রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। সেই লক্ষ্যেই গঠিত হয়েছিল ১১টি সংস্কার কমিশন। এসব কমিশন জমা দিয়েছিল আড়াই হাজারেরও বেশি সুপারিশ। বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন প্রায় এককভাবে স্থান করে নিয়েছে সংবিধান সংস্কার। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, নির্বাচন, দুর্নীতি দমন, স্থানীয় সরকার কিংবা স্বাস্থ্যব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের সংস্কার আড়ালে পড়ে গেছে অনেকটাই। এতে সংস্কার-আলোচনার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে।
সময়ের আলোয় গতকাল প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিভিন্ন কমিশনের ৩৬৭টি সুপারিশকে ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। যার মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ৩৭টি। অর্থাৎ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত সুপারিশের প্রায় ৯০ শতাংশই এখনও কার্যকর হয়নি। এমন নয় যে, সব সুপারিশ বাস্তবায়নে সাংবিধানিক সংশোধনের প্রয়োজন ছিল। নির্বাহী আদেশ বা অধ্যাদেশের মাধ্যমেই অনেক সংস্কার করা যেত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যে কারণে এমন প্রশ্ন ওঠে যে, সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা কি কেবল সংবিধান, নাকি রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও প্রশাসনিক অনীহাও সমানভাবে দায়ী?
সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা নাগরিক জীবনে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন- পুলিশি জবাবদিহি বাড়ানো, ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করা, পৃথক তদন্ত সার্ভিস গঠন, আদালতে তথ্যকেন্দ্র স্থাপন, সরকারি কর্মচারীদের নতুন আচরণবিধি, গণশুনানির ব্যবস্থা, জনপ্রশাসনের পুনর্বিন্যাস, দুদকের সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা। কিন্তু এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
সরকারি সূত্র বলছে, সংস্কার কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে নেই। তবে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়ন কঠিন। সরকারের এই বক্তব্যকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না। এমন কিছু সংস্কার আছে যেগুলোতে রাজনৈতিক সমঝোতা অপরিহার্য। আবার এটাও ঠিক যে, এমন অনেক সংস্কার সুপারিশ আছে যেগুলো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই কার্যকর করা সম্ভব।
সংস্কার প্রশ্নে বিশ্লেষকরা কিছু বাস্তব সমস্যার কথা বলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, সংবিধান গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না। সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কার বিষয়ে সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার ও রূপরেখার অভাবের কথা বলেছেন।
আর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধও সংস্কারের বড় অন্তরায়।বিশ্লেষকদের বক্তব্যে আমাদের এই উপলব্ধি হয় যে, সংস্কারকে খণ্ডিতভাবে দেখা হলে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়বে।
আমাদের বিবেচনায়, কোনো একটি বিষয়কে রাষ্ট্র সংস্কারের একমাত্র মানদণ্ডে পরিণত করা সংগত নয়। নির্বাচন, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন, স্থানীয় সরকার ও জনসেবা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এর কোনো একটিকে বাদ দিয়ে কাক্সিক্ষত সংস্কার করা যাবে না বা সংস্কার টেকসই হবে না।
দুয়েকটি আইন বদলে দেওয়া বা দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান বদলে দেওয়াকে রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংস্কার বলার উপায় নেই। বড়জোর একে সংস্কারের খণ্ডিত রূপ বলা যেতে পারে। চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে তার সঙ্গে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংস্কার হতে হবে সামগ্রিক। আবার এটাও সত্য যে সংস্কার এক দিনে সম্পন্ন হয় না। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিকল্প নেই।
সময়ের আলো/আআ