কৃত্রিম কারবালা তৈরি করা একটি বর্জনীয় প্রথা। ইসলামে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর এভাবে প্রতীকী কবর বা তাজিয়া তৈরি করে প্রদর্শন করার কোনো বিধান নেই। এটি মূলত এক ধরনের অন্ধ অনুকরণ যা ইসলামের তাওহিদি বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারবালার শোক আমাদের অন্তরের গভীরের বিষয়, তা বাহ্যিক কোনো প্রদর্শনী বা কৃত্রিম কাঠামোর মাধ্যমে প্রকাশ করার বস্তু নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো মুসলমানের মৃত্যুর পর উচ্চস্বরে বিলাপ ও মাতম করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। বুক চাপড়ানো, জামা-কাপড় ছেঁড়া এবং উচ্চস্বরে চিৎকার করে কান্নাকাটি করা জাহেলি যুগের অন্ধকার সংস্কৃতি। ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাত আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমরা ইসলামের নিষিদ্ধ মাতম সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হব। হৃদয়ের কান্না ও নীরব দোয়ার মাধ্যমেই কেবল সেই মহান শহিদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব।

মাতমের নামে নিজের শরীরকে রক্তাক্ত করা এবং চাবুক বা তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে দেহক্ষতি করা সম্পূর্ণ হারাম। ইসলাম মানবদেহকে আল্লাহর আমানত হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং নিজের শরীরের ক্ষতি করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। রক্তপাত ঘটিয়ে বা নিজেকে কষ্ট দিয়ে কোনো সওয়াব অর্জন করা যায় না, বরং এটি এক ধরনের চরম অজ্ঞতা।

এই ধরনের আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড ইসলামকে বহির্বিশ্বে একটি সহিংস ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
আশুরার দিনটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিভিন্ন মনগড়া আচার-অনুষ্ঠান ও মেলা উৎসবের কোনো স্থান ইসলামে নেই। অনেক স্থানে এই দিনে বিশেষ আনন্দ উৎসব বা ঢোল-তবলা বাজিয়ে মিছিল করা হয়, যা এই দিনের ভাবগাম্ভীর্যকে নষ্ট করে। আশুরা আনন্দের দিন নয়, আবার এটি কেবলই কান্নাকাটিরও দিন নয়; এটি মূলত ইবাদত ও আত্মোপলব্ধির দিন। তাই সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা বর্জন করে নীরব ইবাদতের পরিবেশ বজায় রাখা আবশ্যক।

এই দিনে আলোকসজ্জা, তোরণ নির্মাণ এবং অপচয়মূলক উৎসবের কারণে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য অপচয় হতে দেখা যায়। ইসলামে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, বিশেষ করে যখন দেশের বহু মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করে। ধর্মীয় পুণ্য অর্জনের নামে বিপুল অর্থের অপচয় করা এবং বিলাসী ভোজের আয়োজন করা সম্পূর্ণ অনুচিত। উৎসবের জৌলুস পরিহার করে সেই অর্থ দিয়ে দরিদ্র মানুষের অন্নসংস্থান করা অনেক বেশি সওয়াব ও যুক্তিসংগত।

সমাজের শান্তি ও স্থিতি বজায় রাখার জন্য আশুরার দিন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা অপরিহার্য। আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড যেন অন্য কোনো গোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার মাধ্যমে একটি সুন্দর ও সম্প্রীতিময় সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, আশুরার দিনটি সৃষ্টির শুরু থেকেই বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী। এই দিনে মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এই দিনেই মানব ইতিহাসের দিক পরিবর্তনকারী বহু ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। হজরত আদম (আ.) এর তওবা কবুল হওয়া থেকে শুরু করে হজরত নুহ (আ.)-এর কিশতি প্লাবন থেকে রক্ষা পাওয়া এবং হজরত মুসা (আ.) এর অত্যাচারী ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো কালজয়ী ঘটনাগুলো এই দিনটিকে করেছে অনন্য। তবে পরবর্তী সময়ে হিজরি ৬১ সনে কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সপরিবারে শাহাদাতবরণ এদিনের তাৎপর্যকে এক গভীর বেদনাবিধূর ও ত্যাগের মহিমায় রূপান্তর করেছে।

ইসলামের চিরন্তন শিক্ষার আলোকে এই পবিত্র দিনের মহিমাকে অক্ষুণ্ন রাখতে হলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রিয় নবী (সা.)-এর সুন্নতকে কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। আশুরার দিনটিতে অতিরিক্ত নফল ইবাদতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করাই মুমিনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এদিনে রোজা রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী আম্বিয়া কেরামদের আমল থেকেও প্রমাণিত। এই সুন্নাহর যথাযথ অনুবর্তী হওয়াই আশুরার দিনটিকে উদযাপনের সর্বোত্তম মাধ্যম।

কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি এবং পূর্ববর্তী নবীদের বিজয়ের ইতিহাস স্মরণ করা আশুরার অন্যতম একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সেই মহান আত্মত্যাগ আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন হওয়ার প্রেরণা জোগায়। ইতিহাস কেবল অতীতকে চর্চা করার জন্য নয়, বরং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান জীবনকে সুন্দর ও সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য। কারবালার প্রান্তরের সেই অসম যুদ্ধ আমাদের শেখায় যে, সত্যের পথ যতই কঠিন হোক না কেন, চূড়ান্ত বিজয় সর্বদা সত্যেরই হয়।

ইতিহাসের সেই মহান অধ্যায়গুলো থেকে আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে ধৈর্য ধারণের গভীর শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। বিপদে ধৈর্য হারানো মুমিনের কাজ নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পথে যেকোনো পরিস্থিতিকে দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করাই ইসলামের শিক্ষা। কারবালার রক্তক্ষয়ী প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.) যে চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। নিজের জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং ধৈর্য ধারণ করাই আশুরার প্রকৃত দীক্ষা।

নিঃস্ব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দান-সদকা প্রদান করার মাধ্যমে আশুরার চেতনাকে বাস্তব রূপ দেওয়া যায়। নিজের সামর্থ্যানুযায়ী দরিদ্রদের অন্ন ও বস্ত্র দিয়ে সাহায্য করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক মানবিক শিক্ষা। আশুরার দিন পরিবারের সদস্যদের ভালো খাবারের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়া এবং অভাবীদের মাঝে দান করা আল্লাহর রহমত আকর্ষণের একটি বড় মাধ্যম। দান-সদকা মানুষের ধন-সম্পদকে পবিত্র করে এবং আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে।

সর্বোপরি পুরো মহররম মাসজুড়ে এবং বিশেষ করে আশুরার দিনে সার্বিক পবিত্রতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোশাক-পরিচ্ছদ, বাসস্থান এবং মনের পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত পাওয়ার পথ সুগম হয়। অপবিত্র চিন্তা, হিংসা, বিদ্বেষ এবং পরনিন্দা থেকে নিজের জিহ্বা ও মনকে পবিত্র রাখতে হবে। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ এই দ্বিমুখী পবিত্রতাই মানুষকে প্রকৃত মানুষের মায়ায় এবং খোদার প্রেমে সিক্ত করতে পারে।

পবিত্র আশুরা আমাদের জন্য প্রতি বছর আত্মসংশোধন এবং ঈমানি চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করার এক মহান বার্তা নিয়ে আসে। ২০২৬ সালের এই পবিত্র ক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের দৃঢ় শপথ নিতে হবে যেন আমরা সব ধরনের কুসংস্কার, উচ্ছৃঙ্খলতা, মাতম ও বেদাতকে পুরোপুরি বর্জন করতে পারি। সুন্নাহর আলোয় জীবনকে সাজিয়ে, ইবাদত, রোজা, তওবা ও মানবসেবার মাধ্যমে আশুরার গ্রহণীয় দিকগুলো ধারণ করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করে ইসলামের সঠিক পথে চলার তওফিক দান করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   আশুরার পবিত্রতা  বর্জনীয়  গ্রহণীয় 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: