ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের পতনের পর নিরপেক্ষ নির্বাচনে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম সফরের তালিকায় মালয়েশিয়া ও চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা দূরদর্শী ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। আধুনিক মালয়েশিয়ার পত্তন করেছেন সেখানকার জাতীয়তাবাদী নেতা মাহাথির মোহাম্মদ। অনেকে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মধ্যে মাহাথিরের ছায়া দেখতেন।
একটি ভগ্নদশার দেশকে কীভাবে সততা, শৃঙ্খলা ও নীতি-নিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হয় তার আধুনিক মডেল মালয়েশিয়া ও মাহাথির। একই সঙ্গে ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি কীভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়াতে হয় সে অভিজ্ঞতাও রয়েছে আধুনিক মালয়েশিয়ার। দায়িত্ব গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে বিশেষ বিবেচনায় নেওয়ার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।
মালয়েশিয়া ও চীনে তিনি আন্তরিক উষ্ণ লালগালিচা অভ্যর্থনা পেয়েছেন। তার সফরও ফলপ্রসূ হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রবেশ ও বিদ্যমান নানা সমস্যার সমাধান হবে- এটাই সংগত প্রত্যাশা। মালয়েশিয়া একটি ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ। সুতরাং সেখানে বিদ্যমান সমস্যার যৌক্তিক সমাধান এবং কাজের বাজার দালালমুক্ত হবে এটি কাম্য। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ চীন সফর।
তিনি এমন একসময় চীন সফর করছেন যখন বাংলাদেশ কার্যতই হিংসুটে প্রতিবেশীর কোপানলে রয়েছে। একদিকে সে আশ্রয় দিয়েছে গণআন্দোলনে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট ও তার সহযোগীদের। অন্যদিকে ভারতে জন্ম নেওয়া নাগরিকদের বর্বরোচিত পন্থায় বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিতে সীমান্তে ধাক্কাধাক্কি করছে।
অভ্যন্তরীণ ও প্রতিবেশীর চাপ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী এমন একটি দেশকে তার সফরের প্রথম তালিকায় বেছে নিয়েছেন যে দেশটির কাছে পৃথিবীর প্রতিটি দেশই সমান মর্যাদার অধিকারী। চীন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলায় না। সেই সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হলেও বন্ধুত্বের বিবেচনায় চীন অত্যন্ত বিশ্বস্ত।
সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং এর আগে লাদেন-পরবর্তী পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন ঠান্ডা যুদ্ধেও চীন তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দৃঢ়তার সঙ্গে বহাল রেখেছে। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে ভেতরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার মতো বেয়াদবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিশ্বস্ত বন্ধু খুঁজতে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের পুরোনো দরজা নতুন করে ঝালাই করার এই কৌশল নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা সুরক্ষার বিবেচনায় অভিনন্দনযোগ্য।
যদিও বিষয়টিতে নানা বাধা ও প্রতিকূলতা রয়েছে। বোধকরি সেসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীও জ্ঞাত রয়েছেন। এবারের বৈঠকে দুদেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা আরও সংহতকরণের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। আর্থসাাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ ধর্মীয় সূত্রও রয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ বছর অক্টেবর থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান প্রথম চীন সফর করেন। খালেদা জিয়া ৭ বার চীন সফর করেছেন। এর মধ্যে ৫ বার সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী।
৭শ কোম্পানি রেজিস্ট্রিভুক্ত রয়েছে। এবারের সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের বৈঠক হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় ভবিষ্যতে এগিয়ে নেওয়া যাবে তা নিয়ে আলোাচনা ও কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আলোচনাকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশ চীন থেকে যুদ্ধোপকরণ কিনতে শুরু করেছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সূত্রপাতই হয়েছে নিরাপত্তা বিবেচনা থেকে। চীন আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ। চীনের সঙ্গে তবে খুব দূরেও অবস্থান করছে না।
আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তা ভাবনা এখন আর কনভেনশনাল পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকায়নের কারণে নিরাপত্তা ধারণায়ও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ প্রমাণ করেছে কেবল অস্ত্র যুদ্ধ জয়ের মূল কথা নয়। আমাদের অতীত বলছে মীরজাফর থাকলে অস্ত্র কোনো বিষয় নয়। অনুরূপ ব্যাপার আর্জেন্টিয়ায় ঘটেছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে। সেনাপতির বিশ্বাসঘাতক। সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।
কারণ পাকিস্তানে পারমাণবিক বোমা রয়েছে। চুক্তিতে তারা বলছে যেকোনো দেশ আক্রান্ত হওয়াকেই তারা উভয়ে আক্রান্ত বলে ধরে নেওয়া হবে। এ চুক্তি এ অঞ্চলে নতুন সমীকরণের আভাস দিচ্ছে। নিরাপত্তা ভাবনায় নতুন সংযোজন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বার্তা দিচ্ছে পুরোনো পদ্ধতিতে আর যুদ্ধ করে জেতা সম্ভব নয়।
ইরান তার নয়া কৌশল প্রয়োগ করেছে, যেখানে যুদ্ধের চেয়ে হেকমত বেশি কাজ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরাকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চেয়েছিল। বাস্তবে ইরাক থেকে শিক্ষা নিয়েই ইরান তার নয়া হেকমত প্রয়োগ করেছে, যেখানে ব্যক্তি বড় নয়। মার্কিনিরা হয়তো ভেবেছিল সেনাপতি বা নেতা মারলেই যুদ্ধ বন্ধ হয়। আসলে সেটি বুমেরাং হয়েছে। তবে একটি বার্তা আমাদের জন্য রয়েছে সেটি হলো ইসরাইল। আমাদের দেশে ইসরাইলি নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী।
সাবেক আওয়ামী আমলে ইসরাইলের সঙ্গে যেসব বিষয়ে সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে তা বহাল থাকলে এখানে চীনের সঙ্গে আলোচনা করে ফায়দা লাভ অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ ইসরাইল ভারত মার্কিন এমনকি রাশিয়ার নেটওয়ার্কেও আন্তঃসম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। এই আলোচনা এ জন্য যে বাংলাদেশ এখন কার্যকর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। পাকিস্তান-মার্কিন সামরিক চুক্তিতে একটি বিশেষ ধারা ছিল, যেখানে বলা ছিল মার্কিনি অস্ত্র ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না। সুতরাং আমাদের নিরাপত্তা ভাবনায় সে বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। ভারত যে চোখে এখন বাংলাদেশকে দেখছে, ভারতীয় বিভিন্ন আলোচকরা যে ভাষায় কথা বলছে তাতে একটি বার্তা রয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য সুখকর নয়। সে বিবেচনায় চীন বাংলাদেশের পুরোনো বন্ধু। সবসময় পাশে দাঁড়িয়েছে। ৭৫-৭৬ সালের শুরুতে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল তা সামরিক-রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে বৃত্তাবদ্ধ ছিল।
ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে যে কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে অথবা পুশইন করছে তার কোনো ক্ষেত্রেই তারা আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করছে না। বাংলাদেশ যতবারই বলছে আন্তর্জাতিক আইনের কথা ততবাবরই তারা গায়ের জোর খাটাতে চাচ্ছে। ভারত থেকে অবাধে মাদক-নিষিদ্ধ দ্রব্যাদি বাংলাদেশে প্রবেশে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা চোরাকারবারিদের সহায়তা করছে অথচ নিরপরাধ বাংলাদেশিদের সীমান্তে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখছে। সীমান্তের মানবিক বিষয়কে অস্বীকার করে সীমান্তে এক ফ্যাসিবাদ বাস্তবতা তুলে ধরেছে।
এই যে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে যা কি না বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে বিবেচিত হতে পারে এবং এ জন্য বাংলাদেশ কোনোভাবোই দায়ী নয়- তা মোকাবিলায় বাংলাদেশের যে প্রস্তুতি জরুরি সে বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও চীনের সঙ্গে একান্ত আলোচনা দেশপ্রেমিকতারই উজ্জ্বল উদাহরণ। চীন আসলে সরকার পর্যায়েই সম্পর্ক রাখে। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীন বাংলাদেশে তিস্তা ব্যারাজসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সহায়তার কথা বলছে এবং সব ঠিক থাকলে তা অব্যাহত রাখবে।
বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারাজসহ আরও অনেক স্পর্শকাতর প্রকল্প নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে। এসব প্রকল্পের সঙ্গে শুধু অর্থই নয় বরং সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। রয়েছে অভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গও। নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এসব উন্নয়ন বা সহযেগিতা কাজে লাগানো প্রায় অসম্ভব।
সীমান্তের ওপারে যা ঘটছে সে তো হয়তো ধারণা করা যায় সেটিই সব কথা নয়। দৃশ্যমান হোক বা না হোক দেশ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি রয়েছে। অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। সংসদের বিরোধী দলের সরকার হটানোর হুমকি বহাল রয়েছে। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা পরিষ্কার করে বলেছেন, সরকারকে বেশি দিন সময় দেওয়া যাবে না। এমনকি নয়া গণঅভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের কথাও বলা হচ্ছে। যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে তারা জনগণের ম্যান্ডেটে রয়েছে।
একটি ভোটাধিকার অর্জনের জন্য গোটা জাতি যে মাত্রায় জীবন উৎসর্গ করেছে তার অন্য কোনো নজির পাওয়া ভার। সেই বাস্তবতায় যে সংসদ গঠিত হয়েছে তারা যদি জনপ্রত্যাশার সঙ্গে সংগতি না রেখে ভিন্ন কোনো বাস্তবতায় প্রবেশ করে সেটি কি ওয়াদা পূরণ বলে বিবেচনা করা যাবে।
আমরা আলোচনা করছিলাম প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে। আধুনিক মালয়েশিয়া আমাদের রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চীনকে আমরা আমাদের প্রতিরক্ষার বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে পাকিস্তান নেপাল শ্রীলঙ্কাসহ এ অঞ্চলের ভারতীয় আধিপত্যবাদের নিগ্রহে যারা নির্যাতিত তাদের একটি কার্যকর ঐক্য গড়ে উঠতে পারে যা আগামী দিনে টিকে থাকার নয়া দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
মূলত ভারতীয় দাদাগিরির বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশ ও জাতিগুলোকে সংগঠিত করতেই শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্ক গঠন করেছিলেন। এখন সময় অনেক পাল্টেছে। দলমত নির্বিশেষে সংকীর্ণ স্বার্থ ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যই কেবল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে টিকে থাকার অঙ্গীকার বলে বিবেচিত হতে পারে।
সে কারণেই নিরাপত্তা ভাবনায় আপসের কোনো সুযোগ নেই। মনে রাখা জরুরি গত সতেরো বছর ভারতীয় নীলনকশায় জাতি বিধ্বংসের যেসব ছক আঁটা হয়েছিল তা এখনও বহাল রয়েছে। সুতরাং ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য গড়তে নতুন প্রতিরক্ষা ভাবনার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও